ঝালকাঠির রাজাপুরে হস্তান্তরের ছয় মাস না পেরোতেই মুজিববর্ষে ভূমিহীন-গৃহহীনদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া উপহারের একটি ঘর ভেঙে পড়েছে। সেখানে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের অধীনে ধানসিড়ি নদীপাড়ে খাসজমিতে গড়ে তোলা ১৪টি ঘরের আটটি ঘরেই ইতিমধ্যে ফাটল দেখা দিয়েছে। এছাড়া ঘরগুলোর দেয়ালের পলেস্তরা খসে পড়ছে, টিনের ছাউনি দিয়ে ভেতরে ঢুকছে পানি, জানালাও খুলে পড়ে যাচ্ছে। এ প্রকল্পে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো নির্দেশনা উপেক্ষা করে নিম্নমানের কাজ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ঘর বরাদ্দপ্রাপ্তরা।
অন্যদিকে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নদীভাঙনের শিকার গৃহহীন মানুষের জন্য গড়ে তোলা ‘গুচ্ছগ্রাম’র ৮০টি ঘর নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ করেছেন ঘর বরাদ্দপ্রাপ্তরা। ঘর নির্মাণের দুই বছর পার হলেও এখনো সেগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ব্যবহার অনুপোযোগী হওয়ায় কোনো ঘরেই বসবাস করতে পারছেন না সুবিধাভোগীরা। বিস্তারিত দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে :
ঝালকাঠির রাজাপুরে ধানসিড়ি নদীপাড়ের আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর ৪২ নম্বর ঘরটি ধসে পড়ার ১৫ দিন আগে পেছন অংশে ফাটল দেখা দেয়। পরে গত শুক্রবার হঠাৎ করে ঘরের পেছন অংশ বারান্দাসহ ভেঙে পড়ে যায়। তবে ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার আগেই ঠিকাদারের সহযোগী রফিক লোকজন নিয়ে ভাঙাচোরা অংশ সরিয়ে ফেলেন। প্রকল্পে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো নির্দেশনা উপেক্ষা করে নিম্নমানের কাজ করা হয়েছে বলে অভিযোগ সুবিধাভোগী ও স্থানীয়দের।
জানা গেছে, আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর অধীনে ধানসিড়ি নদীপাড়ে খাস জায়গায় নির্মিত ১৪টি ঘর ভূমিহীন-গৃহহীনদের মধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়। শুরু থেকেই স্থানীয়রা ও সুবিধাভোগীদের পক্ষ থেকে নিম্নমানের কাজের অভিযোগ করা হলেও গুরুত্ব দেয়নি ঠিকাদার। প্রতিটি ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা ব্যয়ে তৈরি ঘরগুলোতে ইট, বালুসহ সিমেন্টের গুণগত মান ঠিক না রেখেই কাজ শেষ করে গত জানুয়ারি মাসে সুবিধাভোগীদের কাছে হস্তান্তর করে উপজেলা প্রশাসন। ঘরগুলোর আড়া ও টিনের ছাউনির নিচে শিলকড়ই কিংবা ভালো মেহগনি কাঠ ব্যবহার করার কথা থাকলেও স্থানীয় নিম্নমানের রেইনট্রি কিংবা চাম্বল কাঠ ব্যবহার করেছেন ঠিকাদার।
সরেজমিন দেখা যায়, এ প্রকল্পের ১৪টি ঘরের প্রায় আটটি ঘর ইতিমধ্যেই সংস্কার উপযুক্ত হয়ে পড়েছে। এসব ঘরের মেঝে ফেটে গিয়ে গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। কয়েকটি ঘরের সামনের পিলার ভেঙে পড়েছে, দেয়ালের পলেস্তরা খসে পড়ছে, টিনের ছাউনি দিয়ে ভেতরে পানি ঢুকছে। এছাড়া দেয়াল ফেটে যাওয়াসহ জানালাও খুলে পড়ে যাচ্ছে।
এ প্রকল্পের বাসিন্দা ঘরের সুবিধাভোগী মমতাজ বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাগো কিছু নাই দেইখ্যা প্রধানমন্ত্রী আমাগো একখান ঘর দিছে, কিন্তু ঠিকাদারের কাজের মান খারাপের কারণে ঘরের যে অবস্থা, যেকোনো সময় ভাইঙ্গা মাথার ওপর পড়তে পারে। ৪২নং ঘর ভাইঙ্গা পড়ার পর হইতেই আমরা আতঙ্কে আছি।’
প্রকল্পের আরেক বাসিন্দা আবদুর রহিম বলেন, ‘এতদিন এদিক-ওদিক থাকার পর মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই পাইলেও মাত্র তিন মাসে ঘরের বিভিন্ন জায়গা ফাটল ধরে ভাঙা শুরু হইছে, মনে হয় আর তিন মাস পর এ ঘরে আর থাকার অবস্থা থাকবে না। প্রধানমন্ত্রীর এই সুন্দর উদ্যোগকে যারা প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাচ্ছে তাদের বিচার দাবি করছি।’
হস্তান্তরের ছয় মাসেই ঘর ভেঙে পড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোক্তার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর আমরা জেনেছি এই ৪২ নম্বর ঘরের নিচে একটি ডোবা ছিল। তাই আমরা ঘরটি কোনো সুবিধাভোগীকে হস্তান্তর করিনি। এরই মধ্যে ঘরটির পেছনের অংশ দেবে গিয়ে ধসে পড়ায় আমরা নতুন করে ধানসিড়ি নদীর ওই জায়গায় পাইল বসিয়ে আবার সংস্কার শুরু করেছি। সংস্কার শেষ হলে একজন সুবিধাভোগীর মাঝে ঘরটি হস্তান্তর করা হবে। এছাড়াও আমরা প্রকল্পের প্রত্যেকটি ঘর পরিদর্শন করে যদি মেরামতের দরকার হয় তাহলে সেগুলো মেরামতের ব্যবস্থা করব।’
রাজবাড়ীতে পরিত্যক্ত গুচ্ছগ্রামের কোটি টাকা ব্যয়ের ৮০ ঘর : রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দেবগ্রাম ইউনিয়নের বেতকা গুচ্ছগ্রামে ৮০টি ঘর নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ করেছে সুবিধাভোগীরা। ঘর নির্মাণের দুই বছর পার হলেও এখনো ঘরগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। কোনো ঘরেই বসবাস করতে পারছেন না সুবিধাভোগীরা।
সরেজমিন দেখা যায়, দেবগ্রাম ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ড হলো বেতকা। পদ্মা নদীর মাঝখানে গ্রামটি হওয়ায় সারা বছরই চলাচলের একমাত্র মাধ্যম নৌকা। প্রত্যন্ত গ্রামটিতে যারা বাস করেন তাদের অধিকাংশেরই পদ্মায় ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। ভূমি ও গৃহহীন এসব মানুষের জন্য তৈরি করা হয় ৩০০ বর্গফুটের দুই কক্ষের একটি করে ঘর। টিন, লোহা আর কংক্রিটের খুঁটি ব্যবহার করে গড়ে তোলা এসব ঘরে কোনো কাঠ ব্যবহার করা হয়নি। সামনেই রয়েছে ছোট বারান্দা। বারান্দার একপাশে রান্নার জায়গা। সারি সারি ঘরগুলো দুই বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো ঘরেই মাটি ভরাট করা হয়নি। ঘরের মাঝখানে দেওয়া হয়নি বেড়া। ফলে সুবিধাভোগীরা ঘরে বাস করতে পারছেন না। দুই বছর ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় ঘরগুলো পড়ে থাকার কারণে টিনের বেড়া খুলে পড়ছে। কংক্রিটের খুঁটিগুলো ভেঙে পড়ছে। প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ সুবিধা থাকার কথা। কিন্তু কোনো ঘরেই এখনো বিদ্যুৎ সুবিধা দেওয়া হয়নি। পাঁচটি পরিবারের জন্য একটি টিউবওয়েল আর রয়েছে ‘স্বাস্থ্যসম্মত’ টয়লেট। টয়লেটগুলো ভেঙে পড়েছে। বেশ কয়েকটি টিউবওয়েল এরই মধ্যে চুরি হয়ে গেছে। নদীভাঙনে ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের কোনো কাজেই আসছে না কোটি টাকা ব্যয়ের গুচ্ছগ্রামের ঘরগুলো। বেতকা গুচ্ছগ্রাম নামে এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালে এবং শেষ হয় ২০১৯ সালের মাঝামাঝিতে। চারদিকে পদ্মা নদী আর প্রত্যন্ত এলাকা হওয়ার কারণে সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কেউই খোঁজ রাখেনি এ প্রকল্পের।
এ প্রকল্পে ঘর বরাদ্দ পাওয়া রাজু সরদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার পরিবারের সদস্য পাঁচজন। ঘরটি পেয়ে অনেক খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু ঘরে মাটি ভরাট করা হয়নি। নিজেরা ঘরে মাটি দিতে গেলে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা লাগবে। এত টাকা কোথায় পাব? আর টাকা থাকলে কি সরকারের ঘর নিতাম।’
প্রকল্পে ঘর বরাদ্দ পাওয়া লুকমান প্রামানিক বলেন, ‘প্রতি বছর বর্ষায় বাড়িঘরে পানি ওঠে। কত কষ্ট করে থাকি। সরকার ঘর দিল, সেই ঘরে থাকতে পারছি না। একলাই ভেঙেচুরে পড়ছে। ঘরের মাটি ফেলানোর টাকা সাহেবেরা চুরি করছে।’
দেবগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাফিজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক দিন হলো ঘরের কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু ঘরে মাটি দেওয়া হয়নি। ফলে সুবিধাভোগীরা বাসও করছে না।’ দুই বছর পার হলেও ঘরে মাটি না ফেলার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গুচ্ছগ্রামে যখন প্রথম মাটি ফেলা হয় তখন ছিলেন এক ইউএনও স্যার আর আমিও চেয়ারম্যান তখন ছিলাম না। আবার যখন ঘরের কাজ হয় তখনো দুই-তিনজন ইউএনও স্যার বদলি হয়েছে। কেন মাটি ফেলা হয়নি এটা বলা মুশকিল। তবে দ্রুতই ঘরে মাটি ফেলা হবে।’
এ প্রসঙ্গে গোয়ালন্দ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আজিজুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি আজই বিষয়টা জেনেছি। আগামী ১৫ দিনের মধ্যেই ঘরগুলোতে যেন বসবাস শুরু হয় সেই চেষ্টা করব।’
