প্রযুক্তির কল্যাণে তিন প্রজন্মের মেলবন্ধন

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২১, ১১:৪৮ পিএম

যুক্তরাজ্যের বাসিন্দা ঔপন্যাসিক রাহুল রায়নার পরিবারে রান্নার তত্ত্বাবধায়ক তার দাদি। কিন্তু দাদি থাকেন ভারতে। প্রযুক্তি ও ঐতিহ্যবাহী রান্নার টান রায়না পরিবারকে কাছে এনেছে। দাদি, মা ও রাহুল কীভাবে একত্র হলেন? দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত রাহুল রায়নার লেখা অনুবাদ করে জানালেন আরফাতুন নাবিলা

কাশ্মীরি রান্না

কাশ্মীরি রেসিপির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এক প্রজন্ম অন্য প্রজন্মকে সেটি শিখিয়ে দেয়। ছোট ছোট রান্নাঘরে মায়ের কাছ থেকে চুলায় কড়াই বসিয়ে, তেল ঢেলে শুরু হয় মেয়েদের রান্না শেখা। মা পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন, দেখিয়ে দেন কীভাবে কোন রান্না করতে হবে। মনোযোগী শিক্ষার্থীর মতো মেয়েও শিখে নেয়। তবে হোয়াটসঅ্যাপে ক্যামেরার লেন্সে চার হাজার মাইল দূর থেকে চিৎকার করে রান্নার কাজটি সচরাচর হয় না। কিন্তু এমন ঘটনাই ঘটেছে আমাদের (রায়না) পরিবারে। কাশ্মীরি রান্নার একটি ঐতিহ্য আছে। এখানকার রান্নার কোনো রেসিপি কাগজে লেখা হয় না। রান্নায় সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয় নিজের স্মৃতি ও স্বাদকে। পুরনো খাবারের স্বাদ মনে করেই একেকটি খাবার তৈরি করা হয় এখানে। আমার পরিবার এই স্বাদ তুলে এনেছে প্রযুক্তির মাধ্যমে।

দাদির সঙ্গে দূরত্ব

বাবা-মায়ের সঙ্গে আমি যুক্তরাজ্যে চলে আসি ১৯৯০ সালে। আমার দাদিকে অনেক অনুরোধ করলেও তিনি আমাদের সঙ্গে আসতে রাজি হননি। এখানে না আসার জন্য দাদি অনেকগুলো কারণ উল্লেখ করেছিলেন। যেমন ব্রিটেন অনেক ঠা-া একটি জায়গা। এ ছাড়া এখানে কোনো মার্কেটে কাউকে তিনি চেনেন না। তারা দাদিকে ধোঁকা দিতে পারে। বুঝতে পেরেছিলাম, নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে দাদি আসলে আসতে চান না। এসব শুধু বাহানা মাত্র।

ব্রিটেনে শুরুর দিকে, আমরা কাউন্সিল হাউজিংয়ে ডেথ-ট্র্যাপ অ্যাপার্টমেন্টে (একদম ছোট ছোট ঘর) থাকতাম। ব্যয়বহুল ফোন করার জন্য স্ক্র্যাচকার্ড ব্যবহার করতে হতো। এই কার্ড দিয়ে কল করার আগেই লাইন কেটে যেত। তাই ফোন ব্যবহার করাও হতো না। না বলা কথাগুলো আমাদের মনেই রয়ে যেত। ভারতে ফোন করার সুযোগও ধীরে ধীরে কমে আসতে লাগল। সঙ্গে আমরাও আগ্রহ হারালাম।

আমার দাদি

আমাদের সিদ্ধান্তে অনেকখানি জায়গা জুড়ে ভয় ঘিরে ধরেছিল। অনেক বছর ধরে আমার দাদি একা থাকতেন। আমরা যখন পারতাম তার সঙ্গে দেখা করতে যেতাম। কিন্তু এই আধুনিক দুনিয়া সব সময় তাতে ব্যাঘাত ঘটাত। দাদি তার প্রতিবেশী শিশুদের ইংরেজি শেখাতেন, এমনকি বাড়িতে যারা কাজ করতেন তাদের সন্তানরাও দাদির কাছে লেখাপড়া শিখত। আমরা দাদিকে অনেক নিষেধ করেছি। প্রধান শিক্ষিকা পেশায় থাকা আমার দাদি ছিলেন একরোখা। আমাদের কোনো কথাই তিনি শুনতেন না। তিনি শিশুদের ফেলে দিতে পারেননি। পড়ানো বন্ধ করা তো দূরে থাক, দাদি তাদের পরিবারকে প্রায়ই ছোটখাটো গিফট দিতেন। কারও অফিসে চাকরি চলে গেলে তাদেরও অর্থ দিয়ে সাহায্য করতেন। বাড়িতে কাজ করার জন্য অনেক গ্রামবাসী দিল্লিতে চলে যেত। তারা যদি চাকরি হারিয়ে বাড়ি ফিরে আসতে চাইত দাদি তাদের বাস ভাড়াও দিয়ে দিতেন।

ধীরে ধীরে যুক্তরাজ্যে আমাদের সংসার সচ্ছল হলো। দামি প্রযুক্তির জিনিস দিয়ে ঘর ভরে গেল। আমরা আধুনিক হয়ে উঠছিলাম, কিন্তু আমরা যে কাশ্মীরের উত্তরাধিকার, সেটা ভুলে যাচ্ছিলাম। আমাদের রীতিতে ব্রিটিশ ছাপ দেখা যাচ্ছিল। দাদির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য আমরা সবাই মিলে একটি সিদ্ধান্ত নিলাম। ২১ শতকের শুরুর দিকে আমরা মজার একটি পারিবারিক ঐতিহ্য চালু করলাম। প্রতিবার ভারত ভ্রমণের সময় দাদির জন্য ফোন, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট নিয়ে যেতাম। খুব আনন্দ নিয়ে দাদি সেগুলো গ্রহণ করতেন। একসঙ্গে বসে দাদিকে শিখিয়ে দিতাম কীভাবে সেগুলো কাজ করে। একে অন্যকে ওয়াদা করতাম রোজ আমরা এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে ওয়েব চ্যাট, ভিডিও কল করব। এরপর আমরা ফিরে আসতাম। দুই সপ্তাহ পার হয়ে যেত। আমাদের পরিবারের কোনো সদস্য অথবা দাদি কেউ সেসব গ্যাজেট নিয়ে আর কথা বলত না। এভাবে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে বাড়তে থাকে দূরত্ব।

লকডাউন শুরুর পর

দূরত্ব বাড়ছিল ঠিকই, কিন্তু দাদির জন্য চিন্তা হতো সব সময়। দাদি নিজের খেয়ালমতো চলা মানুষ। আমাদের সঙ্গে আসেননি বলে তার জন্য বাবা-মা সব সময় ভাবতেন। এদিকে আমরা এই দেশে চলে আসায় সংস্কৃতি নিয়েও অনেক কিছু অজানা থেকে যাচ্ছিল। কাশ্মীরি খাবারের স্বাদ আমরা ভুলতে বসেছিলাম। ভেবেছিলাম আগের মতো ভারতে যাওয়া হবে। কিন্তু মহামারীতে সব পরিকল্পনা বদলে গেল। আবার কবে দাদিকে দেখব সেটাও ছিল অনিশ্চিত। রান্নার স্বাদ পাওয়া তো দূরের কথা।

লকডাউন শুরু হওয়ার পর, আমরা দাদির সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি। কারণ অনেক দিন দাদির কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছিল না। দাদি সুস্থ আছেন সেটাই শুধু আমাদের জানার ছিল। কোভিড শুরুর দিকে আমার মা দাদিকে এক রকম ব্ল্যাকমেইল করে বলেছিলেন, ‘তুমি যদি আমাদের রান্নার রেসিপি না দাও, আমি কীভাবে আমার সন্তানদের সেগুলো খাওয়াব? আবার আমার ছেলে যদি না শেখে সে কীভাবে তার সন্তানদের শেখাবে? তারা তো তাহলে না খেয়ে অসুস্থ হয়ে যাবে।’ এই কথা কাজে এলো। ভারতীয় ধারণায়, ব্রিটিশ খাবার মানেই বাঁধাকপির পাতা ও চর্বিযুক্ত খাবার। দুঃখের বিষয়, ব্রিটিশরা যে তাদের রান্নায়ও নতুন অনেক পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে সেটি ভারতে তেমন কারও জানা নেই। দাদি শুরুতে রান্না শেখানো নিয়ে তেমন আগ্রহ দেখাননি। পরে মায়ের ব্ল্যাকমেইলে রাজি হলেন। রান্না শেখার হাতেখড়ি হলো হোয়াটসঅ্যাপে। সেই দাদিকেই যখন কিছুদিন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না, আমাদের দুশ্চিন্তা বেড়ে গেল। পরে প্রতিবেশীদের সাহায্য নিয়ে দাদি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন।

ভারতে কোভিড ভয়াবহভাবে হানা দিয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো ছেয়ে গিয়েছিল অক্সিজেন, রক্ত আর প্লাজমা চেয়ে। যে যেভাবে পেরেছে কোন হাসপাতালে খালি বিছানা আছে তার সে তথ্য জানিয়েছে, ইন্সটাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ও টুইটারের মাধ্যমে মেডিকেলের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিস হাতবদল করেছে। এক কথায়, প্রযুক্তির নতুনত্বের কারণে মানুষ অনেক সহায়তা পেয়েছে। কিন্তু আমাদের পরিবারের জন্য এই প্রযুক্তি আশীর্বাদ হয়েছে অন্য কারণে। যে কাশ্মীরি ঐতিহ্য আমরা ভুলতে বসেছিলাম, যে স্মৃতি আমাদের মস্তিষ্কে আবছা হয়ে ছিল, সে সবকিছু আমরা ফিরে পেয়েছিলাম এই প্রযুক্তির কারণে। নীরবতা ভেঙে আমরা একে অপরের কাছে এসেছিলাম।

তিন প্রজন্মের মেলবন্ধন

গত বছরের মে মাস থেকে শুরু হয়েছিল আমাদের তিন প্রজন্মের একসঙ্গে প্রযুক্তি ব্যবহার। হারানোর মতো আর সময় ছিল না। ভারত লকডাউনে ছিল। পুরো দেশ এক রকম স্তব্ধতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। আমি, মা আর দাদির মধ্যে কথা হতো ভিডিও কনফারেন্সে। দাদিকে অনেক অনুরোধ করা হয়েছিল রান্না শেখানোর জন্য। কিন্তু দাদি বলেছিলেন, ‘আমি যদি তোমাদের এখন রান্না শিখিয়ে দিই, তোমরা আবার আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দেবে।’ তার মতে, আমরা আসলে অল্প সিরিয়াস, পুরোটা নয়। কোনোভাবেই দাদিকে বোঝানো যাচ্ছিল না যে, আমরা আসলেই দাদির কাছ থেকে রান্না শিখতে চাই। আর দাদিকেও নিয়মিত কল করব, কথা বলব। সবাই মিলে সম্ভবত হাজারখানেকবার অনুরোধ করা হয়েছিল দাদিকে। এরপর তিনি রাজি হলেন রান্না শেখানোর জন্য। এরপর শুরু হলো আমাদের প্রশিক্ষণ। নামমাত্র আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা আমার দাদি শুরু করলেন কাশ্মীরের রান্না শেখানো। তিনি ক্যামেরা ঠিকভাবে ধরতে পারছিলেন না। হোয়াটসঅ্যাপে তাকে দেখে কিছুটা ভূতের মতো লাগছিল, আলো ছিল ভীষণ খারাপ, কিন্তু তার কণ্ঠ ছিল দৃঢ়। অটল হয়ে দাঁড়িয়ে তিনি কাজ শুরু করলেন। শুরু হলো আমাদের রান্না শেখা।

আমার দাদি আমাদের নিয়ে গর্ব করতেন। কিন্তু একরোখা হওয়ার কারণে মুখে কখনো ভালোবাসি বলতেন না। রান্নার মাধ্যমে তিনি ভালোবাসা জানাতেন। কাশ্মীরিদের কাছে খাবার হলো চিরন্তন আলোচনার এক বিষয়, এই রান্না নিয়ে বিরোধও হতো, আবার এই রান্নাই কাশ্মীরিদের উৎফুল্ল রাখত। আমরা যদি খাবার নাও খেতাম, তবু আমরা রান্না করতাম, পরিকল্পনা করতাম, চিন্তা করতাম। শুধু রান্না নিয়ে ভাবার কারণে কত বিজ্ঞানী, লেখক, কবি, রাষ্ট্রনায়ক যে তৈরি হয়নি তা ভাবলেই আমার অবাক লাগে। এটাই আমাদের খাবারের প্রতি আন্তরিকতা, এই খাবার আমাদের উৎসবের অন্যতম বিষয়, একটু প্রশংসায় এই খাবার চলে যায় অনন্য উচ্চতায়।

কাশ্মীরি খাবার জটিল কিছু নয়। এতে সবচেয়ে জরুরি পরিচ্ছন্ন, গুণমানসম্পন্ন উপাদান যেমন সবুজ ও কালো এলাচ, আদা, মৌরি গুঁড়ো, পদ্মের শিকড়, সবুজ শাক, ওলকপি ইত্যাদি। উপাদানগুলো সাধারণ হলেও কাশ্মীরি রান্নার যে পদ্ধতি সেটি অন্যদের থেকে একদম আলাদা। সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিষয়, দ্রুত রান্না, মুহূর্তেই বিস্বাদ খাবারের স্বাদ বদলে ফেলা, গবেষণা, যুক্তি সবকিছুতেই অনন্য কাশ্মীরের নারীরা। মা থেকে মেয়ে, শাশুড়ি থেকে বউ অর্থাৎ এক থেকে অন্যের হাতে এই রান্নার পদ্ধতি গড়ায়। কিন্তু যেটা আমি একজন ছেলে হয়ে কখনো ভাবিনি, সেটি ঘটেছে আমার ক্ষেত্রে। সময় বদলায়, জগৎ বদলায়। আমিও বদলেছি সময়ের সঙ্গে। আমার ১৬ বছর বয়সে দাদি বলেছিলেন, ‘আমাদের আধুনিক বিশ্বে কাশ্মীরি পুরুষদেরও রান্না শিখে দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দেওয়া উচিত।’ ব্রিটেনে চলে আসার পর, আমাদের পারিবারিক বন্ধনে ফাটল ধরেছিল। এই কাশ্মীরি রান্নাই আমাদের একত্র করে রেখেছিল। তবে সবার ঘটনা আমাদের মতো নয়। দূরে চলে আসার কারণে অনেক পরিবারে ভাঙন ধরেছে। সম্পর্কে ছেদ পড়েছে। কাশ্মীরি টান তাদের আটকে রাখতে পারেনি।

রান্নায় কিছু কিছু ব্যাপার কখনোই শব্দে বোঝা যায় না। যেমন প্রেশার কুকারে কখন শব্দ হয়? এক চিমটি মানে কী? দই অথবা পানি যুক্ত করার আগে ঝাল মসলার রং কেমন হতে হয়? একটা আপেল কতটুকু টক হতে পারে? আমি হয়তো ফোনে শুনলে এসব ভালো বুঝতে পারতাম না। ইন্টারনেটের সাহায্যে এক ভিডিও থেকে আরেক ভিডিওতে দাদির বলা এসব তথ্য আমি জানতে পেরেছি। আমি যতবার চাই ততবার দাদিকে জিজ্ঞেস করতে পারি। আমি দেখতে পাই দাদি কী করছেন। কতটুকু জিনিস তিনি কড়াইতে দিচ্ছেন, কেমন রং হচ্ছে, কত সময় লাগছে। আমি এমন ছোট ছোট অনেক কিছু জেনেছি যেগুলো কোনো ফোন, ই-মেইল অথবা অন্য কোনো মাধ্যমে শেখা যেত না। আমি হয়তো ভিডিও দেখে সব শিখতে পারতাম, কিন্তু সেখানে আমার দাদির রেসিপি থাকত না, কাশ্মীরের স্বাদ থাকত না।

ল্যাপটপে জুমে কথা বলতে না পেরে, দাদির সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে পরে কী কথা হয়েছিল, সেটি আমার এখন খুব ভালো করে মনে নেই। দম আলু, মাস্টার্ড অয়েলে সেদ্ধ আলু ভাজা, পরে সেটি দই ও জিরা মেশানো মিশ্রণে ভালো করে রান্না করা, সঙ্গে এলাচ, আদা, মৌরি, কাশ্মীরি মসলা দেওয়া সবই শিখেছি দাদির থেকে। আমি শুধু খাবার খাওয়ার জন্য নয়, দাদি কোন জিনিস কীভাবে কখন দিচ্ছেন, তার কণ্ঠ ভালো করে শুনতাম, হাত ও মুখের দিকে বেশি তাকিয়ে থাকতাম। একবার লাইন কেটে গেলে আবারও কল দিয়ে তাকে দেখাতে বলতাম। হাতে যখন রান্না হয়ে আসত, তখন মা-ছেলে মিলে বলতাম, এই কাজটি আমরা আগে কেন করিনি?

পরের ১০ মাস দাদি আমাদের তার সবচেয়ে পছন্দের রান্না যেগুলো বহু বছর ধরে আমাদের পরিবারে রান্না হচ্ছে সেগুলো শিখিয়েছিলেন। অল্প তেলে মাংস রান্না করা, হলুদের সসে সতেজ পনির রান্না সব শিখিয়েছিলেন দাদি। আমাদের পরিবারের লবণ চায়ের একটি পুরনো রেসিপি আছে। এতে অল্প লবণ দেওয়া হয়। হালকা গোলাপি বর্ণের চায়ের ওপর বাদাম ছিটিয়ে দিতে হয়। এই রেসিপিও দাদি বানানো শিখিয়েছিলেন। 

আমরা সবচেয়ে বেশি উৎসাহী ছিলাম ল্যাম্ব ইয়াখনি বানানোর জন্য। মা আর আমি জানতাম না ঠিক কীভাবে সেটি বানানো হয়। দাদির দেওয়া রেসিপিতে সেটি বানিয়েছিলাম। এর আগে আমরা মাছের সঙ্গে আপেল দিয়ে খেয়েছি, সঙ্গে ছিল তেঁতুল টক, এরপর ল্যাম্ব জাস্ট পুড়িয়ে কাবাব করেছি। কিন্তু ইয়াখনির রান্না ছিল অন্যরকম।

এই খাবারের রেসিপিটা আমাদের পরিবারের গোপনীয়। দাদির মা তাকে শিখিয়েছিলেন। কাশ্মীরি পরিবারে জন্মের কারণে লাহোরের পুঁজিবাদীদের কারণে তাদের দুঃখের অনেক সময় কাটাতে হয়েছে। তখন দাদি শিখেছিলেন এই রান্না। শীতে শরীর গরম রাখার জন্য ইয়াখনি অনবদ্য। পাতলা দই, ক্রিমের আস্তরণ, অল্প কিছু জাফরান, ঘি, চর্বি ছাড়া মাংস সব মিলিয়ে এই খাবারের স্বাদ অতুলনীয়। এই খাবারটিও দাদি পুরোটাই হোয়াটসঅ্যাপে শিখিয়েছেন আমাদের।

প্রতি সপ্তাহে শনিবার বিকেলে এক বছর জুড়ে আমরা ফোনে কথা বলেছি। এ বছরেই আমার হুট করে একদিন মনে হলো, আমাদের মাঝের চার হাজার মাইল গায়েব হয়ে গিয়েছে। আমার মনে হতো দাদি বোধহয় আমার রুমেই আছেন। যতগুলো বছর আমরা আলাদা থাকতাম সেটা আসলে ছিলই না। সবশেষে আমি আমাদের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে পেরেছি। প্রতি শনিবার, শত বছরের পুরনো ডজনখানেক গোপন রান্নার রেসিপি আমি শিখেছি। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম যেসব তথ্য হারিয়ে যেতে পারত, যে খাবার খেয়ে আমার পরিবার আনন্দে থাকত সেসবের রেসিপি আমি এখন জানি।

এই বছরের মার্চে, আমরা যা ভাবিনি তাই হলো। আমার দাদি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলেন। আমাদের কথা বন্ধ হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল আমি আর দাদির কণ্ঠ শুনতে পাব না। ঈশ্বরের কৃপায় তিনি বেঁচে গিয়েছেন। এরপর আবারও রান্না শুরু হলো। একবার মনে হচ্ছিল আমাদের রান্নার এই ধারা বোধহয় এখানেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু হয়নি। দাদির এখনো তার মায়ের রান্না মনে আছে। তিনি আরও সুস্থ হচ্ছেন। রান্নার সময় আমি যখন দাদির সুস্থ মুখ দেখি, তখন মনে হয় একমাত্র বোধহয় খাবারের পক্ষেই দুটি মহাদেশকে জুড়ে রাখা সম্ভব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত