অপ্রতিরোধ্য মাদক কারবারিদের নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কোনো কৌশলই কাজে আসছে না। একদিকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, অন্যদিকে জামিন নিয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে ফের একই কারবার চালাচ্ছে তারা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো মাদক কারবারিদের চিহ্নিত করতে ইতিমধ্যে একাধিক তালিকা করেছে। কিন্তু, ওই তালিকা হালনাগাদ না হওয়ায় কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এমনকি ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহতরাও তালিকায় থাকছে।
এমন প্রেক্ষাপটে তিন মাস পরপর মাদক কারবারিদের তালিকা হালনাগাদের নির্দেশনা দিতে যাচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ঈদুল আজহার পর পুলিশ, র্যাব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে এ-সংক্রান্ত চিঠি দেওয়া হবে বলে দেশ রূপান্তরকে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। ওই চিঠিতে হালনাগাদ করা তালিকা নিয়মিত মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে বলা হবে। পাশাপাশি বিদেশে মাদকপাচার রোধে দেশের সবক’টি বিমানবন্দরের কুরিয়ার সার্ভিসগুলোকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সূত্রটি।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘মাদক নির্মূল করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কারবারিদের তালিকা করা হয়েছে। এগুলো মাঝেমধ্যে হালনাগাদ করা হচ্ছে। এখন আমরা চাচ্ছি, প্রকৃত কারবারিদের নাম তালিকায় থাকুক। নিরপরাধ কেউ যেন তালিকাভুক্ত না হয় সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।’
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, দেশে নতুন নতুন মাদক কারবারি গজিয়ে উঠছে। প্রতিদিন সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে তারা ইয়াবাসহ অন্য মাদক আনছে। মাদকের বেচাকেনা বেড়ে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও বিচলিত। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার বৈঠকে মাদক কারবারিদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ জানানো হয়। ফলে মাদক প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও সমাজসেবা অধিদপ্তর কাজ করবে বলে জানানো হয়। প্রত্যেক জেলায় একটি করে উন্নতমানের মাদক নিরাময় কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, মাদক কারবারিদের তালিকা নিয়ে নানা সমস্যা হচ্ছে। বছরের পর বছর একই তালিকা ঝুলে আছে। এখন এগুলো হালনাগাদ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার ওই বৈঠকে উপস্থিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা এখন তিন মাস পর পর মাদক কারবারিদের তালিকা হালনাগাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ঈদের পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে চিঠির মাধ্যমে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জানিয়ে দেওয়া হবে। তালিকা হালনাগাদ হলেই গ্রেপ্তার, মৃত এমনকি কারাবন্দি মাদক কারবারিদের সঠিক তথ্য বেরিয়ে আসবে। পুলিশ, র্যাবসহ অন্য সংস্থাগুলোকে সমন্বয় করেই তালিকা করতে বলা হবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে মাদকের চালান দেশের বাইরে যাচ্ছে। আর এটি হচ্ছে বিমানবন্দরের কুরিয়ার সার্ভিসগুলোর মাধ্যমে। এর মাধ্যমে কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী কারবারিদের থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। এদের নজরদারির আওতায় আনতে বলা হয়েছে।’
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আহসানুল জব্বার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মাদক পাচার হচ্ছে। ইতিমধ্যে এ ধরনের বেশ কিছু চালান ধরা হয়েছে। এদেশীয় কারবারিদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চক্রও এসব ঘটনায় জড়িত বলে আমরা তথ্য পেয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘এখনো চিঠি আসেনি। তবে মন্ত্রণালয় যে নির্দেশনা দেবে, তা আমরা পালন করব। আমাদের কাছে থাকা তালিকা হালনাগাদ করে মন্ত্রণালয়কেও জানাব। যেসব কুরিয়ার সার্ভিসের লাইসেন্স নেই, তাদের তালিকার কাজ শুরু হবে। বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের সঙ্গে আমরা বসেছি। তাদের বলেছি, কুরিয়ারের মালামাল পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রেরক ও প্রাপকের এনআইডি কপি সংরক্ষণ করতে।’
গত মাসের শেষ দিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে পুলিশ, র্যাবসহ বিভিন্ন সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তা ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক উপস্থিত ছিলেন। সেখানে আন্তর্জাতিক মাদক পাচার রোধ করতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, বিমানবন্দরে পার্সেল কুরিয়ার স্ক্যানিং ব্যবস্থা জোরদার, কুরিয়ারের কাগজপত্রে সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র সংযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বৈঠকে। এছাড়া লাইসেন্সবিহীন কুরিয়ার সার্ভিসগুলোকে আইনের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত হয়। ডাক বিভাগের কাছে লাইসেন্স এবং লাইসেন্স ছাড়া কতগুলো কুরিয়ার সার্ভিস আছে তার তালিকা চাওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য পাচার হয়ে আছে। বিশেষ করে ইয়াবা পাচার হচ্ছে বেশি। বিষয়টি নজরে আসার পর আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি।’ এ বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব মো. মোক্কাবির হোসেনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
জানা গেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৈঠকের পর সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরে আইজিপির নেতৃত্বে একটি বৈঠক হয়। বৈঠকে মাদক কারবারিদের ধরার পাশাপাশি আরেকটি নতুন তালিকার নির্দেশনা দেওয়া হয় প্রতিটি জেলার এসপিদের। মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি আসার পরই রেঞ্জ ডিআইজি, জেলার এসপিসহ ইউনিট প্রধানদের কাছে একটি নির্দেশনা পাঠাবে পুলিশ সদর দপ্তর।
পুলিশ অনুসন্ধান করে নিশ্চিত হয়েছে, নতুন করে মাদক কারবারিদের মধ্যে অনেকেই কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। ইয়াবা কারবারির আগে কেউ কেউ পকেটমার, ছিঁচকে চোর, রিকশাচালক ছিলেন। এখন তারা মাদকের গডফাদার হিসেবে পরিচিত। পুলিশের কাছে যে তালিকা আছে, তাতে জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্যের নামও রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত দুই বছর সারা দেশে র্যাব-পুলিশের হাতে ১ লাখের বেশি মাদক কারবারি গ্রেপ্তার হয়েছে। এ সময়ে মামলা হয়েছে প্রায় ২ লাখ। করোনার কারণে মাদক বিরোধী অভিযান কিছুটা শিথিল। এরই সুযোগে মাদক কারবারিরা এলাকায় আসছে বলে আমাদের কাছে তথ্য এসেছে।’
তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপির নির্দেশে মাদক নির্মূলের কাজ চলছে। তিন মাস পরপর কারবারিদের তালিকা হালনাগাদের নির্দেশনাটি আসলে এ তৎপরতা আরও জোরদার হবে। কারণ আগের তালিকায় এমন অনেক কারবারি আছে, যারা অনেক আগেই মারা গেছে। ঘুরেফিরে তাদের নামই থাকছে। এখন নিয়মিত হালনাগাদ হলে এ সমস্যা আর থাকবে না।’
