সৌরবিদ্যুতের একটি ‘আইকনিক’ প্রকল্পের নামকরণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে করার প্রস্তাব করেছিলেন আমলারা। তবে সেই প্রস্তাব নাকচ করে নিজের নামটি কেটে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন শেখ হাসিনা। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এ ঘটনা ঘটেছে। সভা-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান সাংবাদিকদের তা জানিয়েছেন। এর আগে পদ্মা সেতু প্রকল্পটি তার নামে করার প্রস্তাবে অসম্মতি জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী।
পরিকল্পনামন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে জামালপুরের মাদারগঞ্জে ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব তোলা হয়। তখন প্রধানমন্ত্রী এই প্রকল্প থেকে নিজের নাম কেটে দেওয়ার নির্দেশ দেন।
বৈঠকে উপস্থিত সব সচিবই প্রধানমন্ত্রীর নামে ‘সোলার পার্ক’ করার প্রস্তাব করেছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সবার বক্তব্য ছিল, এই সোলার পার্ক দেশের সবচেয়ে বড়। তাছাড়া এটি আইকনিক প্রকল্প। সেজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে হওয়া উচিত। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দেন, নিজের নাম বাদ দিতে। পরে তিনি এর নাম দেন সোলার পার্ক, জামালপুর।’
সভায় ১ হাজার ৫১১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ব্যয়ে জামালপুরের মাদারগঞ্জ ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পটি বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্পটি চলতি বছর সেপ্টেম্বর থেকে আগস্ট ২০২৪ সালে বাস্তবায়ন করা হবে।
লোকসানি প্রতিষ্ঠান টেলিটককে আবারও বড় বিনিয়োগ : লোকসানের বৃত্তে আটকে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল ফোন অপারেটর টেলিটকের নেটওয়ার্কের আধুনিকায়নে ২ হাজার ২০৪ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে সরকার। এর মধ্যে সরকার দেবে ২ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা। বাকি ৬০ কোটি টাকা টেলিটক নিজে বহন করবে।
একনেক বৈঠকে ‘গ্রাম পর্যায়ে টেলিটকের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও ৫জি সেবা প্রদানে নেটওয়ার্কের আধুনিকায়ন প্রকল্পটির অনুমোদন করা হয়। ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ১৭ বছরে টেলিটক এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি লোকসান গুনেছে। আর গত চার বছরেই তাদের লোকসান হয়েছে ৯৯৩ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির আয়-ব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠার পর থেকে শুধু দুই অর্থবছরেই প্রতিষ্ঠানটি লাভের মুখ দেখেছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে ১১ কোটি ও ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৪৬ কোটি টাকা মুনাফা করে টেলিটক।
লোকসানে থাকার পরও টেলিটকের নতুন প্রকল্পের বিষয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম বলেন, ‘একটা প্রসঙ্গ আসছে প্রায়ই টেলিটকে লোকসান হয় তারপরও দেওয়া হচ্ছে কেন? কল্যাণমুখী সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার স্টেটের দিকে লক্ষ্য রেখে আমাদের নীতি প্রণীত হয়। ব্যক্তি খাতকে আমরা সহায়তা করব, সুযোগ দেব। কিন্তু সরকার একদম সবকিছু ছেড়ে দেবে না।’
জনকল্যাণে লস হওয়া সত্ত্বেও বিআরটিসি বাস চালানো হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মানুষের কথা চিন্তা করে বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সবসময় লস মুখ্য থাকে না।’
১০ প্রকল্প অনুমোদন : একনেক সভায় ৭ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকার ১০টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে ৮৬১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘জরাজীর্ণ, অপ্রশস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বিদ্যমান বেইলি ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ সেতু প্রতিস্থাপন প্রকল্প (রংপুর জোন)’। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর।
‘বাগেরহাট-রামপাল-মোংলা জেলা মহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৬৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। প্রকল্পটি চলতি বছর জুলাই থেকে জুন-২০২৪ সালে বাস্তবায়ন করবে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। এছাড়া ‘ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক উন্নয়ন’ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৯০ কোটি টাকা। প্রকল্পটি চলতি বছর এপ্রিল থেকে মার্চ-২০২৬ সালে বাস্তবায়ন করবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। ‘চর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট প্রজেক্ট-ব্রিজিং (অতিরিক্ত অর্থায়ন, এলজিইডি অংশ)’ প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১০৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর।
অন্যদিকে ‘দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে মুক্তিযুদ্ধের অডিও ভিজুয়াল দলিল সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এবং বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের সক্ষমতা বৃদ্ধি’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৬২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের ‘পল্লী জীবিকায়ন প্রকল্প-৩য় পর্যায়’ প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৯২৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। চলতি বছর জুলাই থেকে জুন-২০২৫ সালে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি)। ৬৯২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ব্যয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বাস্তবায়ন করবে ‘কুড়িগ্রাম জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত দুধকুমার নদী ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন’ প্রকল্প। উপকূলীয় চরাঞ্চলে সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন নামের সংশোধিত প্রকল্পটির মূল ব্যয় ছিল ৯৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এবার আরও ৫৯ কোটি ৯ লাখ টাকা বাড়ানো হয়েছে প্রকল্পটির ব্যয়। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে শুরু হয়ে এটি শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২১ সালে। তবে সংশোধিত প্রকল্পে তা জুন ২০২৩ সাল পর্যন্ত করা হয়েছে।
