‘জীবন ও জীবিকার প্রাধান্য, আগামীর বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্য নিয়ে গতকাল জাতীয় সংসদে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে। বৈশ্বিক করোনা মহামারী পরিস্থিতি আর টিকাকরণের জন্য এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়বে, অনুমান ছিল। গতকাল সেই হিসাব মিলিয়ে দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল।
‘স্বাস্থ্য ভালো থাকলে দেশ ভালো থাকবে’ এই ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অর্থমন্ত্রী দাবি করেছেন। প্রথমবারের মতো বাজেটের প্রায় ৭ শতাংশের বেশি স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। এটি বাজেটের প্রায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ এবং জিডিপির ১ দশমিক ৩ শতাংশ। গত সাত অর্থবছরে এ বরাদ্দ কখনোই ৫ শতাংশের ওপরে যায়নি। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। যা ছিল মোট বাজেটের ৫ দশমিক ২ শতাংশ। চলতি অর্থবছর থেকে আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ প্রায় ৩ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা বাড়ছে।
অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, কভিড আক্রান্ত কেউ যেন বিনাচিকিৎসায় মারা না যায় সে লক্ষ্যে মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোকে অত্যাধুনিক করা হবে। স্বাস্থ্য খাতকে শক্তিশালী করতে নতুন চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি বর্তমানে কর্মরত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ঘোষণাও দেন তিনি।
এ ছাড়া কভিড প্রতিরোধে বিভিন্ন দেশ থেকে টিকা কেনা বাবদ সরকার চলতি অর্থবছর ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রেখেছিল। আগামী বাজেটেও ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে এই বরাদ্দ কাক্সিক্ষতই ছিল। কারণ করোনা সংক্রমণ আরও কতদিন চলবে, তা কেউ জানে না। কাজেই করোনা নিয়ন্ত্রণই এ মুহূর্তে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। করোনা থাকলে যোগাযোগ, যাতায়াত, শিক্ষা, ব্যবসা, পর্যটন কোনো কিছুই স্বাভাবিকভাবে হবে না। আর সব কিছু স্বাভাবিক না হলে অর্থনীতির গতিও স্বাভাবিক হবে না।
এ কথা ঠিক যে, করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়ানোর বিকল্প নেই। পাশাপাশি এই বরাদ্দ যথাযথভাবে খরচ করা সম্ভব কি না, সেটাও ভেবে দেখতে হবে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে স্বাস্থ্যসেবায় খরচ করা গেছে বরাদ্দের ৪ ভাগের ১ ভাগ। এমনকি গেল বছরের এপ্রিলে কভিড মোকাবিলায় নেওয়া দুটি প্রকল্পেরও অবস্থা হ-য-ব-র-ল। তারপরও ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে, অদক্ষতা আর অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত স্বাস্থ্য খাতে ১৬ শতাংশ বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)-র প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ করোনা মহামারীর এই দুর্যোগেও খরচ করতে পেরেছে মোট বরাদ্দের মাত্র ২৬ শতাংশ।
এই বাস্তবতায় বাজেটের বরাদ্দ এবং বাস্তবায়নের মধ্যকার ব্যবধান কমিয়ে আনতে হবে যতটা সম্ভব। তাছাড়া যেসব প্রকল্পে বাজেট বরাদ্দ করা হয়, সেগুলো যেন টেকসই উন্নয়ন এবং অন্যান্য জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় সেদিকেও নজর দিতে হবে। এছাড়া স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের কিছু অংশ যেন স্বাস্থ্যকর্মীদের শিক্ষা, দক্ষতা বৃদ্ধিতে এবং সুরক্ষা নিশ্চিতকরণের জন্য ব্যবহার করা হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।
মহামারীতে মৃত্যুমিছিল, শয্যাসংকট, অক্সিজেনের অভাব, টিকার অভাব, ক্ষোভ-হাহাকার সবকিছুই কিন্তু একটি বিকল্প স্বাস্থ্যনীতির আলোচনা দাবি করে। ‘সবার সামর্থ্যরে মধ্যে স্বাস্থ্য’ এমন একটা ব্যবস্থা চালুর কথা ভাবতে হবে। মার্কিন অর্থনীতিবিদ ও পরিসংখ্যানবিদ মিলটন ফ্রিডম্যান বলেছিলেন, সংকটকালে রাষ্ট্রীয় নীতির পরিবর্তনের সম্ভাবনা বাড়লেও, সেই সিদ্ধান্ত বাজারে চালু ধারণার ভিত্তিতেই নেওয়া হয়। কিন্তু, ‘সবার সামর্থ্যরে মধ্যে স্বাস্থ্য’, ‘প্রতিটি নাগরিকের সুস্থতার দায় রাষ্ট্রের’ ধারণাগুলো বাজারে চালু নয়। কাজেই, মহামারীর সংকট ও তার মোকাবিলায় বর্তমান মডেলের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুরবস্থা এর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে বিকল্প নীতির দাবি তোলা জরুরি।
দেশে জনসংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ওদিকে স্বাস্থ্যের বিভিন্ন সূচকে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় আমরা ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছি। অনাহারক্লিষ্ট মানুষ, অপুষ্ট শিশুর সংখ্যায় আফ্রিকার হতদরিদ্র দেশগুলোর সঙ্গে আমরা এখনো পাল্লা দিচ্ছি। জনসংখ্যা বাড়লে অনাহার-অপুষ্টিতে আক্রান্ত, অসুস্থতাও বাড়বে।
অর্থনীতির বর্তমান মডেলে অবশ্য বিশ্বের অন্যতম সর্বাধিক অনাহারক্লিষ্ট শিশু নিয়ে বিশ্ব-অর্থনীতির অন্যতম ‘উদীয়মান শক্তি’ হওয়া যায়। স্বাস্থ্য সূচকে তলানিতে থাকা দেশের পক্ষে ‘পাঁচতারা হাসপাতালে’ কেবল কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার বিনিময়ে উন্নত চিকিৎসার বন্দোবস্তও সম্ভব। তেমনটাই দেশে চলছে। আমরাও মেনেছি নির্বিবাদে। কারণ, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা লাটে উঠলেও দেশের কয়েকটি ‘পাঁচতারা হাসপাতাল’ উন্নত চিকিৎসা দিয়েছে। বড়লোকদের কালো টাকার প্রাচুর্য ও স্বাস্থ্যবীমা থাকায় চিকিৎসার আকাশছোঁয়া খরচও মেনে নিয়েছে। এই প্রবল মহামারীর সময়ও কি এই ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত ভ্রান্তি নিয়ে ভাবাবে না?
দেশে নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্য পরিকাঠামো তৈরি করতে জিডিপির অন্তত ৫% দরকার। উন্নত দেশে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ তার চেয়ে ঢের বেশি। আপাতত আমাদের লক্ষ্য জিডিপির ২.৫%। গত বছরগুলোতে সেই বরাদ্দটা ১-১.৫%-এ ঘুরেছে। উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাবে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার জন্য বরাদ্দ দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম। চলতি বাজেটে মোট স্বাস্থ্য ব্যয় জিডিপির ১ শতাংশের কম এবং মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় মাত্র ১১০ ডলার। এ কারণে করোনাকালে স্বাস্থ্য খাতকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে।
কিন্তু যতটুকু যা বরাদ্দ হচ্ছে, তারও সদ্ব্যবহার হচ্ছে কি? স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বরাদ্দ অর্থ খরচের বিষয়ে দুটি দিক গুরুত্বপূর্ণ। ‘এফিশিয়েন্সি’ অর্থাৎ দক্ষতা, এবং ‘ইকুইটি’ অর্থাৎ সমতা। দুটি সম্পর্কহীন নয়। সবচেয়ে কম খরচে সবচেয়ে বেশি মানুষকে কীভাবে সুস্থতার দিশা দেখানো যায়, তা-ই স্বাস্থ্যব্যবস্থার দক্ষতার সূচক। কিন্তু বরাদ্দের সিংহভাগই যায় উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার খাতে। সরকারি হাসপাতালে অঙ্গ প্রতিস্থাপন যত চমকপ্রদ, অপুষ্টিতে ভোগা গ্রামের মেয়েটির সাদা স্রাবের চিকিৎসা ততটা নয়। অথচ একটি অঙ্গ প্রতিস্থাপনে যা খরচ, তাতে দ্বিতীয় ব্যাধিতে আক্রান্ত অনেককে সারিয়ে তোলা যায়। যতজনের অঙ্গ প্রতিস্থাপন প্রয়োজন, সাদা স্রাবের রোগী তার বহু গুণ। ১০০০ পরিবারকে পাঁচতারা হাসপাতালে পাঁচলাখি চিকিৎসা দিলে তারা অবশ্যই উপকৃত হন। কিন্তু ওই পঞ্চাশ কোটিতে সরকারি স্বাস্থ্যকাঠামোর উন্নয়ন হলে উপকৃত হতেন আরও অনেকে। জনস্বাস্থ্য ও প্রতিরোধক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় উপযুক্ত অর্থ ব্যয় হলে দক্ষতা আরও বেশি হতো। এতে খরচ কমবে, দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হবেন বেশি মানুষ।
সমতার নীতির প্রসঙ্গে আসি। গরিবদের অসুস্থতার হার বেশি, তাই ব্যয়ের সিংহভাগ তাদের জন্যই হওয়ার কথা। অথচ, দেশের মডেল বিপ্রতীপ। এখানে বিশেষজ্ঞ নির্ভর চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নতি হয় প্রাথমিক পরিষেবাকে অবহেলার মূল্যে। গরিবরা রক্তাল্পতা, কৃমি, জ্বরের চিকিৎসা নাগালে পেতে সমস্যায়; কিন্তু বিনামূল্যে বাইপাস সার্জারির বন্দোবস্ত শহরে মজুদ! পীরগঞ্জের রোগী বিনামূল্যে রেডিওথেরাপি নিতে ঢাকায় দেড় মাস মাথা গোঁজার খরচ জোটাচ্ছেন জমি বিক্রি করে!
লাখ লাখ মানুষ চিকিৎসা করাতে গিয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যান প্রতি বছর। দেশে চিকিৎসা খাতে মোট খরচের দুই-তৃতীয়াংশই নাগরিকদের পকেটের, অনেকটাই ওষুধ কেনার পেছনে। সরকারি হাসপাতালে বিনা পয়সায় ওষুধ, ন্যায্যমূল্যের দোকান, স্বাস্থ্যসামগ্রী প্রদানের কথা থাকলেও তা পাওয়া যায় না। চিকিৎসকরা ওষুধের বর্গীয় নামে প্রেসক্রিপশন লিখলেও দোকানি পছন্দের ব্র্যান্ডের ওষুধ দেন। ক্রেতার চেয়ে বিক্রেতারই লাভ। ওষুধ তৈরির সরকারি কারখানা নেই। সরকারের হাতে ওষুধ তৈরির ক্ষমতা নেই। ওষুধের দাম বেঁধে দিতে গেলে প্রস্তুতকারীরা একজোটে জরুরি ওষুধ তৈরি না করার ভয় দেখায়। ফার্মা লবির চাপে, দাম বাঁধা হয় ‘মার্কেট অ্যাভারেজ’ বা বাজারের গড় নীতিতে। অর্থাৎ, চারটি কোম্পানি যদি ১০০ টাকায় ওষুধ বিক্রি করে, একটি কোম্পানি দাম হাঁকে ১০০০, সরকার গড় দাম বাঁধবে ১৪০০/৫, বা ২৮০ টাকার ভিত্তিতে। প্রথম চারটি কোম্পানির ওষুধের দাম বাড়বে তিনগুণ।
মহামারী থামবে, কিন্তু বর্তমান মডেলের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংকট রয়ে যাবে। কাজেই বিকল্পের কথা ভাবতে হবে। সংকট ছাড়া বিকল্পের কথা কেউ ভাবে না। নিজেদের স্বার্থেই বিকল্প স্বাস্থ্যনীতির দাবিটা আমাদের তুলতে হবে। সেই দাবি তোলার সময় এখনই।
লেখক লেখক ও কলামনিস্ট
