বাজেট কতটা গণমুখী

আপডেট : ১১ জুন ২০২১, ১১:৩২ পিএম

এ কথা শুনতে তো ভালোই লাগে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের জিডিপি বা মোট দেশজ উৎপাদন ৩০ লাখ ৮৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। মাথাপিছু আয় ২ হাজার ২২৭ ডলার বা বার্ষিক ১ লাখ ৮৮ হাজার ৮৭৩ টাকা। গত বছরের তুলনায় আয় বেড়েছে ৯ শতাংশ। এই হিসাবে বাংলাদেশের শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত প্রত্যেক নাগরিকের মাসিক আয় ১৫ হাজার ৭৩৯ টাকা। অর্থাৎ ৫ সদস্যের একটি পরিবারের মাসিক আয় দাঁড়ায় ৭৮ হাজার ৬৯৫ টাকা। মাথাপিছু আয়ের এই হিসাব শুনে দেশের বেশির ভাগ মানুষের ভালো লাগার কথা। কিন্তু বাস্তবতা তো তা নয়। বাস্তবে ১৫ হাজার টাকার নিচে মাসিক আয় এ রকম পরিবারের সংখ্যা কয়েক কোটি। অবশ্য বাংলাদেশে এমন কিছু মানুষ আছেন যারা মাসে নয়, প্রতিদিনেও এর চেয়ে বেশি আয় করেন। এই করোনাকালে এক কোটি টাকার বেশি আছে এমন ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি বেড়েছে। এদের মধ্যে এক কোটি থেকে পাঁচ কোটি টাকা জমা আছে এমন আমানতকারীর সংখ্যা বেড়েছে ৭ হাজার ১৩৩ জন, পাঁচ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকা আছে এমন আমানতকারীর সংখ্যা বেড়েছে ২৫০০ জনের বেশি আর ৫০ কোটি টাকার বেশি টাকা আছে এমন আমানতকারীর সংখ্যা বেড়েছে ১১৪ জন। অন্যদিকে, ব্যাংকগুলোতে ৭ কোটি ৫২ লাখ ৯৪ হাজার ৪৫১ জন আমানতকারী আছেন যাদের গড়ে সঞ্চয় আছে ৬১০ টাকা। এই আর্থিক চিত্র প্রমাণ করে অল্প কিছু মানুষ বিপুল গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে কোটি কোটি মানুষকে পেছনে ফেলে। করোনা কাউকেই থামাতে পারে নাই। দ্রুতগতিতে বেড়েছে ধনীদের ধনী হওয়া আর গরিবের হতদরিদ্র হওয়া। এই পরিস্থিতিতে বাজেট ২০২১-২২ ঘোষণা হয়েছে। ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার এই বাজেট আয়তনে বৃদ্ধি পেয়েছে যতখানি সাধারণ মানুষের জন্য, সেই পরিমাণে বরাদ্দ কি বেড়েছে? জীবন ও জীবিকার প্রাধান্য দেওয়া হবে এ কথা বলে বাজেট ঘোষণা হলেও তা সাধারণ মানুষের জীবনের ও জীবিকার প্রয়োজন কী এবং বাজেটে বরাদ্দ কতটুকু তা দেখলে বুঝতে কোনো অসুবিধা হবে না যে, ঘোষণার সঙ্গে বাজেট সংগতিপূর্ণ নয়। বরং এই বাজেট করোনাকালীন সাধারণ মানুষের জীবনমান রক্ষা ও জীবিকার নিশ্চয়তার চেয়ে বৈষম্য বাড়িয়ে তুলবে। ভ্যাটের আওতা সম্প্রসারিত হবে মানে স্বল্প আয়ের মানুষ এবং সস্তা দ্রব্যের ক্রেতা ভ্যাট দেবেন। জনসাধারণ চান বা না চান প্রতি বিভিন্ন রকম শুল্ক, কর বাবদ এক কেজি চিনিতে ২৫ টাকা এবং প্রতি লিটার তেলে ২০ টাকার বেশি দিয়ে থাকেন। মোবাইল ফোন ব্যবহারে ১০০ টাকায় ৩৩ টাকা ৫২ পয়সার বেশি কর দিচ্ছেন গত বছর থেকে। কর দিতে জনগণ বাধ্য। কিন্তু করের টাকা কোথায় খরচ হবে তা জানার অধিকার কি থাকবে না? জনগণের করের টাকা জনগণের স্বার্থে ব্যবহার করা হোক এই দাবি কি ন্যায্য নয়?

শ্রমজীবীদের আয়ের ৬০ শতাংশের বেশি খরচ হয়ে যায় খাদ্যদ্রব্য কিনতে। তাই খাদ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, শ্রমিক-কৃষক, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবীদের জীবন বাঁচাতে রেশনব্যবস্থা চালু, শ্রমজীবীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল ও চিকিৎসায় বরাদ্দ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন ছিল। যে কৃষি ৪২ শতাংশ শ্রমজীবীর কর্মসংস্থান করেছে, সেখানে বরাদ্দ ও ভর্তুকি বাড়ানো দরকার ছিল কিন্তু বাজেটে তিন বছর ধরে কৃষি খাতে ভর্তুকি প্রায় একই পরিমাণ অর্থাৎ ৯৫০০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। ফলে মুদ্রাস্ফীতির বিবেচনায় কৃষিতে ভর্তুকি কমে গিয়েছে। বলা হয়েছে, কৃষি যন্ত্রপাতির জন্য সরকার ভর্তুকি দেবে। ১০ বিঘার কম কৃষিজমির মালিক যে কৃষক, যারা দেশের কৃষির প্রধান ভিত্তি, কৃষি যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষেত্রে এই সহায়তা তারা কীভাবে পাবেন জানা নেই।

করোনা দেখিয়ে দিয়েছে আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থা কত দুর্বল, চিকিৎসা খাতে বরাদ্দ কত কম, পাশাপাশি চিকিৎসা বরাদ্দ কীভাবে দুর্নীতি ও লুটপাটে শেষ হয়ে যায়। দুর্নীতি বন্ধ হবে কি না তার আশ্বাস না পেলেও জনগণ দেখল যে চিকিৎসা খাতে বরাদ্দ তুলনামূলক কমে গেছে। গত বাজেটে জিডিপির অংশ হিসেবে বরাদ্দ ছিল ১.০২ শতাংশ, এবার তা জিডিপির ০.৯৫ শতাংশ। গত অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটের অংশ হিসেবে বরাদ্দ ছিল ৫.৮৪ শতাংশ, এবার তা দাঁড়িয়েছে বাজেটের ৫.৪২ শতাংশ। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাবে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার জন্য বরাদ্দ দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম। বাগাড়ম্বর যতই থাকুক না কেন, ১২ বছর ধরে জিডিপির ১ শতাংশের নিচেই থাকছে। স্বাস্থ্য খাতে খরচের ২৬.১৩ শতাংশ খরচ করা হয় সরকারি বরাদ্দ থেকে। ফলে ওষুধ ও চিকিৎসা খরচের ৭৩.৮৭ শতাংশ খরচ জনগণকেই বহন করতে হয়। রোগ নির্ণয়ের জন্য টেস্টের খরচ অস্বাভাবিক বেশি, ওষুধের দাম বেশি, ফলে রোগের চেয়ে চিকিৎসা খরচের আতঙ্ক অনেক বেশি। এবারের বাজেটেও সেই ধারা অব্যাহত থাকল অর্থাৎ ব্যক্তিগত খরচ কমানোর কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে চিকিৎসায় বাণিজ্যিকীকরণ আরও উৎকট হবে, চিকিৎসা করতে গিয়ে নিঃস্ব হওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়বে।

সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। করোনার কারণে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা এখন ৪২ শতাংশের বেশি অর্থাৎ প্রায় ৭.৫০ কোটি। তাদের জীবন রক্ষায় কী করা হবে, কত প্রয়োজন তার কোনো উল্লেখ নেই। বাজেটে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ করা হয়নি। নতুন করে দারিদ্র্য হয়েছে ২.৫ কোটি মানুষ। কিন্তু উপকারভোগীর সংখ্যা গত বাজেটের তুলনায় ১৪ লাখ বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি। এ সংখ্যা বৃদ্ধি যেন সমুদ্রে এক ফোঁটা পানির মতো। মাসে ৭৫০ টাকা করে সহায়তা করলে বছরে প্রয়োজন ৯ হাজার কোটি টাকা। তাহলে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে বলে বলা হচ্ছে তা কোথায় খরচ হবে? পেনশন, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, ঋণের সুদ পরিশোধ যুক্ত করে সামাজিক নিরাপত্তা খাত এত বড় দেখানোর উদ্দেশ্য কী?

অর্থমন্ত্রী বলেছেন দারিদ্র্য বৃদ্ধির তথ্য তিনি বিশ্বাস করেন না। কিন্তু বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে ৬ কোটি ৮২ লাখ শ্রমজীবীর মধ্যে করোনায় কাজ হারিয়েছে ১ কোটি ৫৬ লাখ শ্রমিক, যাদের কাজ আছে তাদের আয় কমেছে ২০ শতাংশ, কাজ না থাকায় খাদ্যব্যয় কমাতে বাধ্য হয়েছে ৫২ শতাংশ মানুষ। অন্যদিকে রেমিট্যান্স সৈনিক বলে আখ্যায়িত শ্রমিকরা ২২.৭৫ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার ভা-ার পূর্ণ করলেও ৬ লাখের বেশি প্রবাসী শ্রমিক দেশে ফিরেছে, তাদের জন্য কী আছে বাজেটে? প্রতি বছর শ্রমের বাজারে আসে ২২ লাখ তরুণ যুবক, তাদের কর্মসংস্থানের কোনো পদক্ষেপ বাজেটে নেই। বলা হয়েছে, আইটি সেক্টরে ১০ লাখ কর্মসংস্থান হবে। এই প্রত্যাশার বাস্তবায়ন হবে কীভাবে তা বলা নেই। সাড়ে চার কোটি শিক্ষার্থী এবং ২০ লাখের বেশি শিক্ষক করোনাকালে বিপর্যস্ত। ছাত্রদের জন্য শিক্ষা সহায়তা এবং শিক্ষকদের জন্য দুর্যোগ ভাতা প্রয়োজন থাকলেও বাজেটে তার নির্দেশনা নেই। বিগত বাজেটে জিডিপির ২.০৯ শতাংশ এবং বাজেটের ১২.২৮ বরাদ্দ ছিল, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সব দেশের চেয়ে কম। এবার সেটা তো বাড়েইনি বরং একটু কমে জিডিপির ২.০৮ শতাংশ এবং বাজেটের ১১.৯২ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ হিসেবে বেসরকারি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। দেশের ২৫০০-এর মতো কলেজের মধ্যে ৩০৬টি সরকারি, বাকিগুলো বেসরকারি। স্বাধীনতার ৫০ বছর পার হলেও এখনো ৪৮৯টি উপজেলার সব কটিতে সরকারি কলেজ নেই। মেডিকেল কলেজ ৬৫টি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ১০৭টি। এ ছাড়া কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় নাম নিয়ে চলা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক। মোট ছাত্রছাত্রীর ৮০ শতাংশের বেশি পড়াশোনা করে বেসরকারি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে। এসব প্রতিষ্ঠানে ভ্যাট আরোপ মানে ছাত্রছাত্রীর বেতন ফি বৃদ্ধি। বলা হয়েছিল, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনা করা যাবে না। বাজেটের এই ঘোষণার ফলে এসব প্রতিষ্ঠান এখন প্রবলভাবে বাণিজ্যিক হবে এবং শিক্ষাব্যয়ের আঘাত বাড়বে সাধারণ মানুষের জীবনে।

কালোটাকা বৈধ করার ধারাবাহিক পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয় যে কালোটাকা উৎপাদনের ব্যবস্থা বহাল আছে। বাজেটের আগেই ১০ হাজারের বেশি ব্যক্তি কালোটাকা বৈধ করেছেন। এরা শেয়ারবাজার, জমি বা ফ্ল্যাট কিনে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি বৈধ করেছেন আর এনবিআর রাজস্ব পেয়েছে ১ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা। বৈধভাবে ট্যাক্স দিতে হয় ৩২.৫ শতাংশ আর কালোটাকা বৈধ করতে ট্যাক্স দিতে হয় ১০ শতাংশ। এই সুযোগ নেবেন না কেন কালোটাকার মালিকরা?

বিশাল বাজেটের বড় বোঝা কে বহন করবে? বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য যে ঋণ করা হবে তার সুদ ও আসল কে শোধ দেবে? শ্রমজীবী ও নিম্ন মধ্যবিত্তদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য উন্নত করা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করার জন্য টাকা কই? বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে নজর ও পক্ষপাতিত্ব ধনী, শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের দিকে। বড় বাজেটের বড় বোঝা চাপানো হলো সাধারণ মানুষের ওপর কিন্তু সুফল সব ধনীর গোলাতেই যাবে। বাজেট যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়নি তা স্পষ্ট। কারণ কৃষক এবং শ্রমিকদের কোনো স্তরের প্রতিনিধির সঙ্গেই বাজেট প্রণয়নের আগে আলোচনা করা হয়নি। বাজেটের জন্য অর্থ সংগ্রহ আর বাজেটের অর্থ ব্যয় করা কোনো ক্ষেত্রেই জনগণের ইচ্ছা ও প্রয়োজনের স্বীকৃতি নেই। বাস্তবে ধনীদের স্বার্থে আমলাদের দ্বারা প্রণীত এই বাজেট জনজীবনে দুর্ভোগ বাড়িয়েই তুলবে।

লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট
[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত