‘থোড়াই কেয়ার’ বা ‘ড্যাম কেয়ার’ ভাব বলে একটা শব্দবন্ধ আমাদের নিত্যদিনের আলাপমালায় চালু আছে। যে কোনো কিছু শোনে না, মানে না এবং পরোয়া করে না, তাকে আমরা ‘ড্যাম কেয়ার’ বলে বিশেষায়িত করি। ব্যক্তি পর্যায়ে আমাদের আত্মীয়, পরিজন, বন্ধু, এবং জানাশোনা মানুষদের মধ্যে খুঁজলে এরকম দুয়েকজন ‘ড্যাম কেয়ার’ পাওয়া যাবে। কিন্তু কোনো ‘ড্যাম কেয়ার’ রাষ্ট্র খুঁজতে গেলে, টর্চ লাইট দিয়ে খুঁজেও মানচিত্রে দুয়েকটা পাওয়া বিরল। কিন্তু ‘ঘর থেকে দু’পা ফেলিয়া’, যদি ‘চক্ষু মেলিয়া’ দেখি, তাহলে দেখব আমাদের প্রতিবেশী দেশই সেই ‘ড্যাম কেয়ার’ রাষ্ট্রের একটি নগদ নজির। বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যাক।
গত ১৮ জুন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। অবশ্য মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে গৃহীত এটাই প্রথম কোনো প্রস্তাব নয়। এর আগেও বহুবার মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বহু প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। বহু ‘আহ্বান’ জানানো হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৭ সালে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর যে জেনোসাইড চালানো হয়েছিল, তা নিয়ে জাতিসংঘের বিভিন্ন অধিবেশনে বিভিন্ন প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু মিয়ানমার জাতিসংঘ এবং জাতিসংঘের এসব প্রস্তাবকে ‘থোড়াই কেয়ার’ করে। মানবাধিকারের সমস্ত আন্তর্জাতিক বিধিবিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মিয়ানমারের জান্তা সরকার ১৯৬২ সালের পর থেকে দেশটিতে সামরিক শাসন জারি রেখে বিভিন্ন রাজ্যে জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর অমানবিক নির্যাতন, অত্যাচার এবং হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। জাতিসংঘ বারবার রুটিন ‘আহ্বান’ জানিয়েছে এবং রিচুয়ালিস্টিক ‘প্রস্তাব’ গ্রহণ করেছে আর মিয়ানমার সমান ঔদ্ধত্য দেখিয়ে একটা ‘ড্যাম কেয়ার’ ভাব নিয়ে সেসব ‘আহ্বান’ ও ‘প্রস্তাব’কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। ২০১১ সালের পর মিয়ানমারের সামরিক ছায়ায় তথাকথিত গণতন্ত্রায়ন শুরু হলেও ২০১৫ সালে সাধারণ নির্বাচনে সু চি’র নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি যখন সরকার পরিচালনার দায়িত্বে আসে বিশ্ববাসীর মতো আমরাও আশা করেছিলাম যে, মিয়ানমার এবার বুঝি সত্যিকার গণতন্ত্রায়নের দিকে যাবে এবং মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতির সত্যিকার উন্নতি ঘটবে। গণতন্ত্রের মানসকন্যা খ্যাত অং সান সু চি মিয়ানমারকে সত্যিকার গণতন্ত্রায়নের দিকে নিয়ে যাবে, এটাই সবাই প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু আমরা দেখলাম ২০১৬ সালে রাখাইনের রোহিঙ্গাদের ওপর চরম মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটল এবং অমানবিক নির্যাতন চালাল মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। আর ২০১৭ সালের আগস্টের ২৫ তারিখের পর রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী নিরীহ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ, নিষ্ঠুর নির্যাতন, নির্বিচার ধর্ষণ এবং নির্বিচার অগ্নিসংযোগ চালায়। যার ফলে বাংলাদেশে কোনো রকমে জান নিয়ে পালিয়ে আসে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা। বিশ্বব্যাপী এ হত্যাযজ্ঞকে আধুনিক জেনোসাইডের জ্বলন্ত উদাহারণ হিসেবে বিবেচনা করে তীব্র নিন্দা জানানো হয়। কিন্তু মিয়ানমারের এতে কি কিছু গেছে-আসছে? মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জেনোসাইডের মতো অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ এনে গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা করে। সে মামলার শুনানিতে মিয়ানমারের তৎকালীন সরকারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি সশরীরে উপস্থিত থেকে সামরিক বাহিনী কর্তৃক সংঘটিত জেনোসাইডের সপক্ষে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেছিল। সারা দুনিয়াতে সু চি এবং সামরিক বাহিনীর এ ভূমিকার জন্য নিন্দা জানানো হয়। কিন্তু এতে করে মিয়ানমারের আদৌ কি কিছু গেছে বা আসছে?
২০২০ সালের নভেম্বরের ৮ তারিখ মিয়ানমারের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ৮৩ শতাংশ ভোট পেয়ে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে সু চি’র নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি নতুন করে ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারির ১ তারিখ নবনির্বাচিত সরকারের যেদিন প্রথম পার্লামেন্ট বসার কথা সেদিনই সামরিক বাহিনী মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট এবং স্টেট কাউন্সিলর সু চি’সহ প্রথম শ্রেণির সব রাজনীতিবিদদের গ্রেপ্তার করে মিয়ানমারের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নেয়। জাতিসংঘসহ গোটা দুনিয়া এর তীব্র নিন্দা জানায়। কিন্তু এতে মিয়ানমারের কি কিছু আসছে-গেছে? সেনা অভ্যুত্থানের কারণে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন মিয়ানমারের ওপর নানান ধরনের সামরিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। কিন্ত মিয়ানমার এসবে ‘থোড়াই কেয়ার’ করে। তাই প্রশ্ন হচ্ছে, গত ১৮ জুন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যে প্রস্তাব গৃহীত হয়, তাতে মিয়ানমারের আদৌ কি কিছু যায়-আসে?
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এ প্রস্তাবের মূল বিষয় হচ্ছে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর জনগণের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার ও সহিংসতা বন্ধ করার আহ্বান। এছাড়াও জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রসমূহকে মিয়ানমারের অস্ত্র সরবরাহ বন্ধে কাজ করারও আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি এ প্রস্তাবে ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের জন্যও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গ্রেপ্তারকৃত প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ট, স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি ও অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাকে মুক্তি দেওয়ার আহ্বানও এ প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়, তারা যেন বিভিন্ন রাজ্যে জারিকৃত জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করে এবং বিক্ষোভকারীদের প্রতি সহনশীল আচরণ করে মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে। এ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয় ১১৯টি সদস্য রাষ্ট্র। একটি মাত্র দেশ বিপক্ষে ভোট দেয়, সেটা হচ্ছে বেলারুশ। আর ভোটদানে বিরত থাকে নেপাল, ভুটান, লাউস ও থাইল্যান্ডসহ প্রায় ৩৬টা দেশ। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে মিয়ানমারের তিন প্রধান মিত্র রাশিয়া, চীন ও ভারতও এ প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান না-দিয়ে ভোটদানে বিরত থাকে। বাংলাদেশও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ভোটদানে বিরত থাকা এ ৩৬টা দেশের মধ্যে একটি। বাংলাদেশ কেন মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আনীত প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত ছিল তার একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হয়েছে এভাবে : যেহেতু এ প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে কোনো কিছু উল্লেখ নেই। রোহিঙ্গাদের ভরণ-পোষণ ও প্রত্যাবাসন বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাবনা না-থাকার কারণে বাংলাদেশ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আনীত প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত থাকে। ভোটদানে বিরত থাকাটা প্রস্তাবের পক্ষে বা মিয়ানমারের বিপক্ষে না-গিয়ে উল্টো মিয়ানমারের পক্ষে গেছে কি না তা নিয়ে বিতর্ক চলছে দেশে ও বিদেশে। এক পক্ষ বলছে, বাংলাদেশ বিরত থেকে ঠিকই করেছে কেননা মিয়ানমার নিয়ে সবার মাতামাতি কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে কারও কোনো আগ্রহ নেই। সুতরাং মিয়ানমার ইস্যুতে বিরত থেকে বাংলাদেশ তার প্রতীকী প্রতিবাদ জানিয়েছে। আরেক পক্ষ বলছে, বিরত থাকা মানে কিন্তু মিয়ানমারের পক্ষে যাওয়া নয়। যদিও ভোটদানে বাংলাদেশের বিরত থাকা জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় খুব বেশি কোনো প্রভাব পড়েনি।
এদিকে বরাবরের মতো মিয়ানমারের নির্বিকার এবং ‘ড্যাম-কেয়ার’ ভাব। কেননা জাতিসংঘের এসব ‘প্রস্তাব’ এবং ‘আহ্বান’, মিয়ানমারের কাছে রীতিমতো ‘মশকারা’ জাতীয় ‘কাতুকুতুতে’ পরিণত হয়েছে। মিয়ানমার ইতিমধ্যে অত্যন্ত শক্ত ভাষায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের গৃহীত এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। সত্যি বলতে কি, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক সেন্টার পয়েন্ট হওয়ার কারণে, প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর হওয়ার কারণে, ভারত ও চীনের মতো আঞ্চলিক পরাশক্তির অবিরাম সমর্থনের কারণে, রাশিয়ার একচেটিয়া পাশে দাঁড়ানোর কারণে, জাপানের প্রায় শর্তহীন অর্থনৈতিক প্রণোদনার কারণে এবং সর্বোপরি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে চীন ও রাশিয়ার অন্ধ সমর্থনের কারণে মিয়ানমার পৃথিবীর মানচিত্রে এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, যারা মানবাধিকারের কোনো তোয়াক্কা করে না, গণতন্ত্রের কোনো ধার ধারে না এবং নির্বিচারে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস করতে কাউকে পরোয়া করে না। একবিংশ শতাব্দীতে মিয়ানমার সামরিকতন্ত্র, স্বেচ্ছাতন্ত্রের এবং ‘ড্যাম-কেয়ার’ স্টেটের একটি মডেল। সুতরাং জাতিসংঘের গৃহীত এসব প্রস্তাব মিয়ানমারের সত্যিকার অর্থে কোনো কিছুই ‘যায় আসে’ না। কিন্তু বিশ্ব মানবাধিকারের ধ্বজাধারী, গণতন্ত্রের গলাবাজ আর গ্লোবাল জাস্টিসের মুরব্বিদের কি সত্যিই কিছু ‘আসে যায়’ না?
লেখক নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
