মুহুরী নদীর ভাঙনে বিলীন বাড়িঘর, হুমকির মুখে বেড়িবাঁধ

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২১, ০৪:২৯ পিএম

ফেনীর মুহুরী নদীর অব্যাহত ভাঙনে সোনাগাজীর উপকুলীয় অঞ্চলের শতাধিক পরিবার ভিটেবাড়ি হারিয়েছে। সর্বস্ব হারানো এসব মানুষেরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

বর্তমানে ভাঙন আতঙ্কে রয়েছে উপজেলার চর দরবেশ, চর চান্দিয়া, চর মজলিশপুর,  চরকৃঞ্চজয়, চরলামছি, চরডুব্বা, পূর্ব সোনাপুর ও বাদামতলি এলাকাসহ সদর ইউনিয়নের ১০ গ্রামের মানুষ।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, নদী থেকে অবৈধভঅবে বালূ উত্তোলন করায় প্রতি বছর বর্ষা শুরু হলে মুহুরী নদীর ভয়াল থাবায় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় চর দরবেশ, আমিরাবাদ ও নবাবপুর ইউনিয়নের নদী পাড়ের ঘরবাড়ি। কিন্তু এরপরও ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ঘরবাড়ি হারিয়ে রাস্তার পাশে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন যাপন করছে ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্থরা। নদী ভাঙন ঠেকাতে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে উপজেলার চর সোনাপুর, চর কৃষ্ণজয়, চর লামছি, চর ডুব্বা, আদর্শগ্রাম ও বাদামতলীসহ আশপাশের এলাকা ও পাউবোর বেড়িবাঁধ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।

নবাবপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা কবির আহাম্মদ (৫৫) জানান, প্রভাবশালী কিছু লোক নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করায় প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন চলছে। বাড়িঘর, ফসলি জমি ও মৎস্য খামারের মাটি ভেঙে নদীতে চলে গেছে। ভাঙনে বাড়ি ও মৎস্য খামারের পাড়ে থাকা বিভিন্ন প্রকারের গাছপালা।

বিবি আশেয়া নামে এক বাসিন্দা বলেন, তার বিয়ে হয়েছে প্রায় ৩৫ বছর। গত ৩০ বছর ধরে তিনি নদী ভাঙন দেখে আসছেন। এ পর্যন্ত তিনবার তাদের বাড়িঘর নদীগর্ভে চলে গেছে। গ্রামগুলোর প্রায় চার ভাগের দুইভাগ এলাকা বিলীন হয়ে গেছে। এখন আবার তাদের ৩২ শতকের বাড়ির প্রায় ২৫শতক নদীতে চলে গেছে। ভাঙন বাড়ির উঠান পর্যন্ত চলে এসেছে। এরপর কোথায় যাবেন তিনি জানেন না।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গত কয়েকদিনের মধ্যে উপজেলার চর কৃষ্ণজয়, চর লামছি, চর সোনাপুর. সাহপুর ও চর ডুব্বা এলাকার ১০-১৫টি বাড়ির বসতভিটা, মাছের খামার নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। অনেকে বসতঘর বেড়িবাঁধের অপর পাশে সরিয়ে নিচ্ছেন। অতিবৃষ্টি চলমান থাকলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে গ্রামের শতশত ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মৎস্য খামার, বেড়িবাঁধসহ ফসলি জমি নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বকুল আক্তার নামে এক নারী বলেন, শুকনো মৌসুমে ভাঙন তুলনামূলক কম থাকে। বর্ষা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ভাঙন শুরু হয়। গত দুই বছর আগে ভাঙন শুরু হলে বালুর বস্তা দিয়ে ভাঙন ঠেকানো হয়। কিন্তু নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে এখন আবার ভাঙন দেখা দিয়েছে। এভাবে ভাঙনতে থাকলেও আমরা মাথাগুজানোর ঠাঁই পাবো না। পরিবারের শেষ সম্বলটুকুও রক্ষা করতে পারবো কিনা জানি না। প্রতি বছর বহু ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, মাছের খামার নদীতে চলে যাচ্ছে। আর পূর্ব পাড়ে কিছু লোক নদী দখল করে আবার মাছের খামার তৈরি করছে। আমরাতো গরীব তাই আমাদের দেখা কেউ নেই।

এ বিষয়ে ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. নুর নবী বলেন, গত সোমবার তিনি ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। গত দুই বছর আগেও ভাঙন ঠেকাতে বালুভর্তি জিওবি ব্যাগ ফেলানো হয়েছিল। কিন্তু পুনরায় ভাঙন শুরু হওয়ায় আবারও ভাঙন প্রতিরোধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে তারা দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন।

আমিরাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. জহিরুল আলম বলেন, মুহুরী নদী থেকে এক শ্রেণির প্রভাবশালী মহল অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারনে তাঁর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি তিনি একাধিকবার লিখিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিছেন। কোনো সমাধান পাননি।

তিনি আরও বলেন, এভাবে চলতে থাকলেও সোনাগাজীর মানচিত্র থেকে হয়তো একদিন তার ইউনিয়ন হারিয়ে যাবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ এম জহিরুল হায়াত বলেন, ভাঙন কবলিত এলাকা তিনি সরেজমিনে পরিদর্শন করে ভাঙন ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নাছির উদ্দিন বলেন, মুহুরী নদীর ভাঙনে সোনাগাজী উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ইতিমধ্যে তিনি লোকপাঠিয়ে খোঁজখবর নিয়ে ভাঙন ঠেকাতে একটি প্রকল্প হাতে নিচ্ছেন।

এছাড়া মুহুরী নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়ে তিনি অবগত নন। ওই এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি জানবেন। যদি কেউ নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করেন। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত