হিল্লা বিয়েতে রাজি না হওয়ায় দম্পতিকে এক ঘরে করে রেখেছে সমাজপতিরা

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২১, ১২:০৫ এএম

ঝগড়ার একপর্যায়ে স্বামী তার স্ত্রীকে ‘তিন তালাক’ দিয়েছিলেন। পরে ভুল বুঝতে পেরে অন্যত্র কাজী অফিসে গিয়ে আবার বিয়ে করেন তারা। তবে এতে নারাজ সমাজপতিরা। তারা দাবি করছেন ‘হিল্লা বিয়ের’। তা নামা মানায় এক ঘরে করে রাখা হয়েছে ওই দম্পতিকে। তাদের ভাই, ছেলেসহ আত্মীয়-স্বজন কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হচ্ছে না।

সমাজপতিরা বলছেন, ইসলামি শরিয়ত মোতাবেক হিল্লা বিয়ে দিয়ে পরে তাদের সংসার করতে হবে।

চাঞ্চল্যকর এ ঘটনাটি ঘটেছে, পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার সুন্দরদিঘী ইউনিয়নে।

এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই দম্পতি প্রায় ৩৫ বছর ধরে সংসার করে আসছেন। তাদের চার সন্তানসহ নাতিপুতিও আছে। দরিদ্র ওই পরিবারের টানাটানির সংসার। দুই-তিন মাস আগে ওই দম্পতি ঝগড়া-বিবাদের একপর্যায়ে রাগের বশে একে অপরকে তিন তালাক দিয়েছিলেন। বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয় জামে মসজিদের সভাপতি নাসিরউদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক মোমিনুর ইসলাম, শাহজাহান আলী, ঈমান আলী, হাফেজ মোস্তফা কামাল, জুলহাস, গফুর আজাদ, সুরমান মেম্বার, আমির চাঁদ, আব্দুর রশিদ, দেলোয়ার হোসেনসহ কয়েকজন সমাজপতি বৈঠক করেন। বৈঠকে সমাজপতিরা অন্য গ্রামের একজন মুফতি আনোয়ার হোসাইন, হাফেজ মোস্তফা জমিরনকে হিল্লা বিয়ে দেওয়ার পর আবার বিয়ে করে সংসার করার ফতোয়া দেন।

তারা সিদ্ধান্ত দেন, হিল্লা বিয়ের আগে ওই দম্পতি আর এক জায়গায় সংসার এবং বসবাস করতে পারবে না। তাদের সমাজচ্যুত করা হোক।

জানা যায়, সমাজপতিদের সিদ্ধান্ত না মেনে ওই দম্পতি দিনাজপুর জেলার খানসামা উপজেলায় জনৈক মাওলানার বাসায় গিয়ে বিয়ে করে সংসার শুরু করেন। এর পর সমাজপতিরা ক্ষুব্ধ হন। ছলিমনগর জামে মসজিদ সমাজের সব সদস্যদের তাদের সঙ্গে কথা বলা, বাড়িতে যাতায়াত, কোনো জিনিসপত্র আদান-প্রদান, হাটবাজার সবকিছুতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। বর্তমানে ওই দম্পতি সমাজের কারো সঙ্গে চলতে-ফিরতে পারছেন না। গ্রামের কোনো দোকান ওই দম্পতির কাছে পণ্য বিক্রি করছে না। তাদের কোথাও কোনো কাজেও নেয়া হচ্ছে না। সমাজপতিদের চাপে দীর্ঘ দুই মাস ধরে তারা এক ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

এলাকাবাসী জানান, সমাজপতিরা ওই দম্পতির সঙ্গে তার ভাই, ছেলে, পরিবারের অন্য সদস্য এবং আত্মীয়দেরও দেখা করা, কথা বলা নিষেধ করে দিয়েছে। যোগাযোগ করা হলে তাদেরও একঘরে করা হবে এবং ৫০০ টাকা জরিমানা করা হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়েছে।

এ ঘটনার প্রেক্ষিতে সমাজপতিদের স্বাভাবিক জীবন বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ এনে ভুক্তভোগী নারী সোমবার (৯ আগস্ট) দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর ১০ সমাজপতির নামে লিখিত অভিযোগ করেন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য লক্ষণ চন্দ্র রায় জানান, ওই দম্পতির সংসারে ঝগড়া হয়েছিল। দুই-তিন মাস আগে তারা একে-অপরকে তালাক দিয়েছিল বলে আমি শুনেছি। তাদের এক ঘরে (বয়কট) করে রাখা হয়েছে। আমি স্থানীয়ভাবে জামে মসজিদ সমাজের নাসিরউদ্দিন, মোমিনুর রহমান, ঈমান আলী, গফুর আজাদ, আমির চাঁদ, শাহজাহান, আব্দুর রশিদ, দেলোয়ার হোসেনসহ কয়েকজন সমাজপতিদের নিয়ে বসেছিলাম। কিন্তু ইসলামি আইন-কানুনের কথা বলে তারা হিল্লা বিয়ে দিতে ইচ্ছুক। আমার কথায় তারা বিষয়টি সমাধান করেননি। পরে আমি আর এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারিনি।  

ছলিমনগর জামে মসজিদের সভাপতি নাসিরউদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক মোমিনুর ইসলাম জানান, মসজিদে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সমাজের লোকজনদের উপস্থিতিতে মুফতি আনোয়ার হোসাইন, হাফেজ মোস্তফা কামাল ওই দম্পতিকে সমাজ থেকে বয়কট করেন। সমাজের লোকজনদের সঙ্গে চলাচলে নিষেধাজ্ঞার ফতোয়া দেন।

তিনি বলেন, ‘বৈঠকে মুফতি আনোয়ার হোসাইন ও হাফেজ মোস্তফা কামাল ছিলেন। যেহেতু তারা মুখ থেকে ‘বাইন তালাকের’ কথা বলেছে তার মানে তালাক হয়ে গেছে। ওর (স্ত্রীর) হিল্লা বিয়ে দিতে হবে। এর আগে ওর চেহারাও দেখা যাবে না। ওকে বাড়ি থেকে বাইর করে দিতে হবে। সমাজচ্যুত করতে হবে। সমাজের কোনো লোকজন তাদের সঙ্গে ওঠাবসা করতে পারবে না’।

ভুক্তভোগী দম্পতির বড় ছেলে জানান, আমার বাবা-মায়ের তালাকের বিষয়টিতে মসজিদের সমাজপতিরা একাধিকবার বৈঠক করেছেন। সর্বশেষ বৈঠকে সমাজপতিরা আমার বাবা-মাকে আলাদা করে। মা আমার বাসায় ছিল। বাবা-মায়ের সঙ্গে আমাদের কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেয়নি। যোগাযোগ করলে আমাদেরও এক ঘরে করে রাখা হবে এবং ৫০০ টাকা জরিমানা করা হবে বলে সিদ্ধান্ত দেন। আমার বাবা-মা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে মাওলানার বাসায় গিয়ে আবারও বিয়ে করেছে। তারপরও সমাজপতিরা আমাদের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে। তারা আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন দুরূহ করে ফেলেছে।

দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. প্রত্যয় হাসান লিখিত অভিযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, স্থানীয়ভাবে উভয় পক্ষের সঙ্গে বসে মীমাংসার জন্য স্থানীয় চেয়ারম্যানকে বলা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। আমি নিজেও সেখানে উপস্থিত থাকব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত