মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের মাধবপুরের লঙ্গুরপার গ্রামের সোহেল আহমেদ। তিনি যখন খুব ছোট তখন হঠাৎ একদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে নিখোঁজ হন তার বাবা মানিক মিয়া। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও আর সন্ধান মেলেনি তার। পরে সোহেল বড় হয়ে সংসারের হাল ধরেছেন। মা-ছেলের সংসার ভালোই চলছিল। এখন ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন সোহেল। আর একা মা থাকেন গ্রামের বাড়িতে। গত শনিবার বাড়ি থেকে ফোন আসে মা হাজেরা বিবিকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। খবর শুনেই দিশেহারা হয়ে পড়েন সোহেল। কঠোর লকডাউনের কারণে বন্ধ গাড়িঘোড়া, বাড়ি যাবেন কেমনে তিনি? হঠাৎই তার মাথায় আসে একমাত্র বাইসাইকেলের কথা। আর কিছু না ভেবে সাইকেল নিয়ে নেমে পড়েন রাস্তায়। টানা ১৪ ঘণ্টা সাইকেল চালিয়ে ২৩০ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছান বাড়িতে। তবে এখনো মাকে খুঁজে পাননি তিনি।
জানা যায়, কমলগঞ্জের মাধবপুর ইউনিয়নের লঙ্গুরপার গ্রামের মানিক মিয়ার স্ত্রী হাজেরা বিবি মাধবপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি আসিদ আলীর ছোট বোন। গত বুধবার বড় ভাই আসিদ আলীর বাড়ি থেকে রাতের খাবার খেয়ে হাজেরা বিবি প্রতিবেশী রকিব মিয়ার বাড়িতেই রাতে থাকেন। বৃহস্পতিবার ভোরে ঘুম থেকে উঠে রকিব মিয়ার স্ত্রীকে চা বানাতে বলে ঘর থেকে বেরিয়ে যান। রকিব মিয়ার স্ত্রী চা তৈরি করে বসে থাকেন হাজেরা বিবির জন্য। কিন্তু তিনি আর ফেরেননি। সেই থেকে তিনি এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
নিখোঁজ হাজেরার বড় ভাই আসিদ আলী বলেন, ‘নিখোঁজের খবর শুনে বোনের বাড়িতে গিয়ে দেখি দরজা তালাবদ্ধ, বাইরের বাতি জ্বলছে। গোয়ালঘরেও গাভীগুলো ডাকাডাকি করছে। তখন আশপাশ এলাকার বাড়িঘরগুলোতে খুঁজতে শুরু করলে প্রতিবেশী রকিব মিয়ার স্ত্রী হাজেরার নিখোঁজের বিস্তারিত বলেন। পরে সম্ভাব্য সব আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে খোঁজ নিয়েও কোনো সন্ধান না পেয়ে গত শুক্রবার রাতে কমলগঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছি।’
তিনি জানান, ‘শনিবার ফোনে ঘটনাটি ঢাকায় অবস্থান করা ভাগিনা সোহেল আহমেদকে জানান। সোহেল মায়ের নিখোঁজের খবর শুনে করোনার কারণে কঠোর লকডাউনে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় নিজেই বাইসাইকেল চালিয়ে ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে ১৪ ঘণ্টা পর কমলগঞ্জের লঙ্গুরপারস্থ গ্রামের বাড়িতে এসে পৌঁছান।’
স্থানীয়রা জানান, সোহেল বাড়ি পৌঁছেই লোকজন নিয়ে রবিবার সারা দিন বাড়ির আশপাশের প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকার ডোবা, পুকুরসহ সব আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে খোঁজ করেও মা হাজেরা বিবির কোনো সন্ধান পাননি।
সোহেল বলেন, প্রায় ২০-২৫ বছর আগেও একইভাবে তার বাবা মানিক মিয়াও নিখোঁজ হয়েছিলেন। তারও কোনো সন্ধান এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, ‘বাবার পর মাও হুট করে নিখোঁজ। খবর পেয়ে লকডাউনের মধ্যে কীভাবে বাড়ি আসব তা চিন্তা করছিলাম। শেষে নিজেই বাইসাইকেল চালিয়ে ঢাকা থেকে বাড়ি এসেছি।’
কমলগঞ্জ থানার ওসি ইয়ারদৌস হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিখোঁজ নারীর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’
