বিশ্বে চা উৎপাদনকারী দেশসমূহের মধ্যে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। চা পান ও চা উৎপাদনের ইতিহাস সেই আদিকালের। ব্রিটিশ শাসনামলেই চা-শিল্পের উত্থান। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৮৪০ সালে প্রথম চা ব্যবসা শুরু করে। ১৮৫৫ সালে ব্রিটিশরা সিলেটে সর্বপ্রথম চায়ের গাছ খুঁজে পায়। এরপর ১৮৫৭ সালে সিলেটের মালনীছড়ায় বাণিজ্যিকভাবে চা-চাষ শুরু হয়। সে সময় চায়ের ব্যবহারও খুব বেশি ছিল না। ফলে স্বল্প পরিসরে চা-চাষ করেই যে চা উৎপাদন হতো, তা দিয়েই চাহিদা পূরণ হতো। দীর্ঘসময়ে চা পান অতি আবশ্যকীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন চা ছাড়া কোনো মানুষের যেন জীবনই চলে না। মানুষ ঘুম থেকে উঠেই চা পানের মধ্য দিয়ে দিনের কাজ শুরু করেন। অতিথি আপ্যায়নে চা এখন অতি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে প্রচুর পরিমাণে চায়ের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। আবার দীর্ঘ এ সময়ে বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে চায়ের চাষও হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ১৬৭টি বাণিজ্যিক চা এস্টেট রয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটি হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কর্মক্ষম চা বাগান। চায়ের কদর এবং চাহিদা শুধু বাংলাদেশেই নয়, পুরো বিশ্বে সমানভাবে সমাদৃত। এখন বিশ্বের মোট চাহিদার চায়ের ৩% শতাংশ চা বাংলাদেশে উৎপাদন হয়। আর এ শিল্পে নানাভাবে প্রায় ৪০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
সুবিধা হচ্ছে, উঁচু সমতল, অসমতল, পাহাড়ি এলাকা, উষ্ণ জলবায়ু, আর্দ্র এবং অতিবৃষ্টিপ্রবণ এলাকাসমূহে উন্নতমানের চা উৎপাদন হয়ে থাকে। আমাদের দেশে মৌলভীবাজার, সিলেটে ব্যাপকভাবে চায়ের চাষ হয়ে থাকে। হবিগঞ্জেও ১৮৬০ সাল থেকে চায়ের চাষ হচ্ছে। এমনকি ২০০০ সালে উত্তরবঙ্গের পঞ্চগড়েও চায়ের চাষ শুরু হয়। এখন সেখানেও চায়ের আওতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
২০০৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামেও চায়ের চাষ শুরু হয়। বর্তমানে চা বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসলে পরিণত হয়েছে। দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও ক্রমাগত নগরায়ণের কারণে চায়ের অভ্যন্তরীণ চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে দেশীয় চাহিদা পূরণ করে বিদেশে চায়ের রপ্তানি কিছুটা কমে এসেছে। তার পরও দেশীয় চাহিদা পূরণ করে এখনো প্রতি বছর আনুমানিক ১ দশমিক ৩ মিলিয়ন কেজি চা বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। এখন বাংলাদেশের চা কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, পোল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইরান, যুক্তরাজ্য, আফগানিস্তান, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, কুয়েত, ওমান, সুদান, সুইজারল্যান্ডসহ অনেক দেশেই রপ্তানি হচ্ছে। উল্লেখ্য, গত দশ বছরে পৃথিবীতে চায়ের চাহিদা দ্বিগুণ বেড়েছে। এই চাহিদার সঙ্গে সমন্বয় রেখে বাংলাদেশ, কেনিয়া ও শ্রীলঙ্কা পৃথিবীর ৫২ ভাগ চায়ের চাহিদা পূরণ করছে। তবে শঙ্কার বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও নগরায়ণের কারণে দিন দিন যে হারে চায়ের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে দেশে চা চাষের আওতা সম্প্রসারিত করতে না পারলে বিদেশে চা রপ্তানি করা ভবিষ্যতে খুব কঠিন হয়ে পড়বে। চা সংসদের তথ্য মতে, দেশে বর্তমানে মোট ১ লাখ ১৫ হাজার ৯০৪ হেক্টর জমিতে এ, বি এবং সি এই তিন শ্রেণির ১৬৩টি বাগানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাগান অর্থাৎ ৯০টি বাগান রয়েছে মৌলভীবাজার জেলায়। এ ছাড়া হবিগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রাম, পঞ্চগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও রাঙ্গামাটিতে চায়ের চাষ হচ্ছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় উৎপাদন সে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে না। ফলে সরকার সমগ্র বাংলাদেশে চা আবাদের সম্ভাব্য সমীক্ষা পরিচালনা করে রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, জামালপুর, ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইলের মধুপুর, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার জেলায় মোট ১ লাখ ১ হাজার ৭২ হেক্টর ক্ষুদ্রায়তনের চাষযোগ্য জমি চিহ্নিত করে চাষের আওতায় আনার চেষ্টা করছে। অবশ্য স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে বাংলাদেশে চায়ের উৎপাদন বছরে ৩১ মিলিয়ন কেজি থেকে বেড়ে ৬৪ মিলিয়ন কেজিতে পৌঁছেছে। আবাদি জমি ৪২ দশমিক ৬ হাজার হেক্টর থেকে বেড়ে ৬০ হাজার হেক্টর হয়েছে। আবার গবেষণা প্রসূতজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুবাদে হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন ৭৩৫ কেজি থেকে ১২৭০ কেজিতে উন্নীত হয়েছে।
চা-শিল্পের উন্নয়নে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের অবদান অপরিসীম। ১৯৫৭ সালে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই)-টি প্রতিষ্ঠিত হয়। চায়ের রাজ্য হিসেবে খ্যাত শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটি গবেষণার মাধ্যমে উন্নততর প্রযুক্তি প্রয়োগে উচ্চ ফলনশীল জাতের বীজ উদ্ভাবন করেছে। বিটিআরআই তার জন্মলগ্ন থেকে সীমিত সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়ে চা-শিল্পের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে উদ্ভাবন করেছে অনেক লাগসই প্রযুক্তি। বিটিআরআইয়ের গবেষকরা উচ্চফলনশীল ও আকর্ষণীয় গুণগতমানের ১৮টিরও অধিক ক্লোন উদ্ভাবন করেছেন। এসব উদ্ভাবিত চায়ের ক্লোনগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা হেক্টরপ্রতি তিন হাজার কেজি থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে চার হাজার কেজি পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ক্লোন বিটি-১৯ ও বিটি-২০ চা-শিল্পের জন্য বড় মাপের অবদান রাখতে সক্ষম হবে। এ ছাড়া চায়ের ক্লোন উদ্ভাবনের পাশাপাশি চার ধরনের মাই-ক্লোনাল ও এক প্রকারের পলিক্লোনাল বীজ উদ্ভাবন করেছে বিটিআরআই। জার্মপ্লাজম-সমৃদ্ধ জিন ব্যাংক স্থাপন করেছে ৫১৭টি। এমনকি উচ্চ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন উন্নতমানের চায়ের ক্লোন উদ্ভাবন করে ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা স্বর্ণপদকও পেয়েছেন। মরহুম এস এম আলী, ড. এস এ রশিদ, প্রয়াত হারাধন চক্রবর্তী ও এ এফ এম বদরুল আলম স্বর্ণপদক লাভ করেছেন। এ ছাড়া ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. কে এ হাসান চা-শিল্পে তার অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৮০ সালে জাতীয় পুরস্কারও লাভ করেন।
এর পরও নানা বাস্তবমুখী সমস্যার কারণে কাক্সিক্ষত পরিমাণ সমৃদ্ধি চা-শিল্পে আসেনি। বিশেষ করে চা-শিল্পে বিনিয়োগের অভাবে তীব্র আর্থিক সংকট, ব্যাংকঋণের স্বল্পতা, অধিক সুদহারের কারণে চা-শিল্পের সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ চা-শিল্পে নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত করেছে। চা এখন শুধু পানীয় পণ্যই নয়, চায়ের পাতা থেকে বিজ্ঞানীরা পরিবেশবান্ধব নানা পণ্য উদ্ভাবনে সক্ষম হয়েছেন। বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিটিআরআই) বিজ্ঞানীদের নিরন্তর প্রচেষ্টা ও গবেষণায় চা পাতা দিয়ে গ্রিন-টি সাবান, গ্রিন-টি ফেসিয়াল, টি ক্যান্ডি, টি ফ্লেভারড চাটনি, টি ফ্লেভারড কুকিজ ও টি আচার উদ্ভাবনে সফল হয়েছেন। প্রাথমিকভাবে চা থেকে এসব ভ্যালু অ্যাডেড পণ্য উদ্ভাবনের পাশাপাশি কসমেটিকস উদ্ভাবনে আরও গবেষণা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
চা বোর্ড অকশনের গড় মূল্যের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি কেজি কাঁচা চা পাতার দাম ২৫ দশমিক ৭৫ টাকা। এর বিপরীতে দৈনিক ১০২ টাকা মজুরির জন্য নির্ধারিত ২৩ কেজি চায়ের পাতা তুলতে হবে। শ্রমিকরা সারা দিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে ৩৫ থেকে ৪০ কেজি পাতা তুললেও আনুপাতিক হারে যে পরিমাণ মজুরি পাওয়ার কথা, অনেক সময় সঠিক হিসাবে তাও দেওয়া হয় না। সর্বশেষ পারিশ্রমিক ১০২ টাকার স্থলে ১৮ টাকা বৃদ্ধি করে ১২০ টাকা করা হয়েছে। বাস্তবে বাড়তি নিত্যমূল্যের বাজারে চা শ্রমিকরা যে মজুরি পান, তা দিয়ে আর যাই হোক জীবন চলতে পারে না। এ নিয়ে প্রায়ই আন্দোলন হয় ঠিকই, কিন্তু উল্লেখযোগ্য কিছু আদায় হয় না। যদিও সরকার শ্রমিকদের মজুরি ও সুবিধাদি নিশ্চিত করতে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। এর পরও শ্রমিকদের উপযুক্ত শ্রমমূল্য আজও নিশ্চিত হয়নি। তবে চা-শিল্পের সম্ভাবনাকে সমৃদ্ধ করতে হলে চা শ্রমিকদের জীবন-জীবিকার দিকেও মালিক পক্ষকে তাকাতে হবে, তা না হলে প্রকৃত অর্থে মালিক পক্ষ একতরফাভাবে সমৃদ্ধ হবে ঠিকই, কিন্তু চা বাগানের গরিব, অসহায় শ্রমিকদের শ্রম শোষণের জাঁতাকলেই পিষ্ট হতে হবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
লেখক : কৃষিবিষয়ক লেখক
