সূচনা প্রোডাকশনের অফিসে গিয়ে শিল্পী সুলতানের একটা পেইন্টিংয়ের দিকে আমি প্রায়ই তাকিয়ে থাকি। সূচনা কামার আহমাদ সাইমন আর সারা আফরীনের প্রোডাকশন। সতীর্থ, বন্ধু এই দম্পতি বড় পর্দায় তারেক মাসুদের চলচ্চিত্র দেখে চলচ্চিত্রের ব্যাপারে সিরিয়াস হয়ে ওঠেন। কামারের কথায় নানা লেখায় তিনি তারেক মাসুদকে গুরু হিসেবে অভিহিত করেছেন বলা যায়। বাংলাদেশে কয়েক দশকের স্বাধীন চলচ্চিত্র আন্দোলন কিংবা চিত্রকলার যে বিকাশ কামার সেই পরম্পরার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ একজন পরিচালক। স্বাধীন পরিচালক হিসেবে কামারের যাত্রা প্রায় এক দশক জুড়ে।এই জনপদে বসবাসরত নিম্নবর্গীয় মানুষের সংগ্রাম, বঞ্চনা এবং বীরত্বগাঁথাকে তুলে ধরেছেন কামার তার ফ্রেমে। শুনতে কি পাও! দেখার পর আমি তাকে মনে মনে চলচ্চিত্রের সুলতান বলি। বিন্দু বিন্দু করে কামার নিজেকে আজ এমন জায়গায় দাঁড় করিয়েছে, আজ লিখে ফেলাটা আর বাড়াবাড়ি হবে না মোটেও।
কামার এই পর্যন্ত নানান বিষয় নিয়ে কাজ করলেও, চরিত্রায়ণে গুরুত্ব দিয়েছেন নারী চরিত্রগুলোতেই। কামারের সমসাময়িক অন্যান্য পরিচালকদের কাজেও এখন নারী চরিত্রগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। সেগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গণে প্রশংসিতও হয়েছে। একেক জনের ছবির বিশেষত্ব এবং আঙ্গিক ভিন্ন। বেশকিছু চলচ্চিত্রে দারুণভাবে উঠে এসেছে শহুরে, উচ্চ মধ্যবিত্ত নারীর জীবনের জটিল স্পর্শকাতর বয়ান। তবে কামার এবং সারা এখন পর্যন্ত যতগুলো কাজ করেছেন, তাতে প্রাধান্য পেয়েছে প্রচলিত ক্ষমতা কাঠামোর বিপরীতে নারীর জীবন সংগ্রাম।
শুনতে কি পাও! ছবিটির বিশ্ব অভিষেক (ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার) ঘটে ২০১২তে, এরপর ২০১৫ সালে একটি সূতার জবানবন্দীর পর বহু প্রতীক্ষিত নীল মুকুট মুক্তি পেল এ দেশের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকিতে। এইসবগুলো চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু সেই অর্থে নারীবাদী নয়, কিন্তু কামারের চোখটাই এমন ওর ক্যামেরা খুঁজে পেতে নারীর কান্না দেখে, ওর সংগ্রাম ওর ভেঙে পড়াটা ওর শক্তির জায়গাটা তুলে আনে। আইলা নিয়ে কাজ করতে গিয়েও ওর ক্যামেরায় পোস্টারে সৌমেনের চেয়ে আমরা রাখিকে বেশি করে পাই। খুব সূক্ষ্ম বোধ-বুদ্ধি না থাকলে এ ধরনের দুর্যোগ নারীকে আলাদা করে যে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয় তার প্রামাণ্য দলিল সংগ্রহ দুষ্কর বৈ কি। একটি সূতার জবানবন্দীতেও আমরা দেখি কেবল ভিক্টিম হিসেবেই না বরং গার্মেন্টস মালিক হিসেবে রুবানা হককে তিনি দর্শকের সামনে হাজির করেন। নারীকে ডিস্ট্রেসড বা পীড়িত দেখানোর ভেতর দিয়ে দুনিয়ার আর শত শত পরিচালকের মতন কামার বোধ হয় তেমন শান্তি পান না।
শুনতে কি পাও! দিয়ে কামার এবং সারা যে দুনিয়া জোড়া বিভিন্ন উৎসবে ডাক পেলেন, তাক লাগালেন তার কারণই বোধহয় এটা। আবেগের বাড়াবাড়ি না রেখে ঘটনার যে নির্মেদ বয়ান, সেটা দেশ কালের সীমানা ডিঙিয়ে দৃশ্য বর্ণনার এক নতুন ঢং বা ভাষা তৈরি করেছে, তা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে বিরল।কলেজ শেষে ডি সিকার বাইসাইকেল থিফ দেখে মাথায় যে ধাক্কাটা লেগেছিল, কামারের ছবিগুলো দেখে মস্তিষ্কে আজ সেই অনুরণন। কামার প্রফেশনাল কাস্ট করে, সেট ফেলে, লোকেশন ঠিক করেও সিনেমাটা বানাতে পারতেন। সেটা করলে নিঃসন্দেহে নির্মাতাদ্বয়কে অনেক কম পরিশ্রম করতে হত। কিন্তু কামার তার চলচ্চিত্রের সাথে দর্শকের সখ্যতা তৈরি করেছেন ভিন্ন ভাষায়। বাস্তবতার আশ্রয় নিয়ে নিয়ে কামার পর্দায় তার গল্পগুলোকে জ্যান্তব করে তোলেন।
যদিও কামার বারবারই বলতে চান নীল মুকুটে কোন গল্প নেই—এমন কথা তিনি একটি সূতার জবানবন্দীর বেলায়ও বলেছেন— এখানে কোন চরিত্র নেই। কিন্তু আমি বলব, নীল মুকুটের প্রতিটি চরিত্র বস্তুত ভিন্ন ভিন্ন গল্প থেকে এসেছে। তারা যখন পর্দায় এসেছে, তাদের পিছু পিছু ওঠে এসেছে সেই গল্পগুলো। ঠিক যেভাবে একজন নারী মিশনে গিয়েও দেশ, সংসার, প্রেমিক কিংবা সংসার ফেলে আসতে পারেন না, ঠিক তেমন। এখানে একেকজন নারীর গল্প আর চরিত্রায়ণ একেক রকম, আবার তাদের সম্মিলিত সুর যেন একই।
নির্মাতা হিসেবে কামার এবং সারা অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং খুঁতখুঁতে। দারুণ চিত্রনাট্য লেখে কামার। ছবির শুরুতেই অঝোর ধারায় যে বৃষ্টির শটটা তিনি নিয়েছেন, এরচেয়ে ভালো সূচনা আর কিইবা হতে পারত। এই বৃষ্টি কেবল সন্তানকে ছেড়ে যাবার দৃশ্যটুকুকেই নয় বরং গোটা ছবিজুড়ে নারী পুলিশ সদস্যদের আনন্দ বিষাদের যে চড়াই উৎরাই তাতেও দ্যোতনা তৈরি করে।
একটু দেরিতে হলেও জানিয়ে রাখি একদল নারী পুলিশকর্মীর শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্য হিসেবে হাইতি যাত্রা এবং সেখানকার দায়িত্বপালনের সফরসঙ্গী আমাদের নীল মুকুট। আত্মীয় পরিজন ফেলে এতদিন পুরুষই দেশের বাইরে থেকেছে। প্রবাসী স্বামীর সাথে নারীর দূরবর্তী সম্পর্ক একরকম প্রশ্নাতীত বিষয়।কিন্তু নারীর বেলায় বিষয়টি সহজ নয়। মাথায় নীল টুপি পরা এই মানবীরা তাই বলে অতিমানবীও নয়। বরং একেবারে পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোতে গড় ওঠা পুলিশ বাহিনীতে কাজ করতে গিয়ে পদে পদে ভয় শঙ্কা লজ্জা সবকিছুকে পেছনে ফেলেই ওরা এগিয়েছে। সেনাবাহিনীর মত এলিট ফোর্স নয় বলে কিংবা ইংরেজিতে কথা বলার দক্ষতা নেই বলে যে হীনমন্যতা তৈরি হয়, তার ভেতর সূক্ষ্ম রাজনৈতিক আভাস থাকলেও কামার সেগুলোকে চাউর করেন না। এমনকি কলিগদের সাথে একান্ত আলাপে ওদের কূটকচালি, সামান্য চৌর্যবৃত্তি এগুলো ইগনোর করেন না। এই বিষয়গুলো কামারের বয়ানকে নির্মোহ করে তোলে।
পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের উপস্থাপনের ক্ষেত্রে উর্দির নিচের মানুষগুলোকে বের করে আনার ক্ষেত্রে নির্মাতা মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। উর্দি পরিহিত মানুষকে উপস্থাপন করা এক দুরূহ কাজ। উর্দি অনেকাংশেই ব্যক্তির স্বতন্ত্র সত্তাকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। ভ্যাকসিন নেবার দৃশ্য কিংবা শীতবস্ত্র কেনার মত দৃশ্যগুলোর ভেতর দিয়ে কামার যখন উর্দির নিচের ব্যক্তি মানুষগুলোকে রক্ত মাংস দিয়ে দর্শকের সামনে হাজির করেন, তখন তাদের বড় আপন মনে হয়।
বহুকাল ধরে পুরুষকে কেবল বিদায়ই জানিয়ে আসছে যে দেশের নারীরা, তাদের জন্য শান্তিরক্ষা মিশনে যাবার সুযোগ তাই কেবল টাকা কামাবার সুযোগ নয়। বরং বিদেশ বিভুঁইয়ে ভিন্ন সংস্কৃতি, মানুষ কিংবা প্রকৃতি নারীকেও আকর্ষণ করে, হাতছনি দেয়। একদম নিজের সত্তা, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সব জায়গা থেকে অনেকগুলো কিন্তুকে মোকাবেলা করে ওদের হাইতি যাত্রা। তাই এটা কেবলই একটি মিশন নয়, সমাজের প্রচলিত নিয়মের ব্যত্যয়টুকুন পুরো চলচ্চিত্রের মূল উপজীব্য হয়ে ওঠে। ভিন্ন পদমর্যাদার হলেও প্রতিটি নারীর জন্য এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। নীল মুকুট তাই নারীর এগিয়ে চলার পথে এক হর্ষ-বিষাদের আখ্যান তুলে ধরে। সেই সংগ্রাম আর বিষাদের রংটুকু চুইয়ে নারীর জয়ের মুকুট তাই নীল!
তানিয়া সুলতানা: শিক্ষক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ; [email protected]
