উত্তরের সীমান্তবর্তী দিনাজপুর জেলায় করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে। এখন প্রায় প্রত্যেক ঘরেই কেউ না কেউ জ্বর-সর্দিতে ভুগছেন। কিন্তু এসব রোগী ও তাদের স্বজনরা বাজারের ফার্মেসিতে গিয়ে জ্বর-সর্দির কোনো ওষুধ পাচ্ছেন না। যাও দু-এক পাতা পাচ্ছেন, দাম নিচ্ছে তিন থেকে চারগুণ। ফলে বাড়তি দামেই অনেকে ওষুধ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
তবে ফার্মেসি ব্যবসায়ীদের দাবি, কোম্পানিগুলো হঠাৎ জ্বর-সর্দির ওষুধের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। এর ওপর জ্বর-সর্দি বেড়ে যাওয়ায় মানুষও বেশি বেশি ওষুধ কিনেছেন। ফলে প্রায় এক সপ্তাহ হলো প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ কিনতে এসে মানুষকে ফেরত যেতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানায়, দিনাজপুর জেলা ১৩টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে সাতটি উপজেলাই ভারতের সীমান্তঘেঁষা। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যে, সীমান্ত জেলার কারণে দিনাজপুরে করোনার সংক্রমণ বেড়ে গেছে। গতকাল রবিবার পর্যন্ত জেলায় ৮ হাজার ৯৮০ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে দিনাজপুর সদরে আক্রান্ত ৫ হাজার ২০৮ জন। এ পর্যন্ত জেলায় করোনায় মারা গেছে ১৭৬ জন। সদরে মৃতের সংখ্যা ৯৪ জন।
গত এক মাস ধরে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। এরই প্রভাবে দিনাজপুর শহরের বাজারগুলোতে জ¦র-সর্দির ওষুধের হাহাকার চলছে। কোনো কোনো ফার্মেসিতে ওষুধ পাওয়া গেলেও চড়া দাম নিচ্ছে। হঠাৎ প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ সংকটে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরসহ স্থানীয় প্রশাসনের তদারকির অভাবকে দায়ী করেছেন ক্রেতারা।
গতকাল দিনাজপুর শহরের চারুবাবুর মোড়, সদর হাসপাতাল মোড়, এম. আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মোড়, বাহাদুর বাজার মোড়সহ বিভিন্ন জায়গায় ফার্মেসিতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক সপ্তাহ ধরে জেলায় নাপা, নাপা এক্সটেন্ড, নাপা এক্সট্রা, এইসসহ প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ নেই বললেই চলে। ক্রেতা সেজে প্রায় ১০ দোকান ঘুরে দু-একজনের কাছে কয়েক পাতা নাপা পাওয়া যায়। স্বাভাবিক সময়ে যে নাপা ১০ টাকা পাতা, এখন ফার্মেসিগুলো ৩০-৪০ টাকা নিচ্ছে।
দিনাজপুর শহরের চারুবাবুর মোড়ে ওষুধ কিনতে আসা শ্রমজীবী এনামুল হক বলেন, ‘সারা দিন কাজ শেষে একটা নাপা খেলে ভালো লাগে। কিন্তু এক সপ্তাহ হলো কোনো ফার্মেসিতে নাপা পাচ্ছি না। এতে খুবই বিপদে পড়ে গেছি।’ রফিকুল ইসলাম নামে আরেক ক্রেতা বলেন, ‘বাড়িতে বেশ কয়েকজনের জ¦র-সর্দি। নাপা অথবা নাপা এক্সটেন্ড নিতে এসেছি। ব্যবস্থাপত্র দেখালেও কেউ দিতে পারছে না। পাঁচ দোকান ঘুরেও একটা নাপা পেলাম না।’
স্থানীয় বাসিন্দা শামীম কবির বলেন, ‘আমি অনেক খুঁজে এক পাতা নাপা পেয়েছি, চারগুণ দাম। নিজের অবস্থা বুঝিয়ে শেষমেশ ২০ টাকায় নিতে পেরেছি। আমি গরিব মানুষ। এখন রোজগারের পথ বন্ধ। এত দামে ওষুধ কিনতে গেলে পথে বসতে হবে।’
শহরের চারুবাবুর মোড়ের পায়রা ই-ফার্মার কর্ণধার মোয়াজ্জেম হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ফার্মেসিতে বেশ কয়েক দিন হলো প্যারাসিটামল জাতীয় কোনো ওষুধ নেই। ফলে ক্রেতাদের ফেরত দিতে হচ্ছে। আমরাও এ সংকটের দ্রুত সমাধান প্রত্যাশা করছি।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শহরের এক ফার্মেসির মালিক বলেন, ‘শহরে ঘরে ঘরে মানুষের জ্বর-সর্দি। আমরা অর্ডার দিয়েও প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ পাচ্ছি না। যে সামান্য কয়েক পাতা করে পাই, নিজের পরিবার-পরিজনদের জন্য মজুদ রেখে দিচ্ছি।’
পল্লী চিকিৎসক রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘এ সময়ে মানুষ সাধারণ ফ্লুতে বেশি আক্রান্ত হন। কিন্তু করোনারও একই লক্ষণ হওয়ায় তাদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে। প্রাথমিকভাবে আমরা প্যারাসিটামল খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি। কিন্তু রোগীরা বলছেন, দোকানে গিয়ে নাপা জাতীয় কোনো ওষুধই তারা পাচ্ছেন না। এ অবস্থা চলতে থাকলে মানুষ খুবই বিপদের সম্মুখীন হবে। প্রশাসনের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
এ বিষয়ে দিনাজপুর ঔষধ প্রশাসনের কর্মকর্তা সুলতানুল আরেফিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমানে কোম্পানিগুলো জ¦রের ওষুধ বাজারে কম সরবরাহ করছে। এজন্য বাজারে কিছুটা সংকট রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ কালোবাজারে যায়নি। কারণ আমরা সঠিকভাবে ওষুধের বাজার তদারকি করছি। আমাদের গাফিলতিতে সংকট তৈরি হয়েছে, কথাটি সঠিক নয়।’
