ফিলিস্তিনের ন্যায়সঙ্গত দাবি ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক

আপডেট : ০২ জুন ২০২১, ১১:৩২ পিএম

বাংলাদেশি ই-পাসপোর্টে ‘except Israel’ শব্দগুচ্ছ বাদ দেওয়ায় করোনার এই নিরানন্দ সময়ে কিছুদিন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনায় বেশ বৈচিত্র্য এসেছিল। পাসপোর্টের বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধিক্ষেত্রভুক্ত হলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশি পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে গিয়ে এই সংশোধনটুকু করা হয়েছে; ইসরায়েলের প্রতি দেশের নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। তা তিনি বলতেই পারেন, তিনি যে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বিষয়টি শুধুই পাসপোর্টের নয়; বিদেশ-নীতিরও বটে। গল্প শুনেছিলাম, এক ব্রিটিশ ও এক আংকেল শ্যাম একবার অটোমোবাইলের বিভিন্ন যন্ত্রাংশের নাম নিয়ে তর্কাতর্কি করছে; আমেরিকান একটা অঙ্গকে বলছে ‘windshield’, ব্রিটিশ সেটাকে বলছে ‘windscreen’। প্রতিপক্ষ তখন ক্ষিপ্ত হয়ে বলছে যে, গাড়িটা আমাদের তৈরি, কাজেই আমাদের দেওয়া নামই যথার্থ। ঘাগু ইংরেজ তখন তুরুপের তাসটি ছেড়ে বলছে যে, ভাষাটি আমাদের, কাজেই আমরা যাকে যে ভাষায় সম্বোধন করব, সে সেই নামেই পরিচিত হবে। এই না হলে ব্রিটিশ!

ইসরায়েল রাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। আমরা মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধে উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ হয়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে যেমন সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছি, তেমনি ইসরায়েল রাষ্ট্রকে অস্বীকার করে আসছি। এই অবস্থান পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকে। মাঝে আমরা যে এই ইসলামিক রিপাবলিক রাষ্ট্র থেকে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বেরিয়ে এসে এক ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র গঠন করেছি এবং সেই ন্যায়সংগত যুদ্ধে মুসলিম ভ্রাতাদের অধিকাংশকে আমাদের বিপক্ষে অবস্থান নিতে দেখেছি, তারপরও আমাদের নীতি অভিন্নই রয়ে গেছে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এ ক্ষেত্রে নীতি এবং কৌশল সময়োপযোগী করার সুযোগ আছে কি না তা ভেবে দেখা যেতে পারে।

একসময় ইউরোপে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চলত; শত বছরব্যাপী যুদ্ধ, পঞ্চাশ বছরব্যাপী যুদ্ধ, পঁচিশ বছরব্যাপী যুদ্ধ। তারা তখন এই যুদ্ধের অসারতা বুঝতে পেরে শুধু নিজেদের ঝগড়াই মিটমাট করেই ফেলেনি, দেশের সীমান্তরেখা পর্যন্ত বিলীন করে দিতে চলেছে। আর সেই যুদ্ধ তারা চালান করে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে, আর মুুসলমানরাও সেটা লালন করে চলেছে অন্ধের মতো। আজ চুয়াত্তর বছর ধরে চলছে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সংগ্রাম ও সমর। কিন্তু ফলাফল শূন্যের কোটা থেকে খুব দূরে না অথচ ভূমি, অর্থ, সমরাস্ত্র ও জনশক্তি খরচ হয়েছে বিস্তর। এগুলো সাহায্য হিসেবে এসেছে নিকটবর্তী-দূরবর্তী সব ভ্রাতৃপ্রতিম মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছ থেকে। এতে ভাগ্যোন্নয়নের বদলে বেড়েছে মৃত্যু, দুর্ভোগ ও অশান্তি।

আসলে যুদ্ধে তো কোনো পক্ষেরই লাভ হয় না। যে পরাজিত হয়, সে তো নিঃশেষ হয়েই যায়, কিন্তু যে জয়ী তার অবস্থাও হয় তথৈবচ। মুঘল দরবারে স্থানীয় ও বহিরাগত মুুসলিম সভাসদদের মধ্যে সৃষ্ট সঙ্গেতার প্রেক্ষাপটে ১৭৬১ সালে ভারতবর্ষে সংঘটিত পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে আহম্মদ শাহ আব্দালি মারাঠাদের পরাজিত করেন ঠিকই, কিন্তু যুদ্ধে মানবিক ও সামরিক ক্ষয়ক্ষতিতে তার নিজেরও কোমর ভেঙে যায়। ফলে তিনি সমর শেষে দ্বিতীয় শাহ আলমকে সম্রাট হিসেবে স্বীকার করে নিতে সবার প্রতি ফরমান জারি করার পর প্রথম সুযোগেই নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। এটা শুধু অষ্টাদশ শতকে নয়, সব যুগের জন্য সমানভাবে সত্য।

বিলম্বে হলেও আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের অন্যতম সরাসরি অংশীদার মিসর ও জর্ডান যথাক্রমে ১৯৭৯ ও ১৯৯৪ সালে শান্তিচুক্তি করে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। ২০২০ সালে বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সুদান ও মরক্কো ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্যে চুক্তি সই করে। সম্পর্কে নানা উত্থান-পতন থাকলেও তুরস্ক তো ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় সেই ১৯৪৯ সালে প্রথম মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে। উপসাগরীয় যুদ্ধের পর থেকে শত্রুতার সম্পর্ক সৃষ্টি হলেও ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের আগ পর্যন্ত ইরান ছিল ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দানকারী দ্বিতীয় মুুসলিম দেশ। আবার ইরাক-ইরান যুদ্ধকালে ইসরায়েলের মাধ্যমে ইরানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধাস্ত্র রপ্তানির অভিযোগও রয়েছে। সদ্য খবর হলো, হামাসের সঙ্গে ইসরায়েলি বাহিনীর যুদ্ধবিরতির ১০ দিনের মাথায় আমিরাত তেল আবিবে আনুষ্ঠানিকভাবে দূতাবাস চালু করেছে। লক্ষ্য শান্তি, সহাবস্থান ও ধৈর্যের সংস্কৃতি বিকশিত করা।

প্রতিটি দেশের বিদেশনীতি নির্ণীত হয় সেই দেশ ও তার জনগণের বৃহত্তর স্বার্থের কথা বিবেচনা করে; শুধু আবেগ ও সংবেদনশীলতা তার প্রধান নির্ণায়ক হতে পারে না। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড বানানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাই তো সংবিধানে পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র করেছিলেন ‘Friendship to all, malice to none.’ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এত সুন্দর একটি বাণী হৃদয়ে ধারণ করেও ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানানোর জন্য আমরা নাগরিকদের পাসপোর্টে এত দিন ‘এক্সসেপ্ট ইসরায়েল’ লিপিবদ্ধ করে এসেছি। কিন্তু শত্রুকে পরাস্ত করার এটিই কি একমাত্র মোক্ষম অস্ত্র? আমাদের নবীজি (সা.) শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ যেমন করেছেন, তেমনি প্রয়োজনের সময় সন্ধি করতে পিছপা হননি। এমনকি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের স্বার্থে মদিনায় ও মদিনার বাইরে ইহুদিদের সঙ্গে একাধিক সন্ধি করেছেন, আবার সন্ধি ভঙ্গ করলে যুদ্ধ করেছেন। তা ছাড়া শত্রুকে সেবা আর মমতা দিয়ে কীভাবে বন্ধুতে রূপান্তর করা যায়, নবীজির চলার পথে কাঁটা ছিটিয়ে আনন্দ লাভকারী বুড়ির সে উপাখ্যান আমরা সবাই জানি। আগেই উল্লেখ করেছি যে, বিলম্বে হলেও অনেক আরব দেশের বোধোদয় ঘটেছে। কিন্তু আমরা যে তিমিরে, সেই তিমিরেই রয়ে গেছি।

ইসরায়েল একটি আধুনিক ও উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। ৯৩ লক্ষাধিক নাগরিক অধ্যুষিত এই ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের জিডিপির পরিমাণ ৪১০.৫০ বিলিয়ন এবং মাথাপিছু আয় ৪০,৩৩৬ মার্কিন ডলার। মধ্যপ্রাচ্যে উন্নত জীবন মানের দিক থেকে তারা প্রথম। শিক্ষার মান এতটাই উন্নত যে, মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস পর্যন্ত সে দেশে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত বিপ্লবে অবদানের জন্য শিক্ষাব্যবস্থার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং মাইক্রোসফটের প্রথম বহির্বিশ্ব গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র (আরঅ্যান্ডডি) সেখানে স্থাপন করেন। অবশ্য এখন পৃথিবীর টেক জায়ান্টদের সবার আরঅ্যান্ডডি ইসরায়েলে রয়েছে। উচ্চদক্ষতার কর্মে নিয়োজিত নাগরিকদের অংশের বিচারে তার অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম। ২০০৪ সাল থেকে শুধু বিজ্ঞানে ৬ জন নোবেল প্রাইজ অর্জন করেছে। অথচ এ রকম একটি উন্নত দেশের সঙ্গে আমাদের কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক নেই। অদূর ভবিষ্যতে তার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলে দিয়েছেন, নতুন এই পাসপোর্টের সুযোগ নিয়ে কেউ ওই দেশে গেলে তাকে আইনের জালে আটকানো হবে।

আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক না থাকলেও ইসরায়েলের সঙ্গে আমাদের অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক ভালোই রয়েছে। সেদিন ইংরেজি দৈনিকে ((Financial Express, May, 28, 2021) দেখলাম যে, ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ইসরায়েলে আমাদের ৩৩৩.৭৪ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে; পক্ষান্তরে ২০০৯ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত বাংলাদেশে তার রপ্তানি ৩.৬৭ মিলিয়ন ডলার। এই বাণিজ্যটা হয় সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া বা আমিরাতের মতো তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে। বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক ও ওষুধসামগ্রী। বর্তমানে ইন্দোনেশিয়াও এই বাঁকা পথে সে দেশে ৫০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের সামগ্রী রপ্তানি করছে। ইন্দোনেশিয়ানদের সে দেশে ভ্রমণ করতে কোনো বাধা নেই; মালয়েশিয়ানরাও সে দেশে ভ্রমণ শুরু করে দিয়েছে।

বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মাপকাঠিতে স্নাতক হতে চলেছে। তার রপ্তানি বাড়াতে হবে; রপ্তানি ঝুড়িতে আনতে হবে বৈচিত্র্য। আধুনিক শিক্ষা-দীক্ষা ও বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিতে পারদর্শী মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণরোধ, সমুদ্রসম্পদ আহরণ, ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, কৃষির আধুনিকীকরণ, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ, গবেষণা ও উন্নয়ন প্রভৃতি সেক্টরে বাঞ্ছিত পরিবর্তন এনে উন্নয়নের ধারাকে টেকসই ও বেগবান করতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের মতো একটি জ্ঞানভিত্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ আমাদের উন্নয়ন অভিযাত্রার জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে। সিঙ্গাপুর প্রাথমিক পর্যায়ে চারদিকে বৈরী প্রতিবেশীদের দ্বারা কোণঠাসা হয়ে পড়লেও ইসরায়েলি সহযোগিতায় কিন্তু উতরে যেতে পেরেছিল।

ইসরায়েল তো সরাসরি আমাদের কোনো শত্রুরাষ্ট্র নয়; বরং আমাদের বন্ধুত্বপ্রত্যাশী প্রথম দিকের স্বীকৃতি প্রদানকারী একটি দেশ। ইসরায়েলের সৃষ্টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি পরিকল্পনার ভিত্তিতে; তার পৃষ্ঠপোষক এবং বিরোধী পক্ষের মধ্যে কোনো বৈরীভাব লক্ষ করা যায় না; বরং দেখা যায় গভীর বন্ধুত্ব। কাজেই বিষয়টা অনেক সময়ই গোলমেলে মনে হয়। তা ছাড়া, তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের অর্থ এই নয় যে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের মতো সংগত দাবির প্রতি আমাদের সমর্থন প্রত্যাহার করতে হবে; বরং এতে দাবি আদায়ের বন্ধ দরজা খুলতে পারে। পাকিস্তান ২৪ বছর ধরে আমাদের শোষণ করেছে, মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষ হত্যা করেছে, ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জত লুণ্ঠন করেছে, পাওনা অর্থ পরিশোধ করতে এবং লাখ লাখ পাকিস্তানি নাগরিক ফেরত নিতে অপারগতা প্রকাশ করছে এবং এখনো সেসব কর্মের জন্য তারা ক্ষমা প্রার্থনা করছে না। এমন বৈরী রাষ্ট্রের সঙ্গে যদি কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকতে পারে, তবে ইসরায়েলের মতো সম্ভাবনাময় দেশের সঙ্গে কেন সম্পর্ক থাকবে না, সেটা অবশ্যই ভেবে দেখার দাবি রাখে।

লেখক খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত