বেশ কিছুদিন ধরেই দরিদ্র ভ্যানচালক বাবা সাইদ ফকিরের কাছে একটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন কিনে দেবার বায়না ধরেন সাঁথিয়ার নন্দনপুর ইউনিয়নের মাহমুদপুর গ্রামের কিশোর আরিফ (১৬)। কিন্তু, দরিদ্র বাবার অভাবের সংসারে ছেলের বায়না মেটাতে পারেননি বাবা সাইদ ফকির। সোমবার দুপুরে বাড়িতে কেউ না থাকায় তাদের নিজ ঘরের আড়ার সাথে গলায় দড়ি পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন আরিফ।
স্বজনরা জানান, মোবাইল গেমসে আসক্তির কারণে বাবার কাছে ফোনের জন্য জিদ করছিল সে। গেম খেলার নেশা এতটাই তীব্র যে রাগে ক্ষোভে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিতেও দ্বিধা করেনি সে। আরিফের এমন কাণ্ডে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পাবনার স্কুল কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের মধ্যে।
স্থানীয়রা জানায়, করোনার কারণে প্রায় দেড় বছর ধরে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। স্কুল-কলেজের অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা দিনরাতের বেশির ভাগ সময় মুঠোফোনে ভিডিও গেমসে আসক্ত হয়ে পড়েছে। অনলাইন ক্লাসের অজুহাতে অসচ্ছল পরিবারের সন্তানরাও অভিভাবকদের চাপ দিয়ে অ্যান্ড্রয়েড ফোন কিনে নিয়েছে। গ্রামগঞ্জের কিশোর তরুণদের মাঝে এসব গেমস আসক্তি মহামারি আকার ধারণ করেছে।
সরেজমিনে পাবনার বেড়া ও সাঁথিয়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের পাড়া মহল্লায় ঘুরে দেখা যায়, কিশোর তরুণেরা রাস্তার মোড়ে, গাছের নিচে, খোলা কোনো জায়গায়, স্কুল মঠে, জুটি বেঁধে বসে ফোর্টনাইট, তিন পাত্তি, লুডু, জান্ডীমুন্ডা ফ্রি ফায়ার-পাবজি গেমসগুলো খেলছে। যে স্থানে ওয়াইফাই ইন্টারনেট কানেকশন আছে সেখানে জটলা করে ৩০- ৪০জনকেও একসাথে বসে গেম খেলতে দেখা যায়। অনেকে আবার মোবাইলে অর্থের বিনিময়ে জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়েছে।
কয়েকজন কিশোরের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের বেশির ভাগই ফ্রি ফায়ার ও পাবজি নামক গেমসের নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। এই গেমসে যারা বেশি পারদর্শী তারা আবার ডায়মন্ড পয়েন্ট বিক্রির ব্যবসা করছে। অনেকে আবার ফ্রি ফায়ার ও পাবজী গেমস খেলে অতিরিক্ত লেভেল পার করে সেই ফেসবুক আইডি ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকাও দাম হাঁকিয়ে বিক্রিও করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, ‘ফ্রি ফায়ার গেমস প্রথমে তাদের কাছে ভালো লাগত না। কিছুদিন বন্ধুদের খেলা দেখাদেখিতে তারা আসক্ত হয়ে গেছেন। এখন গেমস না খেলে তাদের অস্বস্তিকর মনে হয়।’
এ বিষয়ে সাথিয়া সোয়াইব ক্যাবল নেটওয়াক এর পরিচালক কাবিল হোসেন বলেন, এক বছরে আমার ইন্টারনেট সংযোগ বেড়েছে কয়েক গুন। বছরখানেক আগে হাতেগোনা কয়জন নেট কানেকশন নিত আর এখন প্রতিটি পাড়ায় ও ঘরে ঘরে সংযোগ দিতে হচ্ছে। নেট সংযোগ দিতেই নাকি তিনি হিমশিম খাচ্ছেন বলে জানান তিনি।
সাঁথিয়ার কলেজশিক্ষক আব্দুদ দাউয়ান বলেন, ‘করোনা মহামারির আগে যে সময়ে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে পাঠ গ্রহণ ও খেলার মাঠে ক্রীড়া চর্চার মধ্যে ব্যস্ত থাকতো সে সময়টা তারা মোবাইলে গেমস খেলে কাটাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব গেমস নৃশংসতা, কুরুচিপূর্ণ ও অশ্লীলতায় ভরা। তথ্য প্রযুক্তির অপব্যবহার একটি প্রজন্মকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। এসব বিদেশি গেম থেকে নিজেদের ছেলেমেয়েকে ফিরিয়ে আনতে না পারলে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে।
সাঁথিয়া উপজেলার পুন্ডুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু হানিফ খান বলেন, ‘অনলাইন ক্লাসের অজুহাতে অসচ্ছল পরিবারের সন্তানরাও অনেক দামি ফোন কিনছে। ছেলে-মেয়ে শিক্ষার বিষয়টি বিবেচনা করে অভিভাবকরাও ধার-দেনা করে ফোন কেনার টাকা জোগান দিচ্ছেন। অথচ অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা পরিবারের মোটা অঙ্কের অর্থ খরচ করে ‘ডায়মন্ড ও ইউসি’ কিনছে। অনেকেই টাকা জোগান দিতে জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপকর্মে।
পাবনার সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম জামাল আহমেদ বলেন, মোবাইল ফোনে গেমস আসক্তির বিষয়টি উদ্বেগজনক। শিশু-কিশোরদের এ প্রবণতা ঠেকাতে অভিভাবকদের উদ্যোগ নিতে হবে। প্রশাসন ও স্কুল-কলেজের শিক্ষকরাও তাদের সচেতন করতে কাজ শুরু করেছেন। মানুষকে সচেতন করতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতেও এসব গেমসের কুফল নিয়ে আলোচনা করতে বলা হয়েছে।
