আধুনিক ও টেকসই মহাসড়ক নেটওয়ার্ক গড়তে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি বলেন, দেশে সড়কপথ উন্নয়নে গত ১২ বছরে সরকার ৩৩১টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। ৪৫২টি নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট উত্থাপনের সময় এ তথ্য জানান তিনি।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সড়ক নিরাপত্তা বৃদ্ধি, ঢাকা মহানগরীতে যানজট নিরসণে দ্রুতগতির গণপরিবহন ব্যবস্থা (এমআরটি ও বিআরটি) প্রবর্তনসহ মোটরযান ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নে পরিকল্পনা গ্রহণসহ বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান।’
৪৫৩ দশমিক ৭ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক চার এবং তদূর্ধ্ব লেনে উন্নীত করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রথম ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে এবং চার লেনবিশিষ্ট ঢাকা-চট্টগ্রাম জাতীয় মহাসড়ক, ঢাকা-ময়মনসিংহ জাতীয় মহাসড়ক ও নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়ক উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল-রংপুর মহাসড়ক, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ইত্যাদি চার লেনে উন্নীত করার কাজ এগিয়ে চলেছে।’ উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের আওতায় বর্তমানে ২৬টি বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
ঢাকা মহানগরীতে ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট : অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘ঢাকা মহানগরী ও পার্শ্ববর্তী এলাকার যানজট নিরসন ও পরিবেশ উন্নয়নে অত্যাধুনিক গণপরিবহন হিসেবে ছয়টি মেট্রোরেল সমন্বয়ে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) আওতায় মোট ১২৮ দশমিক ৭৪১ কিলোমিটার (উড়াল ৬৭.৫৬৯ ও পাতাল ৬১.১৭২ কিলোমিটার) দীর্ঘ ও ১০৪টি স্টেশন (উড়াল ৫১টি ও পাতাল ৫৩টি) বিশিষ্ট একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়তে সরকার সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা ২০৩০ নিয়েছে। ১৬টি স্টেশনবিশিষ্ট ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহনে সক্ষম দ্রুতগামী, নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, সময় সাশ্রয়ী, বিদ্যুৎচালিত, পরিবেশবান্ধব ও দূরনিয়ন্ত্রিত অত্যাধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা প্রবর্তনে প্রথম উড়াল মেট্রোরেল (এমআরটি লাইন-৬) নির্মাণকাজ পুরোদমে এগিয়ে যাচ্ছে।’
সেতু ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন : সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক উন্নয়নে সেতু বিভাগ বিভিন্ন মেগাপ্রকল্প নিয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করে তা চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে আসতে পেরেছে।’
সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্পের নির্মাণকাজ করোনা মহামারীর মধ্যেও পূর্ণগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ফেব্রুয়ারি ২০২১ পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিক ভৌত অগ্রগতি ৮৪ দশমিক ৫০ শতাংশ। আগামী বছরের জুনের মধ্যে সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।’
মুস্তফা কামাল বলেন, ‘হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালি পর্যন্ত র্যাম্পসহ ৪৬.৭৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসের কাজ চলছে। গাজীপুর হতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বাস র্যাপিড ট্রানজিট বা বিআরটি লেনের নির্মাণকাজ চলছে।’
মন্ত্রী আরও বলেন, ‘কর্ণফুলী নদীর তলদেশে, ৩.৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের প্রথম টিউবের রিং স্থাপনসহ বোরিং শেষে দ্বিতীয় টিউবের বোরিংসহ অন্যান্য নির্মাণকাজ চলছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আশুলিয়া হয়ে সাভার ইপিজেড পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্পটি জি-টু-জি ভিত্তিতে চীনা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করছে।’
ভুলতা-আড়াইহাজার-বাঞ্ছারামপুর সড়কে মেঘনা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ হবে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বরিশাল-ভোলা সড়কে কালাবদর ও তেঁতুলিয়া সেতু নির্মাণ, মিঠামইন সেনানিবাস হয়ে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার মরিচখালী পর্যন্ত একটি দোতলা সড়ক নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন এবং নতুন সেতু ও ইনার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা, যমুনা নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনাসহ ঢাকা শহরে সাবওয়ে নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চলছে।’ অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে কিছু বৃহৎ সেতু নির্মাণেরও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
রেলের উন্নয়নে ৫ লাখ ৫৩ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৩০ প্রকল্প : মন্ত্রী বলেন, ‘রেলওয়ের গুরুত্ব বিবেচনা করে সরকার এ খাতে বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়ে আসছে। এ মহাপরিকল্পনার আওতায় ছয় ধাপে ৫ লাখ ৫৩ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৩০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।’
অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় রেলওয়ের জন্য ৭৯৮.০৯ কিলোমিটার নতুন রেললাইন নির্মাণ, বিদ্যমান রেললাইনের সমান্তরালে ৮৯৭ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ বা ডাবল রেললাইন নির্মাণ, ৮৪৬.৫১ কিলোমিটার রেললাইন সংস্কার, ৯টি গুরুত্বপূর্ণ রেল সেতু নির্মাণ, লেভেল ক্রসিং গেটসহ অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন, আইসিডি নির্মাণ, ওয়ার্কশপ নির্মাণ এবং আধুনিকায়ন, ১৬০টি নতুন লোকোমেটিভ, ১ হাজার ৭০৪টি যাত্রীবাহী কোচ, আধুনিক রক্ষণাবেক্ষণ যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, ২২২টি স্টেশনের সিগন্যালিং ব্যবস্থার রেলওয়ে ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ঢাকা-চিলাহাটি-হলদিবাড়ী রুটে যাত্রী পরিবহনের জন্য গত ২৭ মার্চ ‘মিতালি এক্সপ্রেস’ নামে একটি ট্রেন উদ্বোধন করা হয়েছে। বিভিন্ন রুটে ছয়টি নতুন ট্রেন চালু হয়েছে। ১৫০টি যাত্রীবাহী কোচ ক্রয়ে চুক্তি হয়েছে। রেলওয়ের সেবার মান বাড়াতে ৪৭ হাজার ৭০৩টি পদ সংবলিত সংশোধিত জনবল কাঠামোর চূড়ান্ত অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন। দেশের রেল খাতে বাস্তবায়নাধীন বড় প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম পদ্মা সেতু রেল লিংক প্রকল্পের প্রায় ৪০ শতাংশ, চট্টগ্রাম-দোহাজারী-ঘুমদুম রেললাইন প্রকল্পের প্রায় ৫৭ শতাংশ এবং মোংলা-খুলনা রেললাইন প্রকল্পের কাজ প্রায় ৭৭.৭৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। এছাড়া যমুনা রেল সেতু ও রূপসা রেল সেতু প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ এগিয়ে যাচ্ছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
