ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ বর্তমান সরকারের অন্যতম রাজনৈতিক অঙ্গীকার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা ধরনের সরকারি কর্মকান্ডে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার যেমন বেড়েছে তেমনি সরকারের নানা প্রকল্পে অভূতপূর্ব গতির সঞ্চার হয়েছে বিষয়গুলোকে সনাতন পদ্ধতি থেকে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে রূপান্তরের কারণে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে ‘জিটুপি’ বা ‘গভর্নমেন্ট টু পারসন’ পদ্ধতিতে সরাসরি সুবিধাভোগী ব্যক্তির কাছে সরকারি ভাতা পৌঁছানোর সাফল্যের কথা। নতুন এই সংযোজনের ফলে দেশে নানা রকম সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতার টাকা সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে ‘মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস’ বা ‘এমএফএস’-এর মাধ্যমে দিতে পারছে সরকার। সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীত নারীর ভাতা এবং প্রতিবন্ধী ভাতা কর্মসূচিতে মোট ৮৮ লাখ ৫০ হাজার সুবিধাভোগীকে নগদ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এরকম আরও বেশ কিছু সাফল্যের কথাও আলোচনায় আসতে পারে। অন্যদিকে, সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার কর্মকা-েও বিপুল পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ হচ্ছে নানা রকম সেবার ডিজিটাল রূপান্তরের প্রকল্পে। কিন্তু এমন সব প্রকল্পই কি জনগণের কাজে লাগছে কিংবা সরকারি কাজে গতি সঞ্চার করছে। বিষয়টি প্রশ্নসাপেক্ষ বটে।
সোমবার দেশ রূপান্তরে ‘রাজস্বের ভাগ মন্ত্রীর ভাগ্নের পকেটে’ শিরেনামের প্রতিবেদনে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) একটি প্রকল্পে ডিজিটাল অ্যাপস ব্যবহারের নামে অভিনব কায়দায় সরকারের রাজস্বের অর্থ বেসরকারি খাতে হাতিয়ে নেওয়ার খবর তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, এখন বিদেশে যেতে ইচ্ছুক শ্রমিকদের ‘আমি প্রবাসী’ নামের একটি অ্যাপসের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে বলা হচ্ছে। এই অ্যাপসে নিবন্ধনের জন্য প্রতি শ্রমিককে ৩০০ টাকা নিবন্ধন ফি দিতে হচ্ছে। অ্যাপসটি তৈরি করার পর গত চার মাসে প্রায় আড়াই লাখ বিদেশগামী শ্রমিকের কাছ থেকে সাড়ে ৭ কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী এ অর্থ সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা হওয়ার কথা থাকলেও এর মধ্যে আড়াই কোটি টাকাই জমা হয়েছে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নামে। অ্যাপস তৈরির নামে একটি চুক্তির মাধ্যমে সরাসরি রাজস্বের ভাগ নিচ্ছে ‘থ্যান সিস্টেম’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। চুক্তি অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠানটির তহবিলে ঢুকবে সাড়ে ৩৭ কোটি টাকা। আর বেসরকারি এই প্রতিষ্ঠানটির মালিক বর্তমান প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমেদের ভাগ্নে নামির আহমেদ।
জনপ্রশাসন, রাজস্ব বিভাগ ও আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের রাজস্ব ভাগাভাগির আইনগত কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর এই অ্যাপসের রাজস্বের অর্থ সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকের সংযুক্ত তহবিলের পরিবর্তে এ অর্থ জমা হচ্ছে একটি বেসরকারি ব্যাংকে। এটি পিপিআর ২০০৮, সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৯-এর ধারা ৭ এবং ট্রেজারি রুলসের রুল-৩ ও ৭ (১)-এর সুস্পষ্ট লংঘন বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এভাবে চলতে থাকলে এতে একদিকে সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হবে, অন্যদিকে বিএমইটি কার্যত অচল হয়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী সরকারের রাজস্ব বা সেবা থেকে যে অর্থ আসে তা এভাবে ভাগাভাগি করার সুযোগ নেই। বিএমইটি যদি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে চুক্তির বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়কে সঙ্গে নিয়ে করত; তাহলে হয়তো এমনটি হতো না। সরকার যদি মনে করে রাজস্ব বা সেবার অর্থ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভাগাভাগি করবে; তাহলে অবশ্যই বিধি পরিবর্তন করতে হবে।
অন্যদিকে, ‘আমি প্রবাসী’ নামের অ্যাপসটিতে অনেক ত্রুটির কথা উল্লেখ করে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় থেকে একজন সিনিয়র সহকারী সচিব গত ২৩ মে বিএমইটিতে একটি চিঠি দিয়ে জানান, অ্যাপসটির কারিগরি ত্রুটির জন্য প্রায় ৫০ ভাগ পাসপোর্ট ভেরিফিকেশনেই সমস্যা দেখা দিচ্ছে। কিন্তু এরপরও এই অ্যাপসের মাধ্যমেই ই-বহির্গমন ছাড়পত্র, ই-নিয়োগ অনুমতি, ই-কালো তালিকাভুক্তি, ই-ওয়ার্ক ভিসা, ই-মেডিকেল, ই-কারিগরি ট্রেনিং সেন্টার, ই-পদ্ধতিতে রাজস্বের টাকা আদায়ের জন্যও আরও একটি প্রস্তাব দিয়েছে মন্ত্রীর ভাগ্নের মালিকানাধীন থ্যান সিস্টেম। অথচ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বিএমইটির বর্তমান চুক্তির বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন রয়ে গেছে। আর সংশ্লিষ্টরা বলছেন এসব কাজ বেসরকারি খাতে দিয়ে দিলে কার্যত বিএমইটির হাতে খুব একটা কাজই থাকবে না। এই পরিস্থিতিতে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর উল্লিখিত চুক্তি বাতিল করাসহ সামগ্রিক কর্মকান্ডই পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাও জরুরি যে, শ্রমিক নিবন্ধনের মতো বিষয়ের একটি সাধারণ অ্যাপস তৈরির সক্ষমতা কেন সরকারি কোনো সংস্থার থাকবে না? এমন কাজও কেন বেসরকারি খাতে দিতে হবে। ডিজিটাল প্রযুক্তিতে রূপান্তর অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে যে, প্রযুক্তি যেন দুর্নীতির হাতিয়ার না হয়।
