সরকারি কোনো কর্মকর্তাকে ১৫০ দিনের বেশি ওএসডি (অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি) করে রাখা যাবে না এমন নির্দেশনাসংবলিত হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। গতকাল সোমবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ২১ পৃষ্ঠার এ পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়েছে, কোনো কর্মকর্তাকে ১৫০ দিনের বেশি ওএসডি করে রাখা যাবে না এবং ওএসডি করা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের তদন্তকাজ ১৫০ দিনের মধ্যে অবশ্যই শেষ করতে হবে।
এ-সংক্রান্ত একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়া রুল যথাযথ ঘোষণা করে ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকারের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দিয়েছিল। আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী অনিক আর হক। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম (প্রয়াত) ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত দাসগুপ্ত। পরে রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ১৯ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালত হাইকোর্টের আদেশটির ওপর আট সপ্তাহের স্থগিতাদেশ দেয়।
রিটকারীর আইনজীবী অনিক আর হক গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত বছরের জানুয়ারিতে রায়ের পর এটি স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন (সিএমপি ফাইল) করার পর সেটি চেম্বার আদালতে স্থগিত হয়। পূর্ণাঙ্গ রায় আমরা আরও আগেই পেয়েছি। নিয়ম হলো এক মাসের মধ্যে আপিল করতে হবে। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতির আবেদন) করেনি। ইতিমধ্যে চেম্বার আদালতের স্থগিতাদেশটির কোনো কার্যকারিতা না থাকায় হাইকোর্টের ওই রায় বহাল রয়েছে।’ অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রায়টি আমি দেখব। এরপর সরকারের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে আপিলের সিদ্ধান্ত হবে।’
হাইকোর্টের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, কোনো কর্মকর্তাকে ওএসডি হিসেবে পদায়ন করা হলে অকারণে বিলম্ব না করে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সত্যতা নিরূপণের জন্য সরকারকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। কমিটি যদি অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পায়, তাহলে সরকারের উচিত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
রায়ে আরও বলা হয়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের তদন্ত নির্ধারিত ১৫০ দিনের মধ্যে অবশ্যই শেষ করতে হবে। এ বিষয়টি আদালতের সামনে আরও আগেই উত্থাপন করা আবশ্যক ছিল এমন উল্লেখ করে একটি প্রাচীন প্রবাদের উদ্ধৃতি দিয়ে রায়ে বলা হয়, ‘একেবারে না হওয়ার চেয়ে দেরিতে হওয়া ভালো।’ রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পরিচালকের উদ্দেশ্যে পাঠাতে বলা হয়।
ওএসডির সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না এমন যুক্তিতে ২০১২ সালের ৩১ মে সাবেক সচিব আসাফউদ্দৌলা হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। এতে উল্লেখ করা হয়, ১৯৯১ সালের ৩ অক্টোবর তৎকালীন সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে কী কী কারণে ওএসডি করে রাখা যায়, সে বিষয়ে এবং সময়সীমার কথা বলা আছে। কিন্তু অনির্দিষ্টকালের জন্য ওএসডি করে রাখা হচ্ছে, যা বেআইনি ও অসাংবিধানিক। সংবিধানের ২০ (২) অনুচ্ছেদ অনুসারে অনুপার্জিত আয় কোনো ব্যক্তি ভোগ করতে পারবে না। কিন্তু যাদের ওএসডি করে রাখা হচ্ছে, তারা কোনো দায়িত্ব ছাড়াই সরকারের কাছ থেকে বেতন-ভাতা ভোগ করছেন। জনগণের ট্যাক্সের অর্থ থেকে তাদের বেতন দেওয়া জনস্বার্থ ও সংবিধান পরিপন্থী। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে একই বছরের ৪ জুন রুল জারি করে হাইকোর্ট। রুলে নির্ধারিত কারণ ও সময়ের বাইরে সরকারি কর্মকর্তাদের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা করে রাখা এবং তাদের জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বেতন-ভাতা দেওয়া কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চাওয়া হয়। পাশাপাশি ওএসডি করার বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পক্ষে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা কেন করা হবে না রুলে তা-ও জানতে চাওয়া হয়। পাশাপাশি ১০ বছরে ওএসডি করা কর্মকর্তাদের তালিকা চেয়েছিল হাইকোর্ট। এরপর সরকারের পক্ষে এ তালিকা আদালতে দাখিল করা হয়।
