শিক্ষার্থীদের ‘বিকল্প শিক্ষাপদ্ধতি’ উদ্ভাবনের নামে জালিয়াতি

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২১, ০৫:২৯ এএম

মিথ্যা তথ্য দিয়ে দেশসেরা উদ্ভাবকের পুরস্কার হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাসুদুল হাসানের বিরুদ্ধে। করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের মধ্যে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে মেমোরি কার্ডের মাধ্যমে বিশেষ পদ্ধতিতে পাঠদানের কথা বলে তিনি সেরা উদ্ভাবকের পুরস্কার অর্জন করলেও উপজেলার বেশিরভাগ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সেই পদ্ধতি এখনো চালুই হয়নি। এমনকি কোনো শিক্ষার্থীকে মেমোরি কার্ড পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে শিক্ষা কর্মকর্তা মাসুদুল হাসান বলেছেন, একটি মহল ঈর্ষান্বিত হয়ে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, সম্প্রতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ইনোভেশন শোকেসিং-এ দেশসেরা উদ্ভাবক-২০২১ নির্বাচিত হন হাকিমপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মাসুদুল হাসান। এ বছর সারা দেশ থেকে ৩ জন শিক্ষা কর্মকর্তা ও ২ জন সহকারী শিক্ষককে দেশসেরা উদ্ভাবক নির্বাচিত করা হয়, তাদের মধ্যে একজন মাসুদুল। করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের মধ্যেও কীভাবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম পৌঁছে দেওয়া যায় তার কথিত পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন তিনি। কথিত ওই পাঠ পরিকল্পনা অনুযায়ী দক্ষ শিক্ষকদের পাঠদানের অডিও ও ভিডিও চিত্র (কম দামি সহজলভ্য মোবাইল উপযোগী) রেকর্ড করে বিদ্যালয়ের ল্যাপটপের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংখ্যক মেমোরি কার্ডে কপি করে প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের প্রদান করে করোনাকালীন পাঠদান কার্যক্রম চালু রাখার কথা।

হাকিমপুর উপজেলায় ৪৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। শিক্ষা কর্মকর্তা মাসুদুল হাসান তার ‘উদ্ভাবিত’ ‘বিশেষ পদ্ধতিতে’ উপজেলার ৯৫ ভাগ প্রাথমিক শিক্ষার্থীকে মেমোরি কার্ডের মাধ্যমে পাঠদানের আওতায় আনা হয়েছে দাবি করে পরিকল্পনা পাঠিয়েছিলেন মন্ত্রণালয়ে। পরে সেই আইডিয়া দেশসেরা উদ্ভাবনের পুরস্কার অর্জন করে। যদিও সরেজমিন উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয় পরিদর্শন করে এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে এর সত্যতা পাওয়া যায়নি।

বাংলাহিলি ২ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থী দেশ রূপান্তরকে বলে, ‘আমাকে স্কুল থেকে কোনো মেমোরি কার্ড দেওয়া হয়নি, তবে আমাকে মেমোরি কার্ড কিনে নেওয়ার জন্য স্কুল থেকে বলেছিল। সে মোতাবেক আমি মেমোরি কার্ড কিনে স্কুলে জমা দিয়েছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ক্লাসের ভিডিও বা কোনোকিছুই আমাকে দেয়নি। শুধুমাত্র স্কুল থেকে ওয়ার্কশিট দেয়, সেগুলো পূরণ করে আবার স্কুলে জমা দিয়েছি।’

বাংলাহিলি ১ নম্বর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘করোনার কারণে দীর্ঘদিন ধরে আমাদের স্কুল বন্ধ রয়েছে, আমরা কেউ স্কুলে যেতে পারছি না, ক্লাস হচ্ছে না অনেক দিন ধরে। তবে কিছুদিন আগে স্কুল থেকে বাড়ির কাজ দিচ্ছে, সেগুলো আমরা বাড়িতে পড়ে কমপ্লিট করে দিচ্ছি। আর অনলাইনে ক্লাস শুরু হয়েছে, কিন্তু আমাদের বড় ফোন (অনলাইনে ক্লাস করার উপযুক্ত উচ্চ রেজুলেশনযুক্ত) না থাকার কারণে সেই ক্লাসে জয়েন করতে পারছি না।’

আর স্কুল থেকে মেমোরি কার্ড দেওয়া হয়েছে কি না বা সেই মেমোরি কার্ড দিয়ে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পড়ালেখা সচল রয়েছে কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘স্কুল থেকে এখন পর্যন্ত আমাকে কোনো মেমোরি কার্ড দেয়নি বা মেমোরি কার্ডের মাধ্যমে কোনো পড়াও দেয়নি।’

উপজেলা সদরের ওই দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো একই চিত্র অনান্য বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে টুব্বি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজিজার রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়ে মেমোরি কার্ডের মাধ্যমে এখনো পাঠদান শুরু হয়নি, আমরা এখন পর্যন্ত কোনো শিক্ষার্থীকে মেমোরি কার্ড দিতে পারিনি। আমরা মেমোরি কার্ডের জন্য বলেছি, এখনো ঢাকা থেকে সেটি আসেনি। আমরা মেমোরি কার্ড কেনার জন্য বায়না দিয়েছি, আসবে।’

প্রায় একই ধরনের তথ্য দিয়ে খাট্টাউছনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইয়েদা সুলতানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা এখনো বিদ্যালয়ের কোনো ছাত্র-ছাত্রীকে মেমোরি কার্ড দিতে পারিনি। তাদের হাতে মেমোরি কার্ড তুলে দেওয়ার পরে তারপরে ওই পদ্ধতিতে আমরা পাঠদান শুরু করব। এখন আমরা শুধুমাত্র বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রতি শনিবার করে ছাত্র-ছাত্রীদের ওয়ার্কশিট দিয়ে আসছি, আবার সেগুলো পূরণ করলে নিয়ে আসছি।’

শিক্ষা কর্মকর্তা মাসুদুল হাসান ‘উদ্ভাবিত’ কথিত ওই শিক্ষা পদ্ধতি বাস্তবে প্রয়োগ করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন কোনো কোনো শিক্ষক। উপজেলার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসলে মেমোরি কার্ডের মাধ্যমে এই পাঠদান পদ্ধতি কখনোই করা সম্ভব না। যেখানে অনলাইনের মাধ্যমে ক্লাস হলে বিদ্যালয়ের মাত্র গুটিকয়েক ছাত্র-ছাত্রী উপস্থিত হয়। সেই অনলাইনের ক্লাসগুলো মেমোরি কার্ডের মাধ্যমে বিতরণ করে শিক্ষাদান আসলে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমরা বিদ্যালয় থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে যে ওয়ার্কশিট দিয়ে আসছি সেটির মাধ্যমেই তাদের অন্তত পড়ালেখার চর্চা ধরে রাখা যাচ্ছে। আর যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের অনলাইন ক্লাসে উপস্থিতি বাড়ানো যাচ্ছে না, সেখানে এত ছোট ছেলে-মেয়েদের মেমোরি কার্ডের মাধ্যমে কীভাবে পড়ালেখা চালানো সম্ভব?’

শিক্ষা কর্মকর্তা ‘উদ্ভাবিত’ কথিত পদ্ধতির মাধ্যমে পাঠদানের বিষয়ে জানতে চাইলে ইটাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমার বিদ্যালয়ের কোনো ছাত্র-ছাত্রী মেমোরি কার্ড পায়নি। আমি যতটুকু জানতে পেরেছি সিøপের (চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় স্কুল লেভেল ইমপ্রুভমেন্ট প্ল্যান) বরাদ্দের টাকা দিয়ে নাকি মেমোরি কার্ড কেনা হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমার বিদ্যালয়ে মেমোরি কার্ডের মাধ্যমে শিক্ষাদানের এই বিষয়টি আমার জানা নেই।’

শিক্ষা কর্মকর্তা ‘উদ্ভাবিত’ কথিত পদ্ধতির মাধ্যমে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের পাঠদান সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সাতকুড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি রতন ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হিলির প্রত্যেকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নাকি মেমোরি কার্ডের মাধ্যমে পড়ালেখা শুরু হয়েছে, যা পরিচালনা করছে শিক্ষা অফিস। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমাদের এলাকাতে এই পদ্ধতিতে পড়ালেখা কোথাও শুরু হয়নি। আর এই পদ্ধতিতে পাঠদান সম্ভব না, কারণ যেখানে টিভিতে অনলাইন ক্লাসগুলো হচ্ছে সেখানেই শিক্ষার্থীরা অ্যাকটিভ নয়। সেখানে একটা মেমোরি কার্ড দিয়ে বাচ্চাদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে সেটির মাধ্যমে কীভাবে পাঠদান সম্ভব হবে তা আমার বোধগম্য না।’

মিথ্যা তথ্য দিয়ে দেশসেরা উদ্ভাবকের পুরস্কার হাতানোর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হাকিমপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাসুদুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা। করোনাকালে প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে বেশকিছু কাজ করেছি, যা নিয়ে অনেক ভালো রিপোর্ট হয়েছে, পুরস্কার পেয়েছি। এতেই হয়তো-বা অনেকের গায়ে জ্বালা ধরেছে।’

শিক্ষা কর্মকর্তা মাসুদুল ‘উদ্ভাবিত’ কথিত পদ্ধতির মাধ্যমে হাকিমপুরে পাঠদান চলছে কি না তা জানা নেই জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা স্বপন কুমার রায় চৌধুরীর। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনাকালীন শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে মেমোরি কার্ডের মাধ্যমে পাঠদানের পদ্ধতি চালু করায় ওই পুরস্কার দেওয়া হয়। তবে তিনি (মাসুদুল) এই কার্যক্রম চালু করেছেন কি না বা কতটুকু করেছেন সেটি জানা নেই। আর এই পুরস্কার মহাপরিচালকের কার্যালয় থেকে দেওয়া হয়েছে, এর বেশি কিছু আমি জানি না। এখন আপনারা যা দেখতে পেয়েছেন, সেটি আপনারা লেখেন।’

এ প্রসঙ্গে হাকিমপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা শিক্ষা কমিটির সভাপতি হারুন উর রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। আমরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত