না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন পূর্ব-পাকিস্তানের প্রথম ক্যামেরাম্যানদের প্রধান, একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট আলোকচিত্রী, বাংলাদেশ টেলিভিশনের অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক গোলাম মোস্তফা।
পূর্ব পাকিস্তানের পাইলট টেলিভিশন শুরু হয়, ১০ পৌষ, ১৩৭১। আজ থেকে প্রায় ৫৭ বছর আগে। টগবগে তরুণ, প্রায় ছ’ফুট লম্বা গোলাম মোস্তফা তখন জাপানি ক্যামেরাম্যানদের নেওয়া পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পাইলট টেলিভিশনে যোগ দিয়েছিলেন। তখনকার দিনে একমাত্র পাইলট টেলিভিশন চ্যানেলে ১৬ মি.মি. সাদাকালো ফিল্ম নেগেটিভ প্রসেস হতো। তাই ১৬ মি.মি. ফিল্মে শ্যুটিং করতে হলে পাইলট টেলিভিশনের স্মরণ নিতে হতো। আর তখন ১৬ মি.মি. রোলেক্স ক্যামেরা অপারেট করত পাইলট টেলিভিশনের ক্যামেরাম্যান, সৈয়দ মাহমুদ আহমেদ, রফিকুল বারী ও গোলাম মোস্তফা। মাত্র এই তিন জন।
গোলাম মোস্তফা ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৭০ এর দিকে ‘নাবিস্কো-বিস্কুট’-এর বিজ্ঞাপন চলচ্চিত্র নির্মাণের সময়। সে-সময় পূর্ব পাকিস্তানের বিখ্যাত ও সার্থক একটি বিজ্ঞাপন এজেন্সির ব্যবস্থাপক ছিলেন আলী যাকের। যার বিজ্ঞাপন এজেন্সির নাম ছিল ‘ইস্ট-এশিয়াটিক’। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে এই এজেন্সির নাম হয় ‘এশিয়াটিক’। আলী যাকের স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রেও অভিনয় করতেন। এই এশিয়াটিক নির্মাণ করছিল ‘নাবিস্কো-বিস্কুট’-এর বিজ্ঞাপন।
পরিচালিক বা ডিরেক্টর আলী যাকের এবং ‘ডিওপি’ বা ডিরেক্টর অব ফটোগ্রাফি গোলাম মোস্তফা। আর বিজ্ঞাপন চলচ্চিত্রটির মূল চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম আমি জাঁ-নেসার ওসমান। সে সময় পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্র শিল্পের বিখ্যাত মেকআপ ম্যান ছিলেন আবদুস সালাম ভূঁইয়া। তিনিই এই বিজ্ঞাপন চলচ্চিত্রটির মেকআপ-ম্যান হিসেবে কাজ করেছিলেন। আবদুস সালাম ভূঁইয়া সেই সময় ব্যক্তিগত ‘ওপেল রের্কড’ গাড়িতে চড়ে আসতেন। এই বিজ্ঞাপন চলচ্চিত্রটি সে সময় টেলিভিশনে বেশ প্রশংসিত হয়েছিল।
গোলাম মোস্তফা তখন সারা দেশে একজন বিশেষ স্বনামধন্য বিজ্ঞাপন চলচ্চিত্র নির্মাতা, যিনি স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে প্রথম ইউম্যাটিক ফরমেটে বিজ্ঞাপন চলচ্চিত্র নির্মাণ করে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচার করেছিলেন। গোলাম মোস্তফা ভাই বাংলাদেশে আরও অনেক কিছুরই প্রথম ছিলেন। বাংলাদেশে বিয়ের অনুষ্ঠানের প্রথম ভিডিওগ্রাফিরও জনক আমাদের এই গোলাম মোস্তফা ভাই! যার সহকারী হিসেবে বিয়েবাড়ির ক্যামেরাম্যান রূপে কাজ করতেন পরে স্বনামধন্য টিভি ক্যামেরাম্যান শ্রী সমীর কুশারী।
এমনি বহু ইতিহাসের স্রষ্টা আমাদের সর্বজন শ্রদ্ধেয় গোলাম মোস্তফা। বাংলাদেশ টেলিভিশনে তখন বিশ্বসাহিত্যের খুব ভালো ভালো নামকরা সব নাটক প্রচারিত হতো। বাংলাদেশ টেলিভিশনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ প্রচারের পর সারা সমাজে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হয়। আর বিশ্বসেরা নাট্যকার শেকসপিয়ারের ‘টেমিং অব দি শ্রু’ অবলম্বনে ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ প্রচারের পর অভিনেতা শ্রদ্ধেয় গোলাম মুস্তাফা (সুবর্ণা মুস্তাফার পিতা) ও অভিনেত্রী রেশমার নাম মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। আর এই সব নাটকের ক্যামেরাম্যানরা অর্থাৎ গোলাম মোস্তফারা সবাই তারকা পর্যায়ের সম্মান লাভ করেন।
এই সময় পাইলট টেলিভিশনে এডিটিং-এর কোনো সুযোগ-সুবিধা না থাকার কারণে সব অনুষ্ঠানই সরাসরি সম্প্রচার হতো।
গোলাম মোস্তফা ভাইয়ের মুখ থেকে শোনা এক গল্প ‘অন এয়ারে, নাটক চলছে। অভিনেতা তার সংলাপ ভুলে গেছেন। কী করা যায়, কী করা যায়, তখন একজন স্ক্রিপ্টের পাতা ভাঁজ করে, রকেটের মতো বানিয়ে ফ্রেমে ছুড়ে দেয়, আর অভিনেতা তা কুড়িয়ে নিয়ে দেহ ঘুরিয়ে সংলাপে চোখ বুলিয়ে স্বাভাবিক রূপে অভিনয়ে ফিরে আসেন। বাড়ির দর্শকরা বুঝতেও পারলেন না স্টুডিওতে কী ঘটে গেল।’ আর একবার নাকি অভিনেতা সংলাপ ভুলে যাওয়াতে ফ্লোর ম্যানেজার ক্যামেরার ট্রাইপডের পাশ দিয়ে ক্রল করে, মানে দু’হাতের কনুইয়ের ওপর ভর করে, মাটিতে গড়িয়ে গড়িয়ে গিয়ে সংলাপ প্রম্পট করেছেন। আর এসব শত বিড়ম্বনার মধ্যেই মোস্তফা ভাইয়েরা ক্যামেরা পরিচালনা করেছেন।
আমি ১৯৮৯ সালে ভারতের পুনেতে অবস্থিত ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট থেকে চার বছরের ডিপ্লোমা পাস করে বিটিভিতে ক্যামেরাম্যানের চাকরির জন্য আবেদন করি। যথাসময়ে ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাক পেলাম। দুরু দুরু বুকে ইন্টারভিউ বোর্ডে প্রবেশ করে দেখি ইন্টারভিউ বোর্ডে বসে রয়েছেন তৎকালীন বিটিভির মহাপরিচালক সর্বজন শ্রদ্ধেয় এম. এ. সাঈদ এবং পাকিস্তান আমল থেকে আমার চেনা বিটিভির ক্যামেরা বিভাগের প্রধান গোলাম মোস্তফা ভাই। মনে মনে বললাম শুকুর আলহামদুলিল্লাহ। তাহলে মনে হয় চাকরিটা হয়ে যাবে!
ক্যামেরা বিভাগের প্রধান গোলাম মোস্তফা ভাই প্রচুর প্রশ্ন করলেন এক্সপোজার কউ? ডেপথ্ অব ফিল্ড কাকে বলে? নোডাল পয়েন্ট লউ? হোয়াট ইজ ব্যারেল অ্যাবেরেশন? ইত্যাদি ইত্যাদি। একটু যেন ঘেমে উঠলাম। বাবারে চেনা লোক এমনি নাজেহাল করছেন। পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটের চার বছরের অভিজ্ঞতায় মোটামুটি সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলাম ঠিকঠাক মতোই।
কিন্তু ধরা খেলাম, যখন মোস্তফা ভাই উপমহাদেশের বিখ্যাত গায়িকা রুনা লায়লার একটা ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ক্লোজ শট দেখিয়ে বললেন, ‘বলেন তো এই ফটোগ্রাফটা কত ফোকাল লেন্থ-এ তোলা হয়েছে?’ দেখলাম খুব সুন্দর ব্যাক লাইট করা, সফট লাইটে ওয়ান ইজ টু থ্রি রেশিওতে এক্সপোজ করা হয়েছে। আমতা আমতা করে আন্দাজে বললাম মনে হয় ১০০ মি.মি. লেন্স। ক্যামেরা বিভাগের প্রধান গোলাম মোস্তফা হেসে বললেন, ‘জি, না, হয়নি এটা ৭০ মি.মি. লেন্সে তোলা’। একটু বোকা বোকা হাসি দিয়ে চুপ করে গেলাম। অবশ্য, শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ টেলিভিশনে আমার চাকরিটা হয়েছিল। বহু বছর চাকরির পর সবশেষে চট্টগ্রাম টেলিভিশনের জেনারেল ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করে বিটিভি থেকে টেলিভিশন ক্যারিয়ারের চাকরি জীবনের ইতি টানি।
ক্যামেরা বিভাগের প্রধান গোলাম মোস্তফা ভাইয়ের সঙ্গে কত স্মৃতি আজ হু হু করে মনের মণিকোঠায় ভিড় করছে। আর একটা কথা বলে শেষ করি।
গোলাম মোস্তফা ছিলেন সত্যিকার অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ একজন মানুষ। আমাদের কলিগ ছিলেন শ্রী সমীর কুশারী। সমীরের অনেক কলিগ তাকে খামোখাই ‘মালাউন, মালাউন’ বলে ক্ষ্যাপাত। ক্যামেরা বিভাগের প্রধান মোস্তফা ভাইয়ের কাছে ব্যাপারটা শোভন মনে হয়নি। তাই তিনি একদিন সবাইকে ডেকে বিষয়টি বুঝিয়ে বললেন যে, ‘দেখেন মানুষের জন্ম কারও হাতে নেই, তাই কে কোথায় জন্মাল, কার ধর্ম কী, এ নিয়ে মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ করা উচিত নয়। আমরা সবাই বাঙালি, আমরা সবাই বিটিভির কলিগ, এই আমাদের পরিচয় হোক। আপনারা সবাই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, আশা করি আপনারা বিষয়টা বুঝবেন। তাই সব সহকর্মীর সম্মান যেন আমরা সবাই রাখতে পারি আপনাদের সবার কাছে এই আমার অনুরোধ।’
এই সর্বজন শ্রদ্ধেয় গোলাম মোস্তফা কিডনি রোগের জটিলতা নিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
সেই ১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান আমলে দেশের প্রথম এবং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের কাজ শুরু হয়েছিল। আজকের দিনে বাংলাদেশে প্রায় চল্লিশটি প্রাইভেট চ্যানেল সদর্পে বিরাজ করছে। এখন বাংলাদেশে প্রায় হাজারখানেক ক্যামেরাম্যান রয়েছেন, তাদের সবার মননে স্বর্ণাক্ষরে গাঁথা থাকবে একটি নাম, তা আমাদের টেলিভিশন ক্যামেরা জগতের পথিকৃৎ গোলাম মোস্তফা।
লেখক : চলচ্চিত্র নির্মাতা ও লেখক
