আওয়ামী লীগ নেতার 'আদালতে' মাদক কারবারীদের যে সাজা!

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২১, ০৮:১৭ পিএম

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে মাদক নির্মূলের নামে একটি কমিটি করেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা। সেই কমিটির মাধ্যমে নিজেই সাজার ব্যবস্থা করছেন তিনি। মাদক কারবারী ও নিরীহ এলাকাবাসীকে থানা-পুলিশের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলম মিয়ার বিরুদ্ধে।

টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে মামলার ভয় দেখানো ও নির্যাতনেরও অভিযোগ রয়েছে ওই কমিটির বিরুদ্ধে।

গত কয়েক মাসে পৌরসভার চার নম্বর ওয়ার্ড সওদাগরপাড়া থেকে এ কমিটির মাধ্যমে কয়েক লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ বিষয়ে আলম মিয়া বলেন, তিনজনের কাছ থেকে ২২ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করে অফিস খরচ ও মাদকসেবিদের চিকিৎসার জন্য ব্যয় করা হয়েছে। 

আলম মিয়ার নেতৃত্বে গঠিত কমিটিতে এলাকার লাবলু, সাহেব আলী, বিদেশী, হেলাল, বেলাল, সোহেল ও সাহেদসহ বেশ কয়েকজন রয়েছেন। এদের বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মাদক বিক্রি ও সেবনের অভিযোগ রয়েছে।

সরেজমিনে মির্জাপুর পৌরসভার চার নম্বর ওয়ার্ডের সওদাগরপাড়ায় দেখা গেছে, প্রায় অর্ধসহস্রাধিক সওদাগর সম্প্রদায়ের লোকজনের বসবাস রয়েছে। নিন্ম আয়ের এসব মানুষ অধিকাংশই শিক্ষা থেকে বঞ্জিত।

জানা গেছে, ওই পাড়ায় ১৫/২০ জন চিহ্নিত মাদক বিক্রেতা এবং নারী-পুরুষ মিলে শতাধিক মাদক সেবনকারী রয়েছে। পুলিশ মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে তাদের ধরে জেলহাজতে পাঠালেও থেকে ছাড়া পেয়ে মাদক বিক্রি ও সেবনের জড়িয়ে পড়ে।

জানা গেছে, এসব মাদক কারবারিদের কাছ থেকে স্থানীয় বাসিন্দারা ছাড়াও উপজেলা বিভিন্ন এলাকার মাদকসেবিরা এসে মাদক কিনে থাকে।

এদিকে মির্জাপুর পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলম মিয়ার উদ্যোগে সওদাগড় পাড়াকে মাদকমুক্ত করতে চার নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি সরব আলী ফকির সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলামকে দিয়ে ছয় মাস আগে নির্মূল কমিটি গঠন করা হয়।

কমিটিতে এলাকার লাবলু, সাহেব আলী, বিদেশী, হেলাল, বেলাল, সোহেল ও সাহেদসহ আরও বেশ কয়েকজন রয়েছেন। কমিটিতে স্থানীয় দুই কাউন্সিলর রয়েছে বলে জানা যায়। আলম মিয়া ওই কমিটির উপদেষ্টা বলে তিনি স্বীকার করেন।

ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাফিজুর রহমান ও সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর রওশনারা বেগমের সঙ্গে কথা হলে তারা  জানান, না জানিয়ে নাম দেওয়া হয়েছে। কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত নন বলে তারা জানান।

এলাকাবাসী জানান, কমিটি গঠনের শুরুর দিকে কয়েকজন মাদক কারবারিকে ধরে পুলিশে সোর্পদ করলেও পরে থানা-পুলিশ ও বিচারের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করার কৌশল গ্রহণ করেন তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এলাকার বাসিন্দা মুন্নু মিয়া, লিটন, আশা, সুমু, জায়েদা, রায়হান, মুন্না ও রাশেদসহ ১১ জনকে পুলিশের ভয় দেখিয়ে ৯৬ হাজার টাকা আদায় করে কমিটি। জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে ২০ হাজার এবং তার মেয়ে জাহেদার কাছ থেকে দুই দফায় ২২ হাজার, দেলুয়ারের মেয়ের জামাইয়ের কাছ থেকে ৫ হাজার, গোড়াইল গ্রামের এক নারী থেকে ২০ হাজার টাকা নেয়া হয়। বাদলের মেয়ের জামাইয়ের কাছ থেকে ২ হাজার বিকুর ছেলের কাছ থেকে ১ হাজার টাকা আদায় করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন জানান, তাদের তিন-চারজনের কাছ থেকে পুলিশের ভয় দেখিয়ে ৩৫ হাজার টাকা নিয়েছে আলমের সাঙ্গপাঙ্গরা।

তাছাড়া এলাকার বাঁশি, মঞ্জু ও সোহেলের কাছ থেকে ৬ হাজার, সরল মিয়ার স্ত্রী মায়া রানীর কাছ থেকে ১০ হাজার এবং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি সরব আলী ফকিরের ছেলের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। 

এলাকা বাসিন্দা জব্বর সওদাগর জানান, যারা মাদক বিক্রি করে তাদের ধরে থানার ভয় দেখায়। পরে টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয়। ওই টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগির পর কিছু টাকা মসজিদের ফান্ডেও দেওয়ার কথা।

মাদক বিক্রেতা এক ব্যক্তি বলেন, কী কমিটি করছে পাঁচ হাজার টাকা দিলেই ছেড়ে দেয়।

স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, কমিটির সদস্য সাহেব আলীর মেয়ে আশা ও ছোট ভাই লিটন মাদক বিক্রি করলেও তাদের ধরা হয় না।

মায়া রানী বলেন, এলাকার কেউ গাঁজা, কেউ হেরোইন, কেউ ইয়াবা বিক্রি করে। তাদের ধরে নিয়ে টাকা আদায় করে ছেড়ে দেয়।

জায়েদা বেগম জানান, ‘তার স্বামী এক সময় হেরোইন খাইতো। এখন ভালো হয়েছে। আমার ঘরে কিছু পায় নাই। তারপরও আমার স্বামীকে ধরে নিয়ে যাবে বলে দুই কিস্তিতে ২২ হাজার টাকা নিয়েছে আলম মিয়া ও তার লোকেরা’।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, তারা যদি মাদক নির্মূল করতে চায়। তবে টাকা নিয়ে ছেড়ে দিলে কীভাবে মাদক হবে।

এ ব্যাপারে মির্জাপুর পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলম মিয়ার সঙ্গে কথা হলে তিনি মাদক নির্মূল কমিটি গঠনের কথা স্বীকার করেন। কিন্তু পুলিশের ভয় দেখিয়ে ও বিচারের নামে টাকা নেয়ার কথা অস্বীকার করেন।

তবে তিনজনের কাছ থেকে ২২ হাজার টাকা আদায়ের কথা স্বীকার করে বলেন, ওই টাকা থেকে ছেলেরা বসে সেই অফিসের খরচ ও মাদকাসক্ত ৭ জনের চিকিৎসার কাজে ব্যয় করা হয়েছে।

মির্জাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মীর শরীফ মাহমুদ বলেন, এ বিষয়ে আমি অবগত নই। খোঁজ নিয়ে দেখা হবে।

মির্জাপুর থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ রিজাউল হক দিপু বলেন, আলম মিয়া ইতিমধ্যে ৫/৬ জন মাদক বিক্রিতাকে তথ্য দিয়ে পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছে। মাদক নির্মূলে ওখানে সে কাজ করছে বলে আমাকে জানিয়েছে। কিন্তু সে যদি এই সুযোগে চাঁদাবাজি করে কারো কাছ থেকে টাকা তোলে বা অর্থনৈতিক সুবিধার জন্য এ কাজ করে তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। খোঁজ নিয়ে প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত