মানব পাচারকারী রুবেলের অ্যাকাউন্টে ৫০ কোটি টাকা

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২১, ০২:৩৫ এএম

ঢাকার কেরানীগঞ্জের মো. আশিক এইচএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্যের পর মধ্যপ্রাচ্যে যায়। লিবিয়ায় দুই বছর অবস্থানের সময় মানব পাচার সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়ায় সে। ২০১৯ সালে দেশে ফিরে কেরানীগঞ্জ থেকে মানবপাচারের নিয়ন্ত্রণ নেয়। দুবাইয়ে থাকা তার মামা রুবেলের মাধ্যমে গড়ে তোলে ‘রুবেল সিন্ডিকেট’। তার মাধ্যমে অনলাইন ভিসা, বিদেশে কাজের জন্য ভ্রমণেচ্ছু বাংলাদেশিদের সংগ্রহ ও নৌপথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে দুবাইয়ে মানব পাচার করত আশিক। এ সিন্ডিকেটে রয়েছে ২০-২৫ সদস্য। গত দুই বছরে ৮০ বাংলাদেশিকে ইউরোপে পাচার করেছে তারা। রুবেল, আশিক ও তাদের আত্মীয়দের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মিলেছে অন্তত ৫০ কোটি টাকার লেনদেন। চক্রটির মাদারীপুর, শরিয়তপুর, গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নোয়াখালী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিজস্ব এজেন্ট রয়েছে। প্রধান সমন্বয়ক আশিক আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে মানব পাচারের বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করত।

গতকাল দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানায় র‌্যাব। চক্রের সদস্যরা হলো, মো. আশিক (২৫), আজিজুল হক (৩৫), মিজানুর রহমান মিজান (৪৩), নাজমুল হুদা (৩১), সিমা আক্তার (২৩), হেলেনা বেগম (৪২) ও পলি আক্তার। তাদের কাছ থেকে ১৭টি পাসপোর্ট, ১৪টি বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবই, দুটি এটিএম কার্ড, ১৫টি বিভিন্ন ব্যাংকে টাকা জমাদানের বই, দুটি হিসাব নথি, দুটি এনআইডি, ১০টি  মোবাইল ফোন ও নগদ ৫৬ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। অপরদিকে র‌্যাবের আরেকটি টিম তিন জুয়াড়িকে গ্রেপ্তার করেছে। সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম বিভাগের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, সম্প্রতি গত ২৮ ও ২৯ জুন অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরের তিউনিসিয়া উপকূলে নৌকাডুবিতে প্রায় ৪৩ জন নিখোঁজ হয়। এতে ৪৯ বাংলাদেশি উদ্ধারের সংবাদ জানা যায়। জিজ্ঞাসাবাদে চক্রের সদস্যরা জানায়, বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রলোভন দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ মানব পাচার চক্রটি বিদেশি চক্রের সঙ্গে অবৈধভাবে ইউরোপে মানব পাচার করে আসছে। তিন ধাপে এ সিন্ডিকেট মানব পাচারের কাজ করে আসছিল। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় অনেকেই চক্রের প্রস্তাবে সাড়া দেয়। বিদেশ গমনেচ্ছুদের পাসপোর্ট তৈরি, ভিসা সংগ্রহ ও টিকিট ক্রয়সহ যাবতীয় কাজ সিন্ডিকেট নিজস্বভাবে সম্পন্ন করত। তবে পাসপোর্ট ও অন্যান্য নথি পাচার চক্রের নিয়ন্ত্রণে রেখে দেওয়া হতো। পরে তাদের এককালীন বা ধাপে ধাপে কিস্তি নির্ধারণ করে ইউরোপের পথে পাড়ি  দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ইউরোপ যেতে তারা ৭ থেকে ৮ লাখ টাকার অধিক অর্থ নেয়। সাড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা লিবিয়ায় যাওয়ার আগে এবং বাকি টাকা লিবিয়ায় যাওয়ার পর ভিকটিমের আত্মীয়স্বজনের নিকট থেকে নেয়। তিনি আরও জানান, চক্রটি বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের মাধ্যমে লিবিয়া রুট ব্যবহার করছিল। মধ্যপ্রাচ্যে বিদেশি এজেন্টদের মাধ্যমে ভিকটিমদের নিয়ে ৭-৮ দিন অবস্থান করত। এই সময়ের ভেতরে লিবিয়ার বেনগাজিতে ভিকটিমদের পাঠানোর জন্য এজেন্টরা ‘মারাকাপা’ নামে একটি ডকুমেন্ট দুবাইয়ে পাঠাত। যা লিবিয়া যাওয়ার আগে দুবাইয়ে অবস্থানরত ভিকটিমদের হস্তান্তর করা হতো। ওই ডকুমেন্টসহ বিদেশি এজেন্টদের সহায়তায় তাদের বেনগাজি পাঠানো হতো। লিবিয়া পর্যন্ত যারা অর্থ পরিশোধ করে তাদের স্বল্প সময়ের মধ্যপ্রাচ্যে থেকে সরাসরি লিবিয়ায় পাঠানো হতো। প্রধান অভিযুক্ত রুবেল দুবাই বসে সিন্ডিকেটের সব কার্যক্রম মনিটরিং করে। পাচারের শিকারদের ত্রিপলিতে পৌঁছানোর পর লিবিয়ার এজেন্টদের সহায়তায় গাজী, কাজী ও বাবুল নামে তিন বাংলাদেশি তাদের গ্রহণ করত। ভিকটিমদের ত্রিপলিতে কয়েক দিন আটকে রাখা হতো। এ সময়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাংলাদেশে অবস্থানরত প্রতিনিধির দ্বারা ভিকটিমদের আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে অর্থ আদায় করত। ইউরোপে পাচারের উদ্দেশ্যে তাদের হস্তান্তর করা হতো। কোনো এক ভোরে কয়েকটি নৌযান লিবিয়া হয়ে তিউনিসিয়া উপকূলীয় চ্যানেল ধরে ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপের দিকে যাত্রা করত। ভূমধ্যসাগরে অনেক সময় দুর্ঘটনার শিকার হতো এবং জীবনাবসানের ঘটনাও অহরহ ঘটে। ২০১৯ সাল থেকে ঢাকার কেরানীগঞ্জে অবস্থান করে মানব পাচারের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল আশিক। তার মূল দায়িত্ব ইউরোপে যেতে আগ্রহীদের বাংলাদেশ হতে দুবাই পাঠানো। এ চক্রের বাংলাদেশি সিন্ডিকেটে প্রায় ২০-২৫ জন সদস্য রয়েছে। চক্রটি বাংলাদেশের ভেতরে পাসপোর্ট বহনের ক্ষেত্রে কৌশলগত কারণে সাধারণত কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে থাকে। রুবেলের স্ত্রী সীমার অ্যাকাউন্টে দেড় কোটি টাকা ও টালি খাতার তথ্যানুযায়ী আরও এক কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য মিলেছে। বিভিন্ন ব্যাংকে বেশ কয়েকটি অ্যাকাউন্ট আছে। রুবেলের বোন হেলেনার কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া চেক বইয়ের তথ্যানুযায়ী কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য এসেছে। তাছাড়া কয়েকজনের মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবসা রয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া আজিজ মোবাইল ব্যাংকিং ও ইলেকট্রনিক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তিনি মাদারীপুরে মাঠ পর্যায়ের বিদেশে গমনেচ্ছুদের নির্বাচন করে। গ্রেপ্তার হওয়া মিজানের ওয়ার্কশপ ব্যবসা রয়েছে। মিজান মাঠ পর্যায়ে এজেন্টের সঙ্গে আঞ্চলিক এজেন্ট গ্রেপ্তারকৃত নাজমুলের সঙ্গে সমন্বয় করে থাকে। গ্রেপ্তার নাজমুল হুদাও মোবাইল ব্যাংকিং ও কসমেটিকস ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। মাদারীপুর, শরিয়তপুর, মুকসুদপুর এলাকার আঞ্চলিক পর্যায়ের কার্যক্রম তদারকি করে। তারা এসব পেশার আড়ালে অবৈধ মানব পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত। সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম বিভাগের সহকারী পরিচালক মেজর রইসুল আজম মনি, সহকারী পরিচালক এএসপি ইমরান হোসেন ইমনসহ র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

র‌্যাবের হাতে ৩ জুয়াড়ি গ্রেপ্তার : কোপা আমেরিকা ও ইউরো ফুটবল কাপকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানে অনলাইন জুয়ার আসর চলছে। দেশি-বিদেশি ফুটবল, ক্রিকেট টুর্নামেন্ট ঘুরে এক শ্রেণির অনলাইন জুয়াড়ি জুয়া খেলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। জুয়ার এসব টাকা পাচার হচ্ছে দেশের বাইরে। এই ঘটনায় জড়িত জুয়াড়ি কামাল হোসেন (৩৩), টুটুল মোল্লা (৩২) ও মিজানুর রহমানকে (৩৩) গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক জানান, বিভিন্ন সময়ে র‌্যাবের কাছে অভিযোগ আসে দেশি-বিদেশি আইপিএল, বিপিএল, পিএসএল, এসপিএল, সিপিএলসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সিরিজ এবং ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, লা-লিগা, চ্যাম্পিয়নস ট্রফিসহ বিবিধ খেলায় এক শ্রেণির অনলাইন জুয়াড়ি জুয়া খেলে দেশে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।সম্প্রতি ইউরো কাপ ফাইনাল ও কোপা আমেরিকা ফাইনাল খেলাকে কেন্দ্র করে অনলাইন জুয়াড়িরা দেশের বেশিরভাগ তরুণ ও খেলাপ্রেমীদের ওপর ভিত্তি করে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার রাতে তাদের আটক করা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, তারা অনলাইন জুয়ার সাইটে ইউজার আইডি খুলে বেটিং সাইটের এজেন্টের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে ডলার ও ক্রিপ্টোকারেন্সি ক্রয় করে এসব বেটিং সাইটে ডিপোজিট করে দীর্ঘদিন ধরে জুয়া খেলছে। অনলাইন জুয়া খেলার ওয়েবসাইটে খেলাধুলার বাজি পরিচালনা করে। এছাড়াও পলাতক আসামিদের সহযোগিতায় বাজির টাকা ডলারে কিংবা ডলার টাকায় রূপান্তরিত করে জুয়া খেলা পরিচালনা করত। তারা নিজেরা বিকাশ নম্বরে টাকার লেনদেন করত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত