ডা. সাবিরা হত্যার তদন্তে কূল পাচ্ছে না পুলিশ

আপডেট : ০৭ জুন ২০২১, ০৫:৪৫ এএম

রাজধানীর কলাবাগানে গ্রিন লাইফ হাসপাতালের চিকিৎসক কাজী সাবিরা রহমান লিপি (৪৬) হত্যাকান্ড নিয়ে অন্ধকারে রয়েছে পুলিশ। সাত দিন পেরিয়ে গেলেও এ ঘটনায় জড়িত কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি। ঘটনার পর থেকে সন্দেহভাজন, প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতের স্বজনদের দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করেও কোনো ক্লু পায়নি। তবে ঘটনার আলামত বিশ্লেষণ করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, খুনি ঠান্ডা মাথায় খুন করেছে। ধারণা করা হচ্ছে ফজরের নামাজের আগে চিকিৎসক সাবিরাকে খুন করা হয়। তাকে প্রথমে পেছন থেকে ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে মৃত্যু নিশ্চিত করতে গলায় ধারালো চাকু দিয়ে আঘাত করা হয়। হত্যাকান্ড ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করতে ওই কক্ষে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

এদিকে গতকাল রবিবার দিনভর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ডা. সাবিরার সহভাড়াটিয়া নুরজাহানকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। পিবিআই দক্ষিণের এএসপি তৃপ্তি ম-ল জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। পিবিআইর কাছে হত্যার বিষয়ে কিছু জানেন না বলে দাবি করেছেন নুরজাহান। গত ঈদের দিন থেকে তিনি গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জে ছিলেন বলেও দাবি করেছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, হত্যাকা-টি ক্লুলেস ও জটিল। ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে চিকিৎসক সাবিরাকে। খুনি ফ্ল্যাটের সকল তথ্যই জানত। ফলে পালাতে সুবিধা হয় খুনির। বাড়িটির দারোয়ান সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করত না।

তারা আরও বলছে, ঘটনার ৫ দিন আগে থেকে ভোরে হাঁটতে বের হতো সহভাড়াটিয়া কানিজ সুবর্ণা। এই কানিজ সুবর্ণাকে সন্দেহ করছে নিহতের স্বজনরা। সাবিরার মামাতো ভাই রেজাউল হাসান মজুমদার জুয়েল কলাবাগান থানায় যে হত্যা মামলা করেন, তাতেও কানিজ সুবর্ণার দিকে সন্দেহের কথা উল্লেখ রয়েছে।

থানা পুলিশের পাশাপাশি পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি), পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন ও র‌্যাব হত্যাকান্ডের পর থেকে ছায়া তদন্ত শুরু করেছে। তারা বলছে, হত্যাকান্ডটি ক্লুলেস ও জটিল, রহস্য উদঘাটনে সময় লাগবে।

এ বিষয়ে গোয়েন্দা রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এইচ এম আজিমুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখনো হত্যাকান্ডের ক্লু উদঘাটন করা যায়নি। আমরা সম্ভাব্য সকল বিষয় আমলে নিয়ে তদন্ত অব্যাহত রেখেছি। যেহেতু হত্যাকা-টি ক্লুলেস সেহেতু উদঘাটনে একটু সময় লাগবে।’

পিবিআই দক্ষিণের এএসপি তৃপ্তিমন্ডল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি হত্যাকারীকে খুঁজে বের করতে। সহভাড়াটিয়া নুরজাহানকে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। সে দাবি করেছে কিছুই জানে না।’

ঘটনার পর আরেক সহভাড়াটিয়া কানিজ সুবর্ণা এবং তার এক বন্ধুকে ডিবি জিজ্ঞাসাবাদ করে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যে ভবনে হত্যাকান্ডটি ঘটেছে তার আশপাশে আরও ৫ থেকে ৬টি বহুতল ভবন নিয়ে শুধু একটি রাস্তা আছে। সেখানে কোনো বাড়িতেই সিসি টিভি নেই। এছাড়া লাশ উদ্ধারের দিন ভোর থেকে ওই ভবনের গেটে না বসে ওই দারোয়ান কয়েকবার অন্যত্র চলে যান। সহভাড়াটে কানিজ সুবর্ণাও ঘটনার ৫ দিন আগে থেকে প্রতিদিন সকালে হাঁটতে বের হতেন। ফলে সকালে বাসাটি ফাঁকা ছিল। দারোয়ানও ছিল না। ধারণা করা হচ্ছে, এই সময়ে সুযোগ বুঝে খুনি পালিয়ে যেতে পারে। মূল সড়কের সিসি টিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। এই রহস্য উদঘাটনে  আমাদের কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। তবে আমরা বিভিন্ন আলামত যাচাই-বাছাই করছি। বিশেষ করে চিকিৎসকের ফোন কল যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।’

এদিকে সাবিরার ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাবিবার প্রথম বিয়ে হয় ২০০৩ সালে। সেই স্বামী চিকিৎসক ছিলেন। তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। এই পক্ষে এক ছেলে রয়েছে সাবিরার। পরে ২০০৫ সালে ব্যাংকার সামসুদ্দিন আজাদকে বিয়ে করেন সাবিরা। সামসুদ্দিন আজাদের দ্বিতীয় স্ত্রী সাবিরা। আজাদের প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে ডিভোর্স হওয়ার পর সাবিরাকে বিয়ে করেন। প্রথম স্ত্রীর পক্ষের এক মেয়ে রয়েছে আজাদের। সাবিরার সঙ্গে বিয়ের পর আরেক মেয়ে হয়। রাজধানীর শান্তিনগরে নিজের ফ্ল্যাটেই থাকতেন তারা। ২০১৭ সাল থেকে মেয়েকে নিয়ে আলাদা থাকা শুরু করেন সাবিরা। প্রথমে মায়ের বাসায় থাকলেও পরে আলাদা ফ্ল্যাট নেন তিনি। সাবিরার ফ্ল্যাটে খুব একটা আসতেন না আজাদ। এ নিয়ে তাদের মধ্যে মনোমালিন্যও হতো। সাবিরা খুব জেদি প্রকৃতির ছিল।

নাম প্রকাশ না করে সাবিরার ঘনিষ্ঠ একজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাবিরা তার প্রথম ও দ্বিতীয় স্বামীর সম্পত্তি দাবি করেছিল। দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে মনোমালিন্যও চলছিল। এ কারণেও ঘটতে পারে হত্যাকান্ড। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবিরার স্বামী সামসুদ্দিন আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মরদেহ উদ্ধারের আগের রাতেও সাবিরার সঙ্গে ফোনে কথা হয়। আমি ৯টা ৫৭ মিনিটে সাবিরাকে মেসেঞ্জারে কল করি। কিন্তু তখন রিসিভ করেনি। পরে রাত ১০টা ২৮ মিনিটে আমাকে কল ব্যাক করে সাবিরা। প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিনিট কথা হয়। তখন স্বাভাবিকভাবেই কথা বলেছিল সে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি অসুস্থ থাকায় ওই বাসায় ঠিকমতো যেতে পারতাম না। এ নিয়ে তার ক্ষোভ ছিল। ঘটনার আগের রাতেও আমাকে বলেছে, বাসায় আসার সময় হয় না তোমার। আমি তখন বলি কাল আসি তাহলে। তখন আমাকে বলে না কাল তার দুই শিফটে অফিস। দুই দিন পরে যেতে।’

সম্পত্তি নিয়ে কোনো বিরোধ ছিল কিনা জানতে চাইলে আজাদ বলেন, ‘কারও সঙ্গে আমার কোনো বিরোধ নেই। সাবিরারও কোনো শত্রু নেই।’

গত ৩১ মে সকালে রাজধানীর কলাবাগানের ৫০/১ নম্বর ছয়তলা বাড়ির তৃতীয়তলার একটি ফ্ল্যাট থেকে গ্রিন লাইফ হাসপাতালের চিকিৎসক কাজী সাবিরা রহমানের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগে ওই ফ্ল্যাট থেকে আগুনের ধোঁয়া বের হতে দেখে স্থানীয়রা ফায়ার সার্ভিসে খবর দেন। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা আসার আগেই স্থানীয়রা সহভাড়াটে কানিজ সুবর্ণার সহায়তায় ফ্ল্যাটটিতে প্রবেশ করে। পরে সাবিরার কক্ষের তালা ভেঙে আগুন নেভায় তারা। ওই ফ্ল্যাটের যে কক্ষ থেকে সাবিরার লাশ উদ্ধার করা হয়, তার পাশে আরও দুটি কক্ষে দুই সহভাড়াটে থাকেন। তাদের একজন আরবি শিক্ষক নুরজাহান (২৭), অন্যজন মডেল কানিজ সুবর্ণা (২৫)।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত