পিৎজা নিয়ে ব্যবসার পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকার পিৎজা বক্স সংগ্রহে রাখতে ভালোবাসেন নিউ জার্সির স্কট উইনার। ২০১৩ সালে ৫৯৫টি বক্স নিয়ে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ডে নাম উঠেছিল তার। এখন তার সংগ্রহে আছে ১৫৫০টি বক্স। এবারও গিনেসের তালিকায় নাম উঠছে তার। স্কট উইনারের পিৎজাবক্স সংগ্রহের ঘটনা লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা
স্কট উইনার
পিৎজা খেতে কমবেশি সবাই ভালোবাসেন। কিন্তু খাওয়া শেষে পিৎজাবক্স সংগ্রহের কথা সম্ভবত কেউ ভাবেন না। তাই খাওয়া শেষে বক্সের জায়গা হয় জঞ্জালে। কারণ টাকা দিয়ে পিৎজা কিনতে মানুষের যতটা আগ্রহ, পিৎজাবক্সের প্রতি ততটা নেই। নিউজার্সির স্কট উইনার এ বিষয়ে অন্যদের চেয়ে আলাদা। তিনি পিৎজা যতটা পছন্দ করেন, তার চেয়ে বেশি আগ্রহ পিৎজাবক্স সংগ্রহ করতে। তবে বক্সে রাখা পিৎজা নিয়ে তার কিছুটা অভিযোগ আছে। তার মতে, ‘পিৎজাবক্সে পিৎজা রাখা মোটেই ভালো আইডিয়া না। তার অভিযোগ, এতে সব বাষ্প আটকে থাকে। এজন্য রুটি বানিয়েই সেটি কেউ প্লাস্টিক ব্যাগে রাখে না। কারণ রাখলেই তাতে সব বাষ্প আটকে গিয়ে রুটি নরম করে ফেলবে।’ পিৎজাবক্স নিয়ে সাধারণত এত চিন্তা কেউ করে না। তিনি শুধু ভাবেনই না, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পিৎজাবক্সও তার সংগ্রহে রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে পিৎজাবক্স সংগ্রহ করা তার নেশা। ২০১৩ সালে সংগ্রহে থাকা ৫৯৫টি বক্স নিয়ে তার নাম উঠেছিল গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ডে। এখন তার বক্সের সংখ্যা ১৫৫০। নতুন এই সংখ্যা দিয়ে গড়েছেন আরও একটি রেকর্ড। যেখানে পিৎজাবক্সের বেশির ভাগই তেল লেগে ভিজে যায় এবং পরে সেগুলো ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়, সেখানে উইনারের বক্সগুলো একদম নতুন ও চকচকে।
এক দশক ধরে পিৎজা প্যাকেজিংয়ের কাজ করেছেন উইনার। সেখান থেকেই এই আগ্রহ তৈরি হয় তার। শুধু যে পিৎজা বক্স সংগ্রহে আছে উইনারের তা নয়, স্কট’স পিৎজা ট্যুরস নামে একটি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে তার। সঙ্গে কাজ করছেন নন-প্রফিট সøাইস আউট হাঙ্গার নামক একটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে। লোকে শুধু উইনারকে জানে পিৎজা বক্স সংগ্রাহক হিসেবে। সবাই ভাবে এটা ছাড়া তিনি আর তেমন কাজ করেন না। তাই তারা বারবার জানতে চান তিনি আর কী কাজ করেন। তখন সবাইকে নিজের অন্যান্য কাজ সম্পর্কে জানান। উইনার বলেন, ‘আমি অন্যান্য কী কাজ করি সেটি নিয়ে জানার চেয়ে পিৎজার বক্স সংগ্রহ নিয়ে জানতে চায় এমন মানুষের সংখ্যা বেশি। আমিও সবাইকে আনন্দ নিয়েই নিজের কাজ সম্পর্কে জানাই।’
পিৎজার প্রতি ভালোবাসা
নিউজার্সিতে যেখানে উইনার বড় হয়েছেন সেখানে বেশ ভালো ভালো পিৎজা পাওয়া যেত। উইনার বলেন, ‘যে শহরে আমার বেড়ে ওঠা, সেখানে পিৎজা পাওয়া যেত। কিছু পিৎজা খেতে দারুণ ছিল, কিছু খেতে একদম মজা লাগত না। সেগুলো মনে রাখার মতো ছিল না।’
গত বছর করোনায় লকডাউন শুরু হলে বাড়ি বসে করার মতো কিছু ছিল না। সময় কাটাতে ডায়েরি লেখা শুরু করেন। ২০০০ সাল থেকে শুরু করে নানা ঘটনা লিখেছিলেন ডায়েরিতে। মজার বিষয় হচ্ছে, সে ডায়েরিতে তিনি যা লিখেছিলেন তার প্রায় সব তথ্যই ছিল পিৎজাকেন্দ্রিক। উইনার বলেন, ‘পিৎজা নিয়ে আমি যত কিছু জানি, অন্যকিছু নিয়ে ততটা নয়। তাই পিৎজা নিয়েই আমার সব লেখা।’
তখনো উইনার ফুড ক্যারিয়ার শুরু করেননি। পিৎজাকে ভালো লাগার জায়গা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার আগে সংগীত অঙ্গনে কাজের সুযোগ খুঁজেছিলেন। বদলেছেন একের পর এক চাকরি। ঐতিহাসিক নিউ ইয়র্ক বোট ‘ইয়াংকি ফেরি’তে চাকরি করতেন উইনার। বোটের রুম ও বোর্ড দেখাশোনার দায়িত্ব ছিল তার। এখানে চাকরি করতে এসেই কখনো চাকরি করবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ফেরিতে যখন কোনো মানুষ থাকত না, তিনি তখন বিভিন্ন বোটের মালিকদের নিয়ে নিউ ইয়র্কের সড়কে ঘুরে ঘুরে পিৎজা খাওয়াতেন। জানাতেন কোথায় ভালো পিৎজা পাওয়া যায়। এভাবে ঘুরতে ঘুরতেই তিনি বুঝতে পারলেন পিৎজা তিনি কতটা পছন্দ করেন। পিৎজার প্রতি এমন ভালোবাসা থেকেই প্রতিষ্ঠা করলেন ‘স্কট’স পিৎজা ট্যুরস’। ২০০৮ সাল থেকে পেশা হিসেবে কাজ শুরু করে এখন পর্যন্ত পিৎজার প্রতি একটুও ভালোবাসা কমেনি উইনারের।
যেভাবে শুরু হলো
পিৎজা বক্স সংগ্রহের শুরু হয়েছিল নিউজার্সিতে থাকার সময়। ২০০৯ সালে নিউ ইয়র্কের স্টার-লেজার পত্রিকায় ফুড রাইটার পিটার জেনোভেজের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে রাজ্যের সেরা পিৎজার দোকানগুলো খুঁজে বের করতেন। তারা দুজনে ৩৩৩টি দোকান ঘুরেছেন। জেনেছেন পিৎজার নানা পার্থক্য আর স্বাদ নিয়ে। তখন দেখতে পান শুধু পিৎজায় নয়, পার্থক্য রয়েছে বিভিন্ন এলাকার পিৎজাবক্সেও। বিষয়টিতে বেশ মজা পান উইনার। তার কাছে মনে হয় এই যে একেক জায়গায় একেক রকম বক্স বানানো হয়, সেগুলো তো সংগ্রহেও রাখা যায়। যেমন ভাবনা, তেমন কাজ। শুরু করলেন পিৎজাবক্স সংগ্রহ। উইনার বলেন, ‘অনেক জায়গা ঘোরার কারণে পার্থক্যগুলো বেশি চোখে পড়েছিল। পিৎজার বক্সগুলোও এক রকম নয়। এর অর্থ শুধু পিৎজা বানানোতে নয়, বক্স বানানোর জন্যও মানা হয় নানা নিয়ম। এ বিষয়টি আমাকে বেশ আকৃষ্ট করে। মনে হয়, মানুষের কত রকম শখই তো থাকে। তাহলে বক্স সংগ্রহ শুরু করলে কেমন হয়? সেই থেকেই শুরু।’
সংগ্রহের একদম শুরুতে বুঝতে পারছিলেন না কী ধরনের বক্স সংগ্রহ করা যায়। একটি ঘটনা তাকে এই কাজ শুরু করতে আগ্রহী করে তোলে। একবার এক দোকানে গিয়ে পিৎজা সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। সেই দোকানে বক্সের পরিবেশক ছিল রোমা ফুডস। বক্সের গায়ে লেখা ছিল, ‘ট্যুর অব ইতালি’। ফ্লোরেন্সের চড়হঃব ঠবপপযরড়-এর একটি ছবি ছিল বক্সে। ওপরের অংশটি দেখে বেশ ভালো লাগল। বক্সের পেছনের অংশে লেখা ছিল ‘ভলিউম টু’। লেখাটি দেখে উইনার একটু অবাক হন।
মনে প্রশ্ন জাগে, ভলিউম দুই মানে? তার মানে এটার ভলিউম একও ছিল? পরে ভলিউম তিন চারও আসবে?
দোকানিকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন, ‘অবশ্যই। এভাবেই ভলিউমের কাজ হয়। এগুলো সংগ্রহে রাখার মতো বক্স। কিন্তু আমার মনে হয় না এসব কেউ সংগ্রহে রাখতে চায়।’
আগ্রহ থেকেই বেশ কিছু বক্স সংগ্রহে রেখেছিলেন উইনার। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ২০১০ সালে তার সংগ্রহ ফেলে দিতে হয়। ক্ষুধা দূর করার একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য তিনি অর্থ জোগাড় করতেন। নাম ছিল ‘সøাইস আউট হাঙ্গার’। সেই প্রতিষ্ঠান চালাতে গিয়ে তাকে সব বক্স বিক্রি করে দিতে হয়। ২০১৫ সালে এসে এটি পুরোপুরি নন-প্রফিট হয়ে উঠেছে। কিন্তু তখন এই প্রতিষ্ঠান চলবে এমন নিশ্চয়তাও ছিল না। উইনার বলেন, ‘আমি বোকার মতো ভেবেছিলাম মানুষকে এসব দেখালে অর্থ আয় হতে পারে। কিন্তু আমি ভুলে গিয়েছিলাম পিৎজাবক্স নয়, ডলার দিয়ে কেনা পিৎজার শুধু দাম আছে।’
তাই নতুন করে আবারও সিদ্ধান্ত নিলেন পিৎজাবক্স সংগ্রহের। যেভাবেই সুযোগ পেয়েছেন সবাইকে জানিয়েছেন বক্স সংগ্রহের ব্যাপারে। বুঝলেন, এভাবে বললে হবে না। সবাইকে বক্স দেখানোর একটা আয়োজন করতে হবে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর পিৎজার বক্সগুলোকে ভিন্ন উপায়ে সাজালেন। যে ভেন্যুতে ইভেন্টটির আয়োজন করেছিলেন সেখানকার দেয়ালে বক্সগুলো এঁটে দেন। দেখে মনে হচ্ছিল মিউজিয়ামের কোনো চিত্রিত ছবি। মানুষ এখানে এসে বক্সের এমন ভিন্ন রূপ দেখে অবাক হয়ে তার সংগ্রহ সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল। এরপর থেকে প্রতি সপ্তাহে তিনি পিৎজাবক্স পাচ্ছিলেন। তার সংগ্রহ মানুষের নজর কাড়ে। যারা এসেছিলেন তারা অন্যদের জানান। অল্পদিনের মধ্যে প্রতি সপ্তাহে কারও না কারও কাছ থেকে বক্স পাচ্ছিলেন।
বক্সের নানা ধরন
ব্রুকলিনের অ্যাপার্টমেন্টে তার জমানো পিৎজার বক্সগুলো দেখে মনে হয় যেন বক্সের টাওয়ার। তার কাছে নানা ধরনের বক্স আছে। এর মধ্যে একটি- ছোট ম্যাকডোনাল্ড ব্র্যান্ডের পিৎজাবক্স। মজার বিষয় হচ্ছে, বক্সটি যিনি পাঠিয়েছেন তিনি উইনারের ঠিকানা কীভাবে পেয়েছেন জানেন না। এই বক্সটি ৯০ দশকের, যখন প্রতিষ্ঠানটি বার্গার থেকে পিৎজা বানানো শুরু করেছিল। আরও একটি আকর্ষণীয় বক্স আছে তার কাছে। ‘আমার কাছে যুক্তরাজ্যের পিৎজা হাটের একটি বক্স আছে। বক্সটি বানানো কার্ডবোর্ড দিয়ে। এটি চাইলে স্মার্টফোনের প্রজেক্টর হিসেবেও ব্যবহার করা যায়,’ বলেন উইনার।
উইনারের কাছে একদম রঙিন আরও একটি পিৎজাবক্স আছে। দেখে মনে হয় তেলরঙে আঁকা। বক্সের ওপর বেকারের ছবি একদম স্পষ্টভাবে আঁকা। কিছু বক্সে পরিবেশকরা ছোট ছোট ক্লিপ আর্ট জুড়ে দিতেন। ইতালিয়ান মনুমেন্ট অথবা হাসিমুখের একজন শেফের ছবিও থাকত।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বক্সের নকশা বদলায়। এমনকি এলাকা থেকে এলাকায়ও। উইনারের কাছে ‘শিকাগো ফোল্ডার’ নামে একটি বক্স আছে। বক্সটি ভেঙে সমতল করে ফ্ল্যাট করে রাখা যায়। পিৎজা সøাইস করে খুব সহজে বক্সে রাখা যায়। চারপাশেই বক্সটি খোলার পদ্ধতি আছে। যার কারণে একটি সøাইস নেওয়ার সময় অন্যটির গায়ে লাগে না। আবার বক্সে আটকেও যায় না। পূর্ব উপকূলে যে পিৎজাবক্সটি ব্যবহার করা হয়, সেটিতে কার্ডবোর্ডের দুটো কাগজ শুধু ক্লিপ দিয়ে আটকে দেওয়া হয়। অন্যান্য পার্থক্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, এই পিৎজাবক্সে কার্ডবোর্ডের ব্যবহার।
১৯৬০ সালের দিকে এমন বক্স ব্যবহারের রীতি চালু হয়। এর আগে ভালো পিৎজা বানানো হলেও সেগুলো পেস্ট্রি বক্সে দেওয়া হতো। এমনকি শুরুর দিকে, সাধারণভাবে পেপারের ব্যাগে দেওয়া হতো পিৎজা। যখন পিৎজার আকার বড় হতে থাকে এবং বিক্রির পরিমাণ বেড়ে যায়, তখন ডমিনোর প্রতিষ্ঠাতা ভাঁজ করা কার্ডবোর্ডের ব্যবহার চালু করেন। কাগজের চেয়ে এই বক্সগুলো বেশি শক্ত হতো। পিৎজার গায়ে লেগে যেত না। এরপর থেকে পিৎজাবক্স প্রস্তুতকারকরা বক্স স্কয়ার রাখা শুরু করেন।
উইনারের সংগ্রহে মজার মজার বক্স রয়েছে। এর মধ্যে অ্যাপলের কর্মীদের জন্য বানানো পিৎজাবক্সও আছে। এই বক্সটি গোলাকার, সাদা শামুকের খোলসের মতো, সঙ্গে হুক লাগানো আছে। ফুলানো এই বক্সটি বানানো হয়েছে ডেনমার্ক থেকে। উইনার চান, এত সুন্দর সুন্দর নকশা করা বক্সগুলো বানানো যেন বন্ধ না হয়ে যায়। ‘দোকানিরা জিনিস বদলানোর ব্যাপারে খুব ভালো নয়,’ বলেন উইনার। করোনার সময় সবাইকেই বেশ সমস্যা পোহাতে হয়েছে। তবে বাড়ি গিয়ে খাবার পৌঁছে দেওয়ার সেবায় কমবেশি সবাই ভালো করেছে। এ সময় আসলে কেউ নকশাবদলের কথা ভাবছে না।
উইনারের নিজেকেও অনেক কিছু মেনে নিতে হয়েছে। তিনি বাড়িতে পিৎজা বানিয়েছেন, কিন্তু দোকানে আসা মানুষ, খাবারের ঘ্রাণ সবকিছুর কথা তার অনেক মনে পড়েছে। শহর ঘুরে যখন পিৎজা ট্যুর দিতে পারেননি, তখন প্রতি রাতে পিৎজা বানানোর অনলাইন ক্লাস নিয়েছেন। তার প্রতিষ্ঠান থেকে সামনের সারির স্বাস্থ্যকর্মীদের ২৫ হাজার পিৎজা দেওয়া হয়েছে। মহামারীতে তিনি প্রায় প্রতিদিন বিভিন্ন হাসপাতালে পিৎজা ডেলিভারি দিয়েছেন।
বর্তমানে তিনি এই কাজের জন্য আরও স্বেচ্ছাসেবক খুঁজছেন। আশা করছেন পেয়েও যাবেন। পিৎজার ব্যাপারে যেকোনো কাজ করা অনেক সহজ। কিন্তু যখন বক্সের কথা আসে, তখন তিনি একা। তার মতো আর কেউ বক্স জমায় না। তবে উইনারের মতে, অন্যের থেকে আলাদা হওয়ার আনন্দও আছে। তিনি বলেন, ‘আমার মতো আর কেউ পিৎজাবক্স জমায় না। আমার মতো কেউ বলতে পারে না, আমার কাছে পাঁচটি ম্যাকডোনাল্ডের বক্স আছে। ডিজনি বক্সের বদলে আপনি আমার কাছ থেকে ম্যাকডোনাল্ডের বক্স নিতে পারেন।’
