নাশকতার সন্দেহ উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা

আপডেট : ২৯ জুন ২০২১, ০৩:২৬ এএম

রাজধানীর মগবাজারে বিস্ফোরণের রহস্য এখনো উদঘাটন করতে পারছে না আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। পুলিশ, র‌্যাব, ফায়ার সার্ভিসসহ সরকারের একাধিক সংস্থা ঘটনা খতিয়ে দেখছে। এ নিয়ে তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে সবকটি সংস্থাই। বিস্ফোরণের মাত্রা বেশি থাকায় জনমনে আছে নানা প্রশ্ন। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই আগ বাড়িয়ে কোনো কথা বলা উচিত না। গ্যাস বিস্ফোরণ নাকি অন্য কোনো কারণে হয়েছে তা গভীরে গিয়ে খতিয়ে দেখতে হবে। ঘটনাস্থলে উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক মজুদ ছিল কি না তাও তদন্তের আওতায় আনতে হবে। ঘটনাটি দুর্ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক হবে না।

বিস্ফোরণটি গ্যাসজনিত কারণে হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে পুলিশ, বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, এ যাবৎ প্রাপ্ত আলামতে বিস্ফোরণের সঙ্গে নাশকতার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। হাইড্রোকার্বন ও মিথেন গ্যাস জাতীয় গ্যাস জমে এ বিস্ফোরণ হয়েছে। সেটি ভবনে থাকা রেস্টুরেন্টে মজুদ সিলিন্ডার থেকে বেরিয়েছে না গ্যাসের পাইপলাইন থেকে বেরিয়েছে তা নিশ্চিত হতে কাজ করছে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর। গতকালও পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, বিস্ফোরক অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থার লোকজন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

নিরাপত্তা ও বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয় না শুধু গ্যাস বিস্ফোরণে এত বড় ঘটনা ঘটেছে। এর পেছনে অন্য কিছু আছে কি না তা গভীরে গিয়ে তদন্ত করতে হবে। ঘটনাস্থলে কোনো ধরনের উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক মজুদ ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা উচিত। তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কারো আগ বাড়িয়ে কথা বলা উচিত না।’ তিনি আরও বলেন, ‘এরকম হতে পারে গ্যাসের মধ্যে কেমিক্যাল থাকতে পারে। ঘটনাটি নাশকতা কি না এই মুহূর্তে তা বলা মুশকিল। তবে এটিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ঘটনাস্থলের পাশেই কিন্তু ফ্লাইওভার ছিল। যেভাবে বিস্ফোরণ ঘটেছে তাতে আমরা ভয় পেয়েছিলাম তা কিন্তু সত্য। এত বড় বিস্ফোরণ ঢাকায় আর ঘটেছে কি না তা মনে পড়ছে না। বিস্ফোরণে মাত্রা এত বেশি ছিল, আশপাশের ভবনগুলো পর্যন্ত ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সঠিক তদন্ত করেই প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করতে হবে। ফ্লাইওভারগুলোর নিরাপত্তা আরও বাড়াতে হবে।’

প্রায় একই কথা বলেছেন আরেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আবদুর রশীদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয় উচ্চমাত্রা বিস্ফোরক মজুদ রাখা ছিল। সেটি কেমিক্যালও হতে পারে আবার অন্য কিছুও হতে পারে। তবে গভীরে গিয়ে তদন্ত করতে হবে। কোনো সংস্থারই আগ বাড়িয়ে কথা না বলাই ভালো। যেভাবে বিস্ফোরণ হয়েছে তাতে মনে হচ্ছে শক্তিশালী কেমিক্যাল ছিল। সিলিন্ডার গ্যাসে বিস্ফোরণ হলে এত শক্তিশালী হতো না। কতগুলো লোক মারা গেছে। আবার আহত হয়েছে। ঘটনাস্থলের আশপাশের ভবনগুলো পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’

বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ ঘটনাস্থলে গিয়ে বলেছেন, ‘মগবাজারে রবিবার সন্ধ্যায় যে ভবনে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটেছে, সেখানে হাইড্রোকার্বন গ্যাসের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।’ তিনি বলেন, ‘গ্যাস পরীক্ষা করার জন্য আমাদের বিশেষ যন্ত্র রয়েছে। সেটি আমরা ওই স্থানে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে হাইড্রোকার্বনের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। তবে এ কারণে বিস্ফোরণ কি না, সেটা বলতে আরও সময় লাগবে। কারণ এ ধরনের গ্যাসে যেমন বিস্ফোরণ ঘটতে পারে, আবার বিস্ফোরণের ফলেও গ্যাসের পাইপলাইন ছিদ্র হয়েও গ্যাস বের হতে পারে। পেট্রোলিয়াম জাতীয় জৈব জ¦ালানি, যেমন এলপিজি বা প্রাকৃতিক গ্যাসের উপাদানকে হাইড্রোকার্বন বলা হয়। আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।’

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত এ বিস্ফোরণ নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড বলে মনে হচ্ছে না। গ্যাস জমে বিস্ফোরণ হতে পারে। ভবনের ভেতরে এখনো মিথেন গ্যাসের অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে। বম্ব এক্সপ্লোরেশন ইউনিট নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে বিস্ফোরণের কারণ খতিয়ে দেখা হবে। রবিবার মগবাজারে এই মারাত্মক বিস্ফোরণে প্রাণহানি হয়েছে। পথযাত্রী, দোকানের কাস্টমার, কর্মচারী ও শিশুসহ ছয়জনকে হারিয়েছি। মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনায় অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ বছর যদি খেয়াল করেন অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে। নারায়ণগঞ্জে মসজিদে, শনির আখড়ায় দুর্ঘটনা ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিস তদন্ত কমিটি করেছে। তবে আমাদের ফায়ার এক্সপ্লোরেশন বিভাগ ও ফায়ার সার্ভিস মিলে পুলিশের পক্ষ থেকে একটা তদন্ত কমিটি করে তদন্ত করব। আমরা একসঙ্গে কাজ করব। আমরা চাই এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে।’ এটা কোনো নাশকতা কি না এমন প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, ‘বড় ধরনের একটা শক ওয়েভ তৈরি হয়েছিল, এখন পর্যন্ত এ বিস্ফোরণ নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড বলে মনে হচ্ছে না। গ্যাস জমে বিস্ফোরণ হতে পারে। এখনো ভবনের ভেতরে মিথেন গ্যাসের অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে। একমুখী ধ্বংসযজ্ঞ, নাশকতা বা বিস্ফোরণ হলে চতুর্মুখী বিস্ফোরণ হতো। আমরা চারদিকে কাচের টুকরো দেখছি। ভেতরে গ্যাসের অস্তিত্ব ফায়ার সার্ভিস তদন্ত করছে। এখনো মনে হচ্ছে কোনো নাশকতা নয়।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, ‘আমরা আগে তদন্ত করি বিস্ফোরণটা কেন হলো। তারপর দেখব পেছনে কোনো কারণ আছে কি না। আমাদের ও ফায়ার সার্ভিসের বিশেষজ্ঞরা দেখছেন। অনেক বিষয় আছে। সেসব দেখা হচ্ছে।’

পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনাটি এখনো রহস্যজনক। নাশকতাসহ কোনো কিছুই আমরা উড়িয়ে দিচ্ছি না। সবকিছু বিষয় নিয়ে আমরা তদন্ত করছি। অনেক কারণ সামনে রেখে তদন্তের কাজ শুরু হয়েছে। ঘটনাস্থলে অতীতে আরও কী ছিল তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

এদিকে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রীকে তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক একটি নোট দিয়েছেন। নোটটিতে তিনি যা বলেছেন ‘আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে পরীক্ষা করেছি এবং দেখেছি যে, আমাদের রেকর্ডে কোনো গ্যাসের সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু এলপিজি সিলিন্ডার খুঁজে পেয়েছে যার রান্নার জন্য ব্যবহৃত হতো। আমি সেই বিল্ডিংসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছিলাম যে তারা রান্নার জন্য এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করেছে।’

গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সিআইডির ফরেনসিক ও ক্রাইম সিন ইউনিট। বিস্ফোরণের সম্ভাব্য কারণ অনুসন্ধানে আলামত সংগ্রহ করেছে তারা। পরিদর্শন শেষে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বিস্ফোরণটা ছিল মারাত্মক ধরনের। প্রাথমিকভাবে নানা কারণ উঠে এলেও বিস্ফোরণের সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। আলামতগুলো ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা করে দেখা হবে। সিআইডির চৌকস দল ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ও আশপাশে ছড়িয়ে থাকা আলামতগুলো সংগ্রহ করেছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত