মগবাজার বিস্ফোরণ: মৃত যুবকের হাতের কবজি কেন উড়ে গেল?

আপডেট : ২৮ জুন ২০২১, ০২:০৬ এএম

রাজধানীর মগবাজারে ভয়াবহ বিস্ফোরণর কারণ নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা রহস্য। অনেকেই ধারণা করছেন শক্তিশালী বোমার বিস্ফোরণে ভবনটি বিধ্বস্ত হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলছেন গ্যাস সিলিন্ডার বা জেনারেটর বিস্ফোরণ। আবার কেউ কেউ বলছেন জমে থাকা গ্যাস থেকেও হতে পারে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্ফোরণে কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ও বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট। তারা এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোন মন্তব্য করনি। তবে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া লাশের গায়ের ক্ষত দেখে এবং হাত উড়ে যাওয়ার বিষয়টি দেখে অপরাধ বিশ্লেষকেরা ধারণা করছেন বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণ হতে পারে। বিশেষ করে  ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে অজ্ঞাত যে যুবকের লাশ ছিল তার হাত কবজি পর্যন্ত উড়ে গেছে। এর থেকে ধারণা করা হচ্ছে এই ব্যক্তি বিস্ফোরণের কেন্দ্রে ছিলেন।

রবিবার রাত ৮টার দিকে বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায় ৭৯ বড় মগবাজারের ‘রাখী নীড়’ নামক বাড়িটি তিন তলা। বিস্ফোরণ হয়েছ নিচ তলায়। সেখানে শর্মা হাউস নামে একটি ফাস্ট ফুড শপ, বেঙ্গল মিট নামে একটি দোকান ও গ্র্যান্ড কনফেকশনারীসহ কয়েকটি দোকান ছিল। দোতলায় ছিল সিঙ্গার কোম্পানির গোডাউন। তিন তলায় থাকতেন বাড়ির মালিক ও কয়েকজন ভাড়াটিয়া।

দুর্ঘটনার পর নিহত আহতদের উদ্ধার করে প্রথমে নেওয়া হয় মগবাজার কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে। হাসপাতালের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরের সঙ্গ আলাপকালে বলেন, ‘হাসপাতালে থাকা আনুমানিক ৩৫ বছর বয়স্ক এই ব্যক্তি বিস্ফোরণের কেন্দ্রে ছিলেন। তার হাতের কবজি বিস্ফোরণে উড়ে গেছে। নিহতের শরীরে বোমার স্প্লিন্টারবিদ্ধ হলে যেরকম ক্ষত হয় সেরকম ক্ষত তৈরি হয়েছে। মাথার পাশে কাঁচ বা টিন জাতীয় কিছুতে কেটে কেটে থেঁতলে গেছে।’

পুলিশের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন,‘কমিউনিটি হাসপাতালে থাকা লাশটি কোথায় কি অবস্থায় পাওয়া গেছে সেটা জানা জরুরি। তার হাতে কবজি কেন উড়ে গেছে সেটাও জানতে হবে। আর ঘটনাস্থলে যদি গান পাউডার জাতীয় কিছু থেকে থাকে তাহলে তার আলামত পাওয়া যাবে। তা ছাড়া রাস্তায় যেসব বাস বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাসগুলো কাঁচ জানালা দুমড়ে মুচড়ে গেছে। একটি গ্লাসও অবশিষ্ট নেই। তাতে শক্তিশালী বোমা বা এজাতীয় কিছুর বিস্ফোরণ হওয়া অমূলক নয়।’

ঠিক কী কারণে এত ভয়াবহ বিস্ফোরণ হলো তা নিয়ে কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি ঘটনাস্থলে যান ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যরা।

ডিএমপি কমিশনার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা জানতে পেরেছি শর্মা হাউস নাম দোকানটিতে জমে থাকা গ্যাস থেকে বিস্ফোরণ হয়েছে। এতে আশপাশের সাতটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েকটি বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্য কোন কারণ আছে কিনা সেটা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’ 

ঘটনাস্থলে ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের ডিসি সাজ্জাদুর রহমান বলেন, নাশকতার আশঙ্কাসহ কোন কোনো আশঙ্কাই উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। কী কারণে বিস্ফোরণ হয়েছে তা আমরা খতিয়ে দেখার চেষ্টা করছি। আমাদের অনেকগুলো টিম কাজ করছে। নাশকতার আশঙ্কা থেকে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটও এখানে এসেছে। তারা তাদের দিক থেকে কাজ করছে।

বিধ্বস্ত ভবনটি ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের মাত্র ৫০ গজের মধ্যে। ঘটনার পরপরই তিনি ঘটনাস্থলে যান। উপকমিশনার সাজ্জাদ বলেন, ‘এই বিল্ডিংটা ভেঙে বহুদূরে চলে গেছে। দরজা-জানালা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে রাস্তায় গাড়ি ও পথচারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আমার ধারণা যে এই বিল্ডিংয়ের ভেতরে কোনো একটা রুম গ্যাস চেম্বার হয়ে গিয়েছিল। সেখানে ফায়ার ওপেন করেছে এবং সাথে সাথেই এই বিস্ফোরণটা হয়েছে। এই গ্যাসটা বহুদূর চলে যায় এবং একটা লাইনে যা পায় সব গুঁড়ো করে দিয়ে যায়। অতীতেও আমি এমন দুই-তিনটা ঘটনা দেখেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখানে ব্যাপকতাটা অনেক বেশি। আমার অভিজ্ঞতা আরও যে কয়েকটা দেখেছি, এখানে ব্যাপকতাটা অনেক বেশি। সে ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট করে কিন্তু কোনোভাবেই বলা যাবে না এটা গ্যাস চেম্বার থেকে হয়েছে বা রুম গ্যাস চেম্বার হয়ে গিয়েছিল। এমনও হতে পারে যে এখানে বিরাট ... সেটা গ্যাস চেম্বার হয়ে গেছে।

ঘটনাটি বিস্ফোরকজনিত বিষয়ও হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এক্সপ্লোসিভও হতে পারে। একটু সময় দিতে হবে। ফায়ার সার্ভিসের লোকজন আছে, কোথাও কোনো আলামত বা বিস্ফোরণের গন্ধ পাওয়া যায় নাকি। কিছু সময় পরে এটা উদ্‌ঘাটিত হয়ে যাবে।’  নাশকতার কোনো আশঙ্কা দেখছেন কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ‘আমরা কোনো কিছুই উড়িয়ে দিচ্ছি না, আমাদের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট কাজ করছে। ঘটনা যাই হোক সেটা ফাইন্ড আউট হয়ে যাবে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক দেবাশীষ বর্ধন বলেন, ‘এটা অনেক বড় একটা বিস্ফোরণ। অনেকটা বোমাসদৃশ শব্দ হয়েছিল। আশপাশের লোকজনদের কাছ থেকে আপনারা শুনেছি। আপনারাও শুনেছেন ভয়ংকর শব্দ হয়েছে। একটা বোমা ফাটলে যেমন বিস্ফোরণ ঘটে, সে রকম শব্দ হয়েছে। এই ভবনের নিচতলা থেকে সূত্রপাত হতে পারে। আমাদের কাজ চলছে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে কিছুটা সময় লাগবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত