করোনায় মৃত হিন্দু দিনমজুরকে শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী মাটিতে সমাহিত করল ৩ মুসলিম

আপডেট : ১১ জুন ২০২১, ১০:৫৮ পিএম

করোনা পজেটিভে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারী দিনমজুর বিধান চন্দ্র মন্ডলের মাটিতে সমাহিত করে মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন সাতক্ষীরার শ্যামনগরের তিন মুসলিম তরুণ।

শ্যামনগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম আতাউল হক দোলন জানান, আতঙ্কিত স্ত্রী তার দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে পালিয়ে যান রাতেই। আশপাশের আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশীও গ্রাম ছেড়ে চলে যান। নিজ ঘরে পড়ে থাকা লাশের ধারেকাছেও কেউ আসেনি। ততক্ষণে লাশ পচে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে। ১৫ ঘণ্টা পর খবর পেয়ে শ্যামনগর মহসীন ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী হাফিজ, মিলন ও বাদশা সমাহিত করেন করোনায় মৃত হিন্দু যুবক বিধান চন্দ্র মন্ডলের।

চেয়ারম্যান দোলনের মতে শুক্রবার তারা অসাম্প্রদায়িকতার এ বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ভুরুলিয়া ইউনিয়নের গৌরীপুর গ্রামে।

সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন অফিসের মুখপাত্র ডা. জয়ন্ত সরকার জানান, গৌরীপুর গ্রামের দিনমজুর বিধান চন্দ্র মন্ডল (৩৭) করোনায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হন সাতক্ষীরা সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কয়েক দিন পর তাকে বাড়িতে নিয়ে অক্সিজেন সিলিন্ডার দিয়ে রেখে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিজ বাড়িতেই মারা যান বিধান।

বিধানের সমাহিতের এ ঘটনাকে তিনি মানবিকতার দৃষ্টান্ত বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনায় সাহায্য চাইলে সরকারেরই সৎকারের টিম আছে তারা অবশ্যই সাহায্যে এগিয়ে আসবে।

শ্যামনগরের কাচড়াহাটি গ্রামের হিন্দু সংগঠনের নেতা অনাথ মন্ডল জানান, চোখের সামনে তার মৃত্যু দেখেই আতঙ্কিত স্ত্রী শৈব রানী মন্ডল বাড়ি থেকে পালিয়ে যান তার দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে। খবর পেয়ে প্রতিবেশী স্বজনরাও লাশ সৎকার করার ভয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যান। রাতভর তার লাশ পড়ে থাকে ঘরেই। তখন সিডিওর এ কাজটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

বেসরকারি সংগঠন সিডিও’র পরিচালক গাজী ইমরান জানান, ঘুর্ণিঝড় ফনি, বুলবুল, আম্পান ও ইয়াসে যেভাবে তারা মানুষের জীবন রক্ষায় নিঃস্বার্থভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন সেভাবেই  শুক্রবার সকালে যখন খবর আসে শ্যামনগরের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সিডিওর কাছে। এই সংগঠনের তিন কলেজ শিক্ষার্থী যুবক জাতি-ধর্ম-বর্ণ বিবেচনায় না এনে বিধানের লাশ স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঘর থেকে বের করে আনেন। তারাই তাকে নিয়ে যান একটি শ্মশানের ধারে। পরে বিধান চন্দ্র মন্ডলের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী সেখানেই মাটি খুঁড়ে শায়িত করেন তার লাশ।

ইমরান জানান, মৃত্যুর আগে বিধান চন্দ্র বলেছিলেন, তাকে আগুনে দাহ না করে মাটিচাপা দিয়ে সমাধি দিতে। এ ঘটনা জানাজানি হতেই সাহসী তরুণ হাফিজ, মিলন ও বাদশা অসাম্প্রদায়িকতার এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

শ্যামনগর উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউল হক দোলন বলেন, বিধানের লাশের সৎকার হচ্ছে না জানতে পেরে তিনি ও অধ্যক্ষ জাফরুল্লাহ বাবু হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের অনুরোধ করেন। তারা কেউই রাজি না হওয়ায় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সিডিওর তিন মুসলিম তরুণ তার সমাহিত করেছেন।

তিনি জানান, মৃত্যুর আগে তিনি বলেছিলেন, তাকে আগুনে দাহ না করে সমাধি দিতে। তার ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে মাটি খুঁড়ে সমাধি দেয়া হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত