দূতাবাসে ধর্ষণের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২১, ১০:০২ পিএম

মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে এশিয়ার অন্য দেশগুলোর প্রবাসী শ্রমবাজারে একসময় কেবল দেশের পুরুষ শ্রমিকরাই যেতেন। বিগত দশকে এই চিত্র পাল্টে যেতে শুরু করে। সবশেষ বছরগুলোতে সৌদি আরবসহ অন্যান্য দেশে নারী শ্রমিকদের প্রবেশের সুযোগ বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমবাজারে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করে। বিশেষত সৌদি আরবে বিপুল সংখ্যক নারী শ্রমিকের কর্মসংস্থান অন্যান্য দেশেও নারী শ্রমিকদের অভিবাসনে উৎসাহ জোগায়। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে সৌদি আরবে নারী শ্রমিকদের নানারকম নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী শ্রমিকের আত্মহত্যা ও রহস্যজনক মৃত্যুর খবরে এ নিয়ে নানারকম নেতিবাচক ধারণাও তৈরি হয়। এমনকি বিদেশে নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধের দাবিও ওঠে। একইসঙ্গে অভিযোগ ওঠে যে, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো অভিবাসী নারী শ্রমিকদের সুরক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হচ্ছে। আশা করা হয়েছিল মন্ত্রণালয় এবং দূতাবাসগুলো এই বাস্তবতা আমলে নিয়ে দায়িত্ব পালনে আরও তৎপর হবে।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই এখন নারী শ্রমিকদের ধর্ষণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। যে দূতাবাস বিদেশের মাটিতে দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক, বিদেশ-বিভুঁইয়ে এক টুকরো বাংলাদেশ সেখানেই নারী শ্রমিকরা সম্ভ্রম হারিয়ে দেশে ফিরছেন। বুধবার দেশ রূপান্তরে ‘পবিত্র ভূমিতে পাপাচার’ শিরোনামের প্রতিবেদনে সৌদি আরবের রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের সেইফ হোমে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগ তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, একজন বা দুজন নয়, ৯ জন নারী দূতাবাসের একই কর্মকর্তার কাছে যৌননিগ্রহের শিকার হওয়ার কথা এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত দলের কাছে তুলে ধরেছেন। তবে, তাদের বাইরেও আরও নারী শ্রমিক থাকতে পারেন, যারা ওই কর্মকর্তার যৌন নিপীড়ন থেকে রেহাই পাননি। মো. মেহেদী হাসান নামে প্রশাসন ক্যাডারের এই কর্মকর্তা বর্তমানে উপসচিব। তিনি সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসে কাউন্সিলর (শ্রম) পদে নিয়োগ পান ২০১৯ সালের ২৪ জানুয়ারি। নির্মম পরিহাস হলো, ‘লেবার কাউন্সিলর’ হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তাই দূতাবাসের সেইফ হোম তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব ছিলেন।

দূতাবাসের তদন্ত দলের বরাতে প্রতিবেদনটিতে অভিযুক্ত উপসচিব মো. মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের যে বিশদ বিবরণ উঠে এসেছে তা ভয়াবহ। দেখা যাচ্ছে সেইফ হোমের এই তত্ত্বাবধায়ক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য বিকেল ৫টার পর আশ্রয়ের সন্ধানে যাওয়া নারীদের ডেকে পাঠাতেন। নিজের কক্ষে ডেকে নিয়ে কমবয়সী শ্রমিকদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টায় নানা প্রতারণা ও কূটকৌশলের ফাঁদ পাততেন। তাতে সফল না হলে বলপ্রয়োগ করতেন। যৌনলিপ্সা চরিতার্থ করার জন্য তিনি অপ্রয়োজনীয় সাক্ষাৎকার প্রথা চালু করে সেইফ হোমেই এসব করতেন। একমাত্র তার অনুমতি ছাড়া কোনো গৃহকর্মী বাংলাদেশে ফিরতে পারবে না এ ধারণার জন্ম দিয়ে নারী শ্রমিকদের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করতেন। কিন্তু সম্প্রতি এক নারী গৃহকর্মীর সাহসে এই উপসচিবের যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের কাহিনী ফাঁস হয়ে যায়। অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই রাতেই রাষ্ট্রদূত ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারীর কড়া নির্দেশে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন তদন্তকারীরা। নিপীড়নের শিকার অন্য নারীদের জবানবন্দিও নেন তারা। এরপর সেইফ হোমে আশ্রিত আরও পাঁচ নারী শ্রমিক স্বপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত কমিটির কাছে নিজেদের নিপীড়িত হওয়ার সাক্ষ্য দেন।  

পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর উপসচিব মো. মেহেদী হাসানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং বিভাগীয় মামলা চালু করে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ১৯৮৫ সালের সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা অনুযায়ী, মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগই গুরুতর। মেহেদীর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগই প্রমাণিত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে গুরুদণ্ড আরোপেরও সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। উল্লেখ্য, সরকারের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ উঠলে এই ‘বিভাগীয় মামলা’ দায়ের ও তদন্ত করা হয়ে থাকে। কিন্তু অপরাধ ফৌজদারি হলেও কর্তৃপক্ষ ফৌজদারি মামলা করে না। উপরন্তু সংক্ষুব্ধ কোনো পক্ষ কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করলেও চার্জশিট বা অভিযোপত্র গঠন না হওয়া পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করতে হলে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতির প্রয়োজন হয়। অপরাধ করা সত্ত্বেও সরকারি কর্মকর্তাদের এমন দায়মুক্তির সুযোগ বন্ধ করার জন্য দীর্ঘদিন ধরেই দাবি রয়েছে। কিন্তু সেটি বাস্তবায়িত হয়নি। উপরন্তু অবসরকালে সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা হলে পেনশন সুবিধা বন্ধের যে বিধান রয়েছে সেটা রদ করে পেনশন সুবিধা বহাল রাখার দাবি প্রস্তাব করা হয়েছিল মন্ত্রিপরিষদের কাছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এই প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে পেনশন সুবিধা কেড়ে নেওয়ার বিধান বহাল রাখা হয়। এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে এখন আরও এগিয়ে গিয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করার এবং অপরাধ প্রমাণ হলে গ্রেপ্তার ও বিচারের সব বাধা দূর করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত