বিশ্বজুড়ে আতঙ্কে স্বাস্থ্যকর্মীরা

আপডেট : ০৭ জুন ২০২১, ১১:১১ পিএম

করোনা ভাইরাসের এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ বা ভ্যাকসিন বের হয়নি যা খেলে বা দিলে আর করোনা থাকবে না। এমন অবস্থায় করোনায় সংক্রমিত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের প্রথম ভরসা স্বাস্থ্যকর্মী। স্বাস্থ্যকর্মীদের পরিচর্যা আর ওষুধের কারণে বহু রোগী সেরে উঠছেন করোনা থেকে। কিন্তু দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত গতকাল সোমবারের এক প্রতিবেদন বলছে, মহামারী পরিস্থিতির মধ্যে স্বাস্থ্যকর্মীরা সবচেয়ে বেশি আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই স্বাস্থ্যকর্মীরা মৌখিক ও শারীরিক আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। কেউ কেউ আবার হত্যার হুমকিও পাচ্ছেন।

ভারতে নতুন ভ্যারিয়েন্টের বিস্তারের পর স্বাস্থ্যকর্মীদের আক্রমণের শিকার হওয়ার ঘটনা বেশি ঘটছে। অনেক দেশেই এখন ভ্যাকসিন কার্যক্রম চলছে। কিন্তু টিকা স্বল্পতার কারণে কার্যক্রম শুরু হয়েও অনেক স্থানেই বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে টিকা নিতে আসা ব্যক্তিদের রোষের শিকার হচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি তালেঙ মোফোকেঙ বলেন, ‘কভিড সংক্রান্ত মানসিক চাপের কারণে স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর এ ধরনের হামলা আরও বাড়তে পারে। এটা একটা দুঃখজনক ব্যাপার। পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী আমাদের নেই। অনেকেই কভিডের সঙ্গে লড়াইয়ে মারা গেছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘সবকিছুর বাইরে আমরা জানি যে, উন্নয়নশীল দেশগুলো ভ্যাকসিন চেয়েও পাচ্ছে না। ওষুধ কোম্পানিগুলো তাদের ভ্যাকসিন ফর্মুলা দিতে চাইছে না। আমরা এমন এক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি যা আমাদেরই সৃষ্ট। সামনের দিনগুলোতে স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর এই চাপ আরও বাড়বে।’ মোফোকেঙ নিজেও একজন ডাক্তার। তার মতে, স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর চলমান হামলার ঘটনা হৃদয়বিদারক ও অপ্রত্যাশিত।

স্বাস্থ্যকর্মীদের আক্রমণের শিকার হওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু মহামারী বাস্তবতা আক্রমণের হার বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকারের মধ্য থেকে যোগ্য নেতৃত্বের অভাব ও স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না করার কারণে এই খাতের অবস্থা ভঙ্গুর। ফলে সরকারি গাফিলতির পুরো দায় নিতে হয় স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসকদের। দেশগুলোর সরকার সংকটময় সময় অতিক্রম করলেও, স্বাস্থ্যকর্মীদের সেবা দিয়ে যেতেই হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এমন বাস্তবতার মধ্যে তারা আর কতদিন সেবা দিতে পারবেন?

ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব দ্য রেডক্রসের (আইসিআরসি) মতে, গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর ৮৪৮ বার সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। যদিও আইসিআরসি’র প্রধান মাসিয়েজ পোলকউস্কির মতে, এই সংখ্যার চেয়েও সহিংসতার ঘটনা অনেক বেশি। অনেক হামলা ও নির্যাতনের ঘটনাই সামনে আসছে না বলেও তিনি মনে করেন। সংস্থাটি বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগীর আত্মীয়-স্বজন ও সম্প্রদায়ের মানুষ স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর চড়াও হচ্ছে। ভারত ও পাকিস্তানে হাসপাতালের মধ্যেই একাধিক আক্রমণের ঘটনা মিডিয়ায় এসেছে। মেক্সিকোতে রাস্তায় এক স্বাস্থ্যকর্মীর গায়ে ব্লিচিং পাউডার ছুড়ে মারার ঘটনাও ঘটেছে। স্পেনে তো স্বাস্থ্যকর্মীদের ‘দূষিত ইঁদুর’ বলেও আক্রমণ করা হয়। যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশেও হাসপাতালগুলোতে নিয়মিত মৌখিক নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।

রোগীর আত্মীয়-স্বজন ও সম্প্রদায়ের লোকজন স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর চড়াও হয় মূলত তাদের রোগীর মৃত্যু হলে অথবা মৃত্যু আশঙ্কা রয়েছে এমন ক্ষেত্রে। এমনও দেখা গেছে, করোনায় সংক্রমিত হয়ে মারা যাওয়ার কারণে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ মৃতের দেহ রীতি অনুসারে কবর দিতে বাধা দিয়েছে, আর এতে ক্ষিপ্ত হয়ে হাসপাতালের ওপর দলবদ্ধ হামলা চালিয়েছে মৃতের স্বজনরা। তবে পোলকউস্কির মতে, স্বাস্থ্যকর্মীরা রাষ্ট্রায়ত্ত বাহিনীর হাতেও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। মিয়ানমার, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ডের মতো দেশে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাই অনেক সময় আক্রমণ করছে স্বাস্থ্যকর্মীদের।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত