দেশে করোনাভাইরাস পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির প্রেক্ষাপটে দেশব্যাপী ‘সর্বাত্মক লকডাউনের’ ঘোষণা দিয়েছে সরকার। আর এই ঘোষণায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পুঁজিবাজারে। সর্বাত্মক লকডাউনে পুঁজিবাজার চালু থাকবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। এর প্রভাবে বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ শেয়ার বিক্রি করে নিরাপদে থাকতে চাইছেন। ফলে গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) কেনাবেচা হওয়া ৮২ শতাংশ শেয়ারের দরপতনে প্রধান মূল্যসূচক কমেছে ১০০ পয়েন্ট। শতাংশের হিসেবে তিন মাসে সবচেয়ে বড় পতন এটি।
মহামারী করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে আগামী বৃহস্পতিবার থেকেই সর্বাত্মক লকডাউন কার্যকর হচ্ছে। এর আগ পর্যন্ত বর্তমানের সীমিত লকডাউন চলবে। লকডাউন ঘোষণার আগে সারা দেশে শাটডাউনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছিল। সবকিছু বন্ধের প্রস্তাবনায় ব্যাংক, পুঁজিবাজার চালু থাকবে কি না, তা নিয়ে যে সংশয় তৈরি হয়েছে, তারই প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারে। গত বছর মার্চে যে ‘লকডাউন’ দেওয়া হয়েছিল, সে সময় টানা ৬৬ দিন পুঁজিবাজার বন্ধ ছিল। যদিও সে সময় বিশে^র প্রায় সব দেশের ব্যাংক লেনদেন ও পুঁজিবাজার চালু ছিল। এসইসির বর্তমান চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর পুঁজিবাজার চালুর উদ্যোগ নেন।
এখন সর্বাত্মক লকডাউন ঘোষণার প্রেক্ষাপটেও এসইসি থেকে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে যে, ব্যাংক খোলা থাকলে পুঁজিবাজারে লেনদেন চালু থাকবে। সরকার কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এখন পর্যন্ত ব্যাংক বন্ধ থাকার কোনো ঈঙ্গিত দেওয়া হয়নি। বরং জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ব্যাংক খোলা থাকবে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানিয়েছে। তারপরও বিনিয়োগকারীরা সংশয়ে ভুগছেন। অবশ্য গতকালের দরপতনে আতঙ্ক ছাড়াও জুন ক্লোজিংয়ের প্রভাবও ছিল।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গতকাল লেনদেন শুরুর প্রথম ঘণ্টায় বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির চাপে বড় দরপতনের মুখে পড়ে পুঁজিবাজার। সর্বাত্মক লকডাউনে লেনদেন বন্ধ থাকার শঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা লোকসান কমাতে আগেভাগে শেয়ার বিক্রি করতে থাকেন। ফলে লেনদেন শুরুর প্রথম ঘণ্টায় ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে প্রায় ৯১ পয়েন্ট কমে যায়। এ সময় রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান কিছুটা সাপোর্ট দেওয়ায় বেলা ১২টায় হারানো সূচক অনেকটাই পুনরুদ্ধার করা যায়। তবে এরপর আবারও বিক্রিচাপ আসতে থাকায় বড় পতনে এগিয়ে যায় বাজার। লেনদেন শেষে ১০০ পয়েন্ট হারিয়ে সূচকটি ৬ হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে আসে। দিনশেষে সূচক দাঁড়ায় ৫৯৯২ পয়েন্টে। গত ৮ জুনের পর এটিই সূচকের সর্বনিম্ন অবস্থান।
স্টক এক্সচেঞ্জ সূত্রে জানা গেছে, গতকাল মূলত ব্যক্তিশ্রেণির ছোট বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে বিক্রিচাপ এসেছে। অনেকেই ঋণ নিয়ে শেয়ার কেনেন। বাজার অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেলে সুদের চাপ বাড়বে। তাই আগেভাগে শেয়ার বিক্রি করতে চাইছেন তারা। অবশ্য গতকালের পতনের সুযোগে কৌশলী বিনিয়োগকারীরা কম দরে শেয়ার কিনেছেন। আইসিবি ছাড়া অন্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা অনেকটা নিষ্ক্রিয় ছিল।
গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হওয়া ৩৭২টি সিকিউরিটিজের মধ্যে দর কমেছে ৩০৬টির। বিপরীতে বেড়েছে ৫৪টির ও অপরিবর্তিত ছিল ১২টির দর। খাতওয়ারি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, জীবন বীমা ও বস্ত্র ছাড়া অন্য সব খাত দর হারিয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি দর হারিয়েছে সাধারণ বীমা, ভ্রমণ, তথ্যপ্রযুক্তি, কাগজ, পাট ও সিরামিক খাত। এসব খাত গতকাল সাড়ে ৩ থেকে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত বাজার মূলধন হারিয়েছে। তবে সূচক কমাতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব রেখেছে ব্যাংক, এনবিএফআই, প্রকৌশল ও ফার্মাসিউটিক্যালস খাত। সবচেয়ে বেশি ফ্রি-ফ্লোট শেয়ার থাকা ব্যাংক খাত হারিয়েছে এক শতাংশের বেশি দর। প্রকৌশল ও এনবিএফআই ২ শতাংশের বেশি বাজার মূলধন হারিয়েছে। বিপরীতে বস্ত্র খাত ১ দশমিক ৯ শতাংশ ও জীবন বীমার বাজার মূলধন ১ শতাংশ বেড়েছে।
গতকালের পতনের বাজারে ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ আগের দিনের তুলনায় বাড়লেও এখনো তা দুই হাজার কোটি টাকার নিচে রয়েছে। গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হয়েছে ১ হাজার ৭৪০ কোটি টাকার শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিট, যা আগের কার্যদিবসের তুলনায় ৮ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। খাতওয়ারি হিসেবে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে বস্ত্র খাতে। ডিএসইর মোট লেনদেনের ৩০ শতাংশ এসেছে এ খাত থেকে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছে ব্যাংক খাতে, ১০ শতাংশ। আলোচিত সাধারণ বীমা খাতের লেনদেন কমে ডিএসইর ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
