সিনোভ্যাক টিকার অনুমোদন, আমদানি উৎপাদনের কিছুই ঠিক হয়নি

আপডেট : ০৭ জুন ২০২১, ০৫:৩৬ এএম

চীনের সিনোভ্যাক কোম্পানির করোনার টিকা ‘করোনাভ্যাক’ দেশে প্রয়োগের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। গতকাল রবিবার ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়। তবে এ টিকা কবে নাগাদ দেশে আসবে এবং দেশেই উৎপাদন হবে কি না সে ব্যাপারে কিছু জানাতে পারেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাহবুবুর রহমান স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বাংলাদেশে এ টিকার লোকাল এজেন্ট হিসেবে কাজ করবে ইনসেপটা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। ইনসেপটা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কাছে আবেদন করে। তার পরিপ্রেক্ষিতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ভ্যাকসিনটির ডোসিয়ার (ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পার্ট, সিএমসি পার্ট এবং রেগুলেটরি স্ট্যাটাস) মূল্যায়ন করে। পরে এ সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর গত ৩ জুন চীনের সিনোভ্যাক কোম্পানির করোনাভ্যাক টিকাকে দেশে ইমার্জেন্সি ইউজ অথরাইজেশন বা জরুরি ভিত্তিতে ব্যবহারের অনুমোদন দেয়। এটি দেশে অনুমোদিত চীনের দ্বিতীয় টিকা। এর আগে চীনের সিনোফার্মের টিকার অনুমোদন দেয় সরকার।

চীনের ন্যাশনাল মেডিকেল প্রোডাক্টস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন গত ৯ ফেব্রুয়ারি এ টিকাকে অনুমোদন দেয় এবং বিশ্বের আরও ২২টি দেশে এ টিকার অনুমোদন রয়েছে। গত ১ জুন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরুরি ব্যবহার্য টিকার তালিকায় যুক্ত হয় সিনোভ্যাকের এ টিকা।

এ টিকা ১৮ বছরের ওপরে বয়সীদের জন্য ব্যবহার করা হবে। দুই ডোজের এ ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজের দুই থেকে চার সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হবে এবং এটি দুই থেকে আট ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হবে।

এর আগে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর দেশে আরও চারটি টিকার জরুরি ব্যবহারের জন্য অনুমোদন দেয়। এর মধ্যে প্রথম গত ৭ জানুয়ারি অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকা উদ্ভাবিত ও ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে তৈরি কভিশিল্ড, ২৪ এপ্রিল রাশিয়ার স্পুৎনিক-ভি, ২৯ এপ্রিল চীনের সিনোফার্মের টিকা এবং ২৭ মে ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকার জরুরি ব্যবহারের জন্য অনুমোদন দেয় সরকার।

কবে আসবে নাকি উৎপাদন হবে, জানে না কেউ : চীনের করোনাভ্যাক টিকার স্থানীয় এজেন্ট হলেও টিকা আনার ক্ষেত্রে তেমন কোনো ভূমিকা রাখবে না বলে জানিয়েছেন ইনসেপটা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মুক্তাদির। তিনি গতকাল রবিবার রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে সিনোভ্যাক কোম্পানির টিকাসহ অন্যান্য ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে। যেহেতু ওরা এই টিকা বানায়, তাই ওদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে অনুমোদনের জন্য আমরা দরখাস্ত জমা দিয়েছি। এটা জরুরি ব্যবহারের জন্য ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর অনুমতি দিয়েছে যাতে সিনোভ্যাকের টিকা সরকার সরাসরি ইমপোর্ট (আমদানি) করতে পারে। টিকাটা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও অনুমোদন দিয়েছে। এখন বাংলাদেশের সরকার যদি মনে করে ওদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও আলোচনা করে কিনতে পারে, এটা সরকারের ব্যাপার। এখানে আমাদের আর কোনো কাজও নেই, এটার সঙ্গে আমাদের আর কোনো সম্পৃক্ততাও নেই।’

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন বলেন, ‘ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর সিনোভ্যাকের টিকার অনুমোদন দিয়েছে। এখন সেটা কীভাবে আনা হবে, কোথায় রাখা হবে এবং সেটাকে কোন কোন এজেন্টের মাধ্যমে প্রদান করা হবে, এটি আলোচনার বিষয়। এরপরই সে সম্পর্কে বলা যাবে। এখন এই টিকা চীন থেকে আমদানি করা হবে নাকি দেশেই উৎপাদন করা হবে সে সম্পর্কেও এখনো কোনো আলোচনা হয়নি।’

যুক্তরাষ্ট্রের টিকার তারিখ নির্ধারণ হয়নি : নিজেদের মজুদে থাকা করোনার টিকা বাংলাদেশকে দিতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার রাজি হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন। তবে কবে নাগাদ, কী পরিমাণ টিকা আসবে, তা স্পষ্ট করেননি তিনি। এ ব্যাপারে গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘আমেরিকা ভ্যাকসিন দেবে। তবে সঠিক পরিমাণ এখনো জানি না।’

ভারত থেকে চুক্তির টিকা না আসায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থাকা অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ছয় কোটি অতিরিক্ত ডোজ থেকে কিছু টিকা পাঠাতে দেশটির প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছিল বাংলাদেশ। গতকাল এ ব্যাপারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আশা করছি শিগগিরই আমাদের তারা ভ্যাকসিন দেবে। কোভ্যাক্স থেকেও পাব। আমাদের তো দরকার অনেক। অন্য দেশের মতো না যে ২০ হাজার, এক লাখ হলে হয়ে যাবে। আমার ১৬৫ মিলিয়ন লোক, অনেক লাগে। ১৩০ মিলিয়নকে দিলেও ২৬০ মিলিয়ন লাগবে। এটা বিশাল বাজার।’ যুক্তরাষ্ট্র থেকে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় চিকিৎসা সরঞ্জামের একটি চালান আজ সোমবার বাংলাদেশে আসবে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

রাশিয়া থেকে দ্রুত ৫ মিলিয়ন টিকা আনতে চায় সরকার : গতকাল রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেক্সান্ডার আই ইগনতভের বিদায়ী সাক্ষাৎকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে মোমেন বলেন, ‘বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে দ্রুত ৫ মিলিয়ন করোনার টিকা “স্পুৎনিক-ভি” আমদানি করতে আগ্রহী। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কাজ করছে। অনুমোদন পেলে বাংলাদেশের কয়েকটি কোম্পানি রাশিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে টিকা উৎপাদন করতে পারবে।’

এ সময় তিনি রাশিয়া থেকে দ্রুত করোনার টিকা আমদানির ক্ষেত্রে বিদায়ী রাষ্ট্রদূতের সহযোগিতা কামনা করেন। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকাজের গতি ও মানে সন্তোষ প্রকাশ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি কর্মরত রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ ও শ্রমিকদের কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু উল্লেখ করে এ সময় ড. মোমেন ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় রাশিয়ার সহযোগিতার কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন এবং সে সময়ের সহযোগিতার জন্য রাশিয়ার সরকার ও জনগণকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বাংলাদেশের উন্নয়নে রাশিয়ার অবদান এবং বিভিন্ন মেগা প্রজেক্টে রাশিয়ার উন্নয়ন সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে রাশিয়া সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনকালে সহযোগিতার জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। পররাষ্ট্রমন্ত্রীও রাশিয়ার কাছ থেকে পাওয়া সহযোগিতার জন্য বিদায়ী রাষ্ট্রদূতকে ধন্যবাদ জানান। রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ঢাকায় তার কার্যকালের মেয়াদ শেষ করে ৮ জুন রাশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন।

বিদেশগামীদের নমুনা পরীক্ষা হবে আর্মি স্টেডিয়ামে : বিদেশগামী মানুষের করোনা নমুনা পরীক্ষা এখন থেকে আর্মি স্টেডিয়ামে করা হবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গতকাল দুপুরে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত ভার্চুয়াল বুলেটিনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন এ কথা জানান। তিনি বলেন, ‘বিদেশগামী মানুষের জন্য আরও উন্নত ল্যাব সেবা দিতে ডিএনসিসি আরটি-পিসিআর কার্যক্রম আর্মি স্টেডিয়ামে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আগে করোনার নমুনা দিতে হতো মহাখালীতে অবস্থিত ডিএনসিসি বুথে। সেখানে এখন করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে নির্ধারিত করা হয়েছে।’

এ সময় ‘কিছু অসাধু ও দালাল শ্রেণির মানুষ বিদেশগামী মানুষদের প্রতারিত করছে এবং ভুয়া সার্টিফিকেট দিচ্ছে’ এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে বলে জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র।

ট্রান্সমিশন আনস্টেবল হয়ে গেছে : দেশে করোনা সংক্রমণের হার বেড়ে যাওয়ায় চলতি মাস গত মাসের মতো স্বস্তিকর যাবে না বলে মনে করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গতকাল করোনা পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত ভার্চুয়াল বুলেটিনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন বলেন, ‘গত এক সপ্তাহে আমাদের পজিটিভ রেট বেড়ে গেছে। যদিও ৯২ ভাগ মানুষ সুস্থ হয়ে যাচ্ছে, সেজন্য আমরা আনন্দিত। সংক্রমণের দিক থেকে আমরা ৭ থেকে ৮ শতাংশ নিচে নেমে এসেছিলাম। সেটি ক্রমাগত বেড়ে গেছে। গত এক মাসের চিত্র লক্ষ করলে দেখা যাবে, আমরা ওই পর্যায়ে নেই যেখানে বলতে পারি আমরা স্টেবল। আমাদের ট্রান্সমিশন আনস্টেবল হয়ে গেছে। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত যে চিত্র দেখতে পাই, এপ্রিলের ভয়াবহতা আমরা ট্যাকেল করতে পেরেছি। জুন মাস যখন শুরু হয়েছে, মাত্র ছয় দিন। এর মধ্যে আমরা আট হাজারের বেশি করোনায় আক্রান্ত মানুষকে শনাক্ত করেছি। এ মাসটি গত মাসের মতো স্বস্তিকর যাবে বলে মনে হচ্ছে না।’

এ সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র আরও বলেন, ‘আমাদের প্রান্তিক পর্যায়ে যেসব হাসপাতাল আছে, সেখানে সেবা দেওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অক্সিজেন সাপ্লাই। হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার আগে আমার নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সাপ্লাই নিয়ে ভাবতে হবে। কারণ এটি হলো জীবন রক্ষাকারী। যারা মুমূর্ষু অবস্থায় চলে যাচ্ছে, তাদের অনেকেই লো ফ্লো অক্সিজেন সাপ্লাইয়ের মাধ্যমে সুস্থ হয়ে উঠছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহীতে করোনা সংক্রমণের হার বেড়ে গেছে। যে কারণে একটি মেডিকেল টিম সেন্ট্রাল থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে অবস্থান করছে। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে ইতিমধ্যে বলা হয়েছে, জরুরি রোগী ছাড়া যেন কাউকে ভর্তি নেওয়া না হয়। প্রয়োজনে পুরো হাসপাতাল করোনা সেবায় ব্যবহার করা হবে। প্রান্তিক অন্য এলাকায়গুলোতেও তা-ই বলা হয়েছে।’

দেশে টিকা তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে কাজ হচ্ছে : বাংলাদেশ টিকা তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে বলেও জানিয়েছেন অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন। তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমরা নিজেরাও টিকা তৈরি করতে চাই। এ নিয়ে বেশকিছু কাজ সরকারের পক্ষ থেকে করা হচ্ছে। কাজ করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও। বাংলাদেশে টিকা তৈরি করা হবে এ পরিকল্পনা নিয়ে আমরা যেকোনো সময় আলোচনায় আসতে পারব।’

তিনি জানান, চীন বাংলাদেশকে আরও ছয় লাখ টিকা উপহার হিসেবে দিচ্ছে আর এই টিকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ করা হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রোবেদ আমিন বলেন, ‘ফাইজারের টিকা অন্যসব টিকার মতো নয়, এটা অন্য টিকার চেয়ে সেনসেটিভ। এর সংরক্ষণে জটিলতা রয়েছে। তাই প্রান্তিক পর্যায়ে ফাইজারের টিকা দেওয়া সম্ভব হবে বলে আমরা মনে করি না। কোথায় কাদের এই টিকা দেওয়া হবে তা পরে জানিয়ে দেওয়া হবে। রাশিয়া থেকে যে ভ্যাকসিন আসবে সেটিও আমাদের আলোচনার মধ্যে আছে। এসব সমস্যার সমাধান হয়ে গেলে আমরা আশা করছি টিকা নিয়ে নিরাশ হওয়ার কিছু থাকবে না। সবাইকে ভ্যাকসিনেশনের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত