করোনায় যারা চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন, তাদের জন্য কাজের ব্যবস্থা করা হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন প্রবাসীরা এতদিন অর্থ পাঠিয়ে দেশকে অনেক দিয়েছেন, এবার দেশ তাদের দেবে। তাদের প্রয়োজনে সম্ভব সব কিছু করা হবে। গতকাল বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে প্রবাসীদের প্রতি এই কৃতজ্ঞতা এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই দায়দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী।
সভা শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। বৈঠকে ‘প্রত্যাগত অভিবাসী কর্মীদের পুনঃএকত্রীকরণের লক্ষ্যে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান সৃজনে সহায়ক প্রকল্প’ শিরোনামে একটি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। একনেক চেয়ারপারসন হিসেবে এতে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে গণভবন থেকে অনলাইনে যুক্ত হন তিনি। সভা শেষে সাংবাদিকদের কাছে সভার সিদ্ধান্ত অবহিত করেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন নবনিযুক্ত পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম।
গতকাল অনুমোদন হওয়া প্রকল্পের আওতায় করোনায় বিদেশ থেকে ফেরত আসা দুই লাখ প্রবাসী বাংলাদেশিকে প্রশিক্ষণ শেষে জনপ্রতি ১৩ হাজার ৫০০ টাকা করে দেবে সরকার। বিদেশফেরত এই প্রবাসীদের পাশাপাশি তাদের চাকরির ব্যবস্থা করতে দেওয়া হবে প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণ চলাকালেই কর্মীরা এ সম্মানী পাবেন।
পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান জানান, একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘প্রবাসীরা দেশে অর্থ পাঠান। করোনার কারণে তাদের অনেকে চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। এতদিন তারা আমাদের দিয়েছেন। এবার আমরা তাদের দেব। যারা চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন, তাদের শোভন চাকরির ব্যবস্থা করা হবে।’
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রত্যাগত অভিবাসী কর্মীদের অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রকল্পটির সিংহভাগ অর্থ, অর্থাৎ ৪২৫ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। গত ২৩ মার্চ বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে এ-সংক্রান্ত চুক্তি সই হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড প্রকল্পটি ২০২৩ সালের ডিসেম্বর নাগাদ বাস্তবায়ন করবে।
প্রথম দফায় দুই লাখ কর্মীকে ৩২ জেলা থেকে বাছাই করা হবে। অভিবাসী-অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে বিবেচিত জেলাগুলো হলো ঢাকা, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, জামালপুর, রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পাবনা, বগুড়া, নওগাঁ, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, বরিশাল, পটুয়াখালী, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফেনী, নোয়াখালী, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, কুমিল্লা, সিলেট ও সুনামগঞ্জ।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন থেকে পাওয়া তথ্যমতে, গত বছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরে মোট ৪ লাখ ৮ হাজার ৪০৮ জন প্রবাসী বাংলাদেশি দেশে ফিরে এসেছেন। তাদের মধ্য থেকে দুই লাখ কর্মীকে বাছাই করা হবে তাদের আগ্রহ, পারিবারিক অবস্থা, আর্থিক অবস্থা ও প্রয়োজনীয়তার নিরিখে। কর্মী বাছাইয়ে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হবে। এর বাইরে আরও ২৩ হাজার ৫০০ কর্মীকে বাছাই করে তাদের সরকারের বিভিন্ন সংস্থা থেকে সনদ দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রীর অন্যান্য নির্দেশনা সম্পর্কে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, নতুন রাস্তা এবং সড়ক নির্মাণে ইউলুপ এবং আন্ডারপাসের ব্যবস্থা রাখতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী যাতে সড়ক ব্যবহারকারী ছাড়াও অন্যদের যাতায়াতে কোনো সমস্যা না হয়। এ ছাড়া সেতু এবং কালভার্ট নির্মাণে উচ্চতা যেন সঠিক থাকে। কারণ, পানি কখনো বাড়ে কখনো কমে। এতে নৌযান চলাচল যাতে কোনোভাবেই বিঘিœত না হয়। এ ব্যাপারে নৌপরিবহন এবং সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি কার্যকর সমন্বয়ের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর অন্যান্য নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে যেখানে-সেখানে বালুমহাল গড়ে না তোলা, এতে বাঁধ এবং নদী ভাঙনের বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে। নারীদের কম্পিউটার শিক্ষাকে প্রকল্পের মধ্যে আটকে না রেখে রাজস্ব খাতে নেওয়ারও নির্দেশ দেন তিনি।
বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘ব্রিজের উচ্চতা সঠিক রাখতে হবে। এটি বলার কারণ হচ্ছে, বসিলা ব্রিজ। এখন হয়তো সেটি ভেঙে ফেলতে হবে।’
ড. শামসুল আলম বলেন, ‘দেশের দক্ষিণাঞ্চলে আয়রন ব্রিজ পুনর্নির্মাণ বা পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় জরাজীর্ণ ৮০৫টি লোহার ব্রিজ ভেঙে সেখানে আরসিসি বা পিসি গার্ডার সেতু নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া ১ হাজার ২৪৪টি লোহার ব্রিজ পুনর্নির্মাণ বা পুনর্বাসন করা হবে।’
একনেকে ১০ প্রকল্প পাস : বৈঠকে মোট ১০টি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। এসব প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়ে ২ হাজার ৫৭৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ২ হাজার ১৫০ কোটি ৪২ লাখ, বাকি ৪২৫ কোটি টাকা বিদেশিক ঋণ। একনেকে উপস্থাপিত প্রকল্পগুলো হলো ৫৮৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম জাতীয় মহাসড়কে তিনটি আন্ডারপাস ও পদুয়ারবাজার ইন্টারসেকশনে ইউলুপ নির্মাণ’ প্রকল্প, ১১১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘জেলা মহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ (ময়মনসিংহ জোন)’ প্রথম সংশোধিত প্রকল্প, ১৪৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘ক্যানবেরায় বাংলাদেশ চ্যান্সারি ভবন নির্মাণ’ প্রকল্প।
এ ছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ১৭৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘ইনস্টিটিউট অব টিস্যু ব্যাংকিং অ্যান্ড বায়োমেটেরিয়াল রিসার্চের সেবা ও গবেষণা সুবিধাদির আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ’ প্রকল্প, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ৩১ কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘জেলাভিত্তিক মহিলা কম্পিউটার প্রশিক্ষণ (৬৪ জেলা)’ তৃতীয় সংশোধিত প্রকল্প, ৭২ কোটি ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণাঙ্গ শিশু কার্ডিওলজি ও শিশু কার্ডিয়াক সার্জারি ইউনিট স্থাপন’ প্রকল্প, ৪৯৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘দেশের দক্ষিণাঞ্চলে আয়রন ব্রিজ পুনর্নির্মাণ বা পুনর্বাসন’ প্রথম সংশোধন প্রকল্প, ৪৪৬ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘পদ্মা বহুমুখী সেতুর ভাটিতে মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলাধীন বিভিন্ন স্থানে পদ্মা নদীর বাম তীর সংরক্ষণ’ প্রকল্প, ৪২৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ‘প্রত্যাগত অভিবাসী কর্মীদের পুনঃএকত্রীকরণের লক্ষ্যে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান সৃজনে সহায়ক’ প্রকল্প ও ৯৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের ‘বিসিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পনগরী, ঠাকুরগাঁও’ প্রকল্প।
