কোপা আমেরিকার উত্তেজক ফাইনালের দু’মাসের মধ্যে আবার ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার হাই-ভেল্টেজ ফুটবল ম্যাচ উপভোগের সুযোগ এসেছিল সারা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের সামনে। গত রবিবার বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় সাও পাওলোতে শুরুও হয়েছিল ম্যাচ। তবে স্বপ্নভঙ্গের মতোই শুরুতেই ভেস্তে যায় তা। লিওনেল মেসি, নেইমারদের গোলের পরিবর্তে ঘটে চাঞ্চল্যকর সব ঘটনা। ইংল্যান্ডের লিগ ফুটবল খেলা আর্জেন্টিনার তিন ফুটবলার জিওভানি লো সেলসো, ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো ও এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে খেলা চলাকালীন ব্রাজিলের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা পুলিশের মাধ্যমে মাঠ থেকে তুলে নিতে গেলে গণ্ডগোল বাধে। মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা দল মাঠ ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রায় ঘণ্টাখানেক পর ম্যাচ কমিশনার খেলাটি স্থগিত ঘোষণা করেন।
ওই তিনজনসহ চার আর্জেন্টাইনের বিরুদ্ধে কভিড আইসোলেশন নিয়ম ভঙ্গ এবং মিথ্যা হলফনামা দিয়ে ব্রাজিলে প্রবেশের অভিযোগ আনা হয়েছিল। প্রিমিয়ার লিগের লাল তালিকাভুক্ত দেশগুলোতে ভ্রমণ না করার নির্দেশ সত্ত্বেও লো সেলসো, রোমেরো, এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ও এমিলিয়ানো বুয়েন্দিয়া গত সপ্তাহে ভেনেজুয়েলায় খেলতে যান। সেখান থেকে ৩ সেপ্টেম্বর তারা ব্রাজিলে গিয়েছিলেন। ব্রাজিলের নিয়ম অনুযায়ী যুক্তরাজ্য থেকে যাওয়াদের ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইন বাধ্যতামূলক। ব্রাজিলের স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা আনভিসার দাবি, শুক্রবার সাও পাওলোতে গিয়ে তাদের কোয়ারেন্টাইন করা উচিত ছিল। তবে আর্জেন্টিনা দল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ম্যাচের আগে কেন ব্রাজিলের স্বাস্থ্য বিভাগ এ পদক্ষেপ নেয়নি। কনমেবল তাদেরকে স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলারও অনুমতি দিয়েছিল। মেসিও প্রশ্ন তুলেছেন, ‘কেন তারা খেলা শুরু করল এবং পাঁচ মিনিট পর বন্ধ করল? আমরা তিন দিন ধরে এখানে। আজ স্টেডিয়ামে এক ঘণ্টা আগে থেকে, তারা আমাদের তখন বলতে পারত।’
আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি দুঃখপ্রকাশ করে বলেছেন, ‘আমার খুব খারাপ লাগছে। এখানে আমি কারও দোষ খুঁজছি না। বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের খেলা উপভোগ করতে এটি সবার জন্য একটি পার্টি হওয়া উচিত ছিল। আমি চাই আর্জেন্টিনার মানুষ বুঝতে পারে যে একজন কোচ হিসেবে আমাকে আমার খেলোয়াড়দের রক্ষা করতে হবে। কোনো সময়েই আমাদের জানানো হয়নি যে তারা ম্যাচ খেলতে পারবে না। আমরা খেলাটি খেলতে চেয়েছিলাম, ব্রাজিলের খেলোয়াড়রাও।’
ব্রাজিলের স্বাস্থ্য বিভাগ আনভিসার প্রধান বাররা তোরেস জানান, ‘আমরা ফেডারেল পুলিশকে বলেছি, এরপর হোটেলে গিয়েছি। গিয়ে দেখি তারা (আর্জেন্টিনা দল) আগেই স্টেডিয়ামের উদ্দেশে রওনা হয়ে গেছে। বাকি যা কিছু হয়েছে, সবকিছু সবাই সরাসরি দেখেছেন।’ কিন্তু ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধানের কথায় রহস্য দেখা দিয়েছে, ‘আমি জানি, আনভিসা তিন দিন ধরেই আর্জেন্টিনা দলের সঙ্গে আছে। কাজেই নিয়ম মেনেই সবকিছু হওয়ার কথা। ম্যাচ শুরুর পর যা হলো তা বিস্ময়কর। ম্যাচের কর্মকর্তারা আমাকে জানিয়েছিলেন যে ওই চারজন খেলতে পারবে। এরপর তাদেরকে ব্রাজিল থেকে বের করে দেওয়া হবে। কিন্তু অজানা এক কারণে পরিস্থিতি বদলে যায়।’
আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্লদিও তাপিয়া বলেছেন, ‘আজ যেটা ঘটেছে, সেটা ফুটবলের জন্য খুবই দুর্ভাগ্যজনক। ফুটবলে কালি লেপে দিয়েছে এটা। চারজন লোক একটা খবর জানাতে (ইংল্যান্ডের ক্লাবে খেলা আর্জেন্টিনার চার খেলোয়াড় খেলতে পারবে না জানিয়ে) মাঠে ঢুকে পড়লেন, আর কনমেবল খেলোয়াড়দের বলল ড্রেসিংরুমে ঢুকে যেতে!’ তিনি যোগ করেন, ‘আমাদের দল ৩ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকেই ব্রাজিলে। কনমেবলের দেওয়া সব স্বাস্থ্য প্রটোকলের নিয়ম আমাদের ফুটবলাররা মেনে চলেছে। নিয়ম মেনে আমরা ম্যাচ রেফারি ও কনমেবলের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নিয়ে ফিফার কাছে যাব। ফুটবলে এ ধরনের ঘটনা কাম্য নয়, যা এমন গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে স্পোর্টসম্যানশিপকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।’
আর্জেন্টিনা দল রবিবার ম্যাচ বাতিলের পরপরই দেশে ফিরে যায়। আর্জেন্টাইন রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল স্কিওলি মেসিদের নিজে সাও পাওলো বিমানবন্দরে পৌঁছে দেন। ৯ সেপ্টেম্বর (বাংলাদেশ সময় শুক্রবার ভোরে) বলিভিয়ার সঙ্গে মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে বাছাই ম্যাচ আছে তাদের। একই দিন ব্রাজিলও খেলবে পেরুর সঙ্গে।
স্থগিত ম্যাচটি কি আবার হবে, নাকি দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনমেবলের নিয়মানুযায়ী আর্জেন্টিনা বাতিল ম্যাচের নিয়মে ৩ পয়েন্ট পাবে সেটা ঠিক করবে তাদের ডিসিপ্লিনারি কমিটি। তাদের শৃঙ্খলাবিধির ৭৪ নম্বর ধারায় বলা আছেÑ ম্যাচ শুরু হয়ে গেলে খেলা থামিয়ে খেলোয়াড়দের ম্যাচ খেলায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যাবে না। খেলতে বাধা দেওয়া যাবে না। খেলোয়াড় সংক্রান্ত কোনো সমস্যা থাকলে সেটা মেটাতে হবে ম্যাচ শুরুর আগে বা পরে, ম্যাচ চলাকালীন সময়ে অবশ্যই নয়। এদিকে আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে কনমেবল জানিয়েছে, ম্যাচ রেফারি ও কমিশনার এই ম্যাচের রিপোর্ট জমা দেবেন ফিফার শৃঙ্খলা রক্ষাকারী কমিটির কাছে। এরপর কী হবে না হবে সেটা প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ফিফাই সিদ্ধান্ত নেবে। এখন সবকিছু নির্ভর করছে ফিফার ওপর।
