আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত আশরাফ ঘানি সরকারের পতনের পর সাধারণ জনগণের ভেতর শুরু হয়েছে তীব্র অনিরাপত্তা বোধ। অবস্থা এতটাই চরমে যে, কাবুল বিমানবন্দরে কয়েক হাজার মানুষ ভিড় করেছেন দেশ ছাড়ার জন্য। অথচ অধিকাংশ ফ্লাইটই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বিমানবন্দরের। শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো সদস্যভুক্ত দেশগুলোর জরুরি ফ্লাইটগুলো চালু আছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার গত শনিবার এক বিবৃতিতে বলেছিল, তারা আফগানিস্তান থেকে ৩০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেবে। কিন্তু গতকাল সোমবার কাবুল বিমানবন্দরের যে চিত্র দেখা গেছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্র সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারবে না, উল্টো মানবিক বিপর্যয়ের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
বেপরোয়া আফগানরা কাবুল বিমানবন্দরের বেষ্টনী ও দেয়াল টপকে ভেতরে প্রবেশ করছে। নিরাপত্তা বাহিনী হিমশিম খাচ্ছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে। আফগানিস্তানের বিভিন্ন সীমান্ত ক্রসিংয়ের নিয়ন্ত্রণ তালেবানের হাতে থাকা ও সীমান্তের ওপর অন্য দেশ কর্র্তৃক বন্ধ করে দেওয়ার ফলে দেশ ছাড়ার একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে কাবুল বিমানবন্দর। রবিবার দুপুর থেকেই মানুষ এখানে জড়ো হতে শুরু করে। সোমবার সেই ভিড় জনসমুদ্রে পরিণত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক বিমান টেক অফের সময় রানওয়েতে সেটি ঘিরে ধরে তারা। বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকায় বিমানবন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয় যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী। তাদের গুলিতে অন্তত পাঁচজন নিহতের খবর পাওয়া গেছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মানুষ দেশ ছাড়তে এতই বেপরোয়া যে, সুযোগ কমে আসার কারণে অনেকেই বিমানবন্দরে কান্নায় ভেঙে পড়ছে। অন্য একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, টেক অফের পর উড়ন্ত একটি বিমান থেকে তিন ব্যক্তি ছিটকে পড়ছে। কাবুল বিমানবন্দরে অবস্থান করা এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমি এখানে খুব ভয়ের মধ্যে রয়েছি। তারা (মার্কিন সেনা) অনেক ফাঁকা গুলি চালিয়েছে।’
এদিকে যারা আফগানিস্তান ছেড়ে যেতে চায়, তাদের বাধা না দিতে তালেবানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ ৬৫টি দেশ। দেশত্যাগে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা কোনো হয়রানির শিকার হলে এর দায় তালেবানকেই নিতে হবে বলে জানিয়েছে দেশগুলো।
এদিকে কাবুল শহরের মূল রাস্তাগুলো প্রায় ফাঁকা থাকলেও, কাবুল বিমানবন্দরমুখী প্রত্যেকটি রাস্তায় ব্যাপক ভিড় লক্ষ করা যায়। শহরের বাকি অংশ প্রায় ফাঁকাই বলা চলে। এমন পরিস্থিতিকে ভুতুড়ে বলে আখ্যা দিয়েছে রয়টার্স। শহরের অসংখ্য কার্পেট আর গহনার দোকানগুলোর পাশাপাশি ছোট ছোট ক্যাফেও বন্ধ রয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দোকানের মালামাল রক্ষার জন্য তারা এ ব্যবস্থা নিয়েছেন। অনেকের মধ্যে এ চিন্তাও রয়েছে যে, তাদের পরবর্তী গ্রাহক কোথা থেকে আসবে? এক দোকান মালিক রয়টার্সকে বলেন, আমি পুরোপুরি শোকের মধ্যে আছি। শহরে তালেবানের প্রবেশ আমাকে ভীত করে তুলেছে, কিন্তু আমাদের সবাইকে ঘানির ছেড়ে চলে যাওয়া পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি খারাপ করে তুলেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সরকারি অফিসগুলো খালি পড়ে রয়েছে। কূটনীতিক আর তাদের পরিবারের সদস্যরা চলে যাওয়ায় কাবুলের দূতাবাস এলাকা পুরোপুরি জনশূন্য হয়ে পড়ছে।
তালেবান অবশ্য ঘোষণা দিয়েছে যে, সাধারণ মানুষ তাদের প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ড খুব তাড়াতাড়ি শুরু করতে পারবে। তালেবানের এক নেতা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, সাধারণ জীবনযাত্রা আগের তুলনায় আরও ভালোভাবে চলবে। তালেবান আফগানিস্তান দখল করে নেওয়ার পর থেকেই সেখানকার সাধারণ মানুষের মনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। পরবর্তী সময়ে কী হতে যাচ্ছে তা নিয়েই ভাবনার শেষ নেই। এর মধ্যেই জাতির উদ্দেশে দেওয়া একটি ভিডিও বার্তায় তালেবানের উপপ্রধান নেতা মোল্লা বারাদার আখুন্দ বলেছেন, এখন সময় হয়েছে আফগানিস্তানের মানুষের সেবা আর তাদের জীবনমান উন্নয়ন করার।
