স্কুল-কলেজ খুলল, বিশ্ববিদ্যালয় কবে খুলবে

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:৩৯ এএম

দীর্ঘ প্রতীক্ষা পেরিয়ে ৫৪৩ দিন পর ১২ সেপ্টেম্বর খুলল দেশের স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার দুয়ার। এটি স্মরণকালের দীর্ঘতম বন্ধ। গত ৫ সেপ্টেম্বর সরকারের উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠক শেষে শিক্ষামন্ত্রী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, দেশে করোনার সংক্রমণ দ্রুত কমে আসছে। জুলাই মাসের তুলনায় সংক্রমণ ৭০ শতাংশ কমেছে, অতএব আগামী ১২ সেপ্টেম্বর থেকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শুরু হবে। একইসঙ্গে স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাসহ শিক্ষার্র্থীদের উপস্থিতি এবং পাঠদানের বিষয়ে বেশ কিছু নির্দেশনাও দিয়েছে সরকার। সে অনুযায়ী, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানকালে শিক্ষার্থী-শিক্ষকসহ সবাইকে মাস্ক পরিধান করতে হবে। ২০২১ সালে যারা এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী তাদের প্রতিদিন স্কুলে আসতে হবে। এছাড়াও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন ক্লাসে আসবে। প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণি এবং ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণিতে সপ্তাহে একদিন করে ক্লাস হবে। যেসব স্কুলে শিক্ষার্থী বেশি সেখানে প্রয়োজনে দুই শিফটে ক্লাস হবে। প্রথম শিফট সকাল ৯:৩০ মিনিট থেকে তিন ঘণ্টা চলবে। দুপুরে ৩০ মিনিটের বিরতির পর পুনরায়  ক্লাস শুরু হয়ে চলবে ৩:৪৫ মিনিট পর্যন্ত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এক দরজা দিয়ে ঢুকতে হবে, বের হতে হবে অন্য দরজা দিয়ে। তবে, প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের সশরীরে ক্লাস আপাতত বন্ধ থাকছে।

কিন্তু দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান তথা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলে দেওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি। করোনা মহামারীর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই হলো এখন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাপনার রোডম্যাপ। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলে দেওয়ার দাবিতে ছাত্রছাত্রীরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন। অনেকের চাকরির বয়স শেষ হয়ে যাচ্ছে, অনেক শিক্ষার্থীকে মেস কিংবা আত্মীয়-স্বজনের বাসায় থাকতে হচ্ছে এবং বহু শিক্ষার্থী গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন। দেশের ৪৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ২২০টি আবাসিক হল আছে, যেখানে এক লাখ ৩৫ হাজারের মতো শিক্ষার্থী থাকেন। ঘোষণাও করা হয়েছিল যে, ১৫ অক্টোবরের পর ধীরে ধীরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলে দেওয়া হবে, তারপর কলেজ, মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং সবশেষে শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়। কিন্তু ঘটনাক্রম একটু বিপরীত দিকেই গড়িয়েছে!

পরিস্থিতি থেকে মনে হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার বিষয়ে হয়তো আন্তর্জাতিক চাপ ছিল। সর্বশেষ গত ২৪ আগস্ট জাতিসংঘ শিশু তহবিল একটি প্রতিবেদনে বলেছে, করোনার কারণে দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশে^ দ্বিতীয়। এ দীর্ঘ বন্ধের কারণে প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা স্তর পর্যন্ত চার কোটি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারী, জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্যের মতো সমস্যাগুলোর তীব্রতা অভূতপূর্ব হারে বেড়ে যাওয়ায় বিশে্বর কোটি কোটি শিশুর শিক্ষাজীবন এখন অনিশ্চিত। সংক্রমণের ধাক্কা কাটিয়ে বিশে^র কিছু অংশে স্কুল-কলেজ খুলে দেওয়া হলেও সারা পৃথিবীর এক-চতুর্থাংশ দেশেই শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার হুমকিতে রয়েছে। ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’-এর করা এ তালিকায় বলা হয়েছে কঙ্গো, নাইজেরিয়া, সোমালিয়া, আফগানিস্তানসহ আটটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। ইয়েমেন, বুরকিনা ফাসো, ভারত, ফিলিপাইন, বাংলাদেশসহ আরও ৪০টি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ‘উচ্চঝুঁকি’তে রয়েছে বলেও জানিয়েছে সেভ দ্য চিলড্রেন।

করোনা মহামারীতে শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে অন্তত এক-তৃতীয়াংশের ঘরে বসে শিক্ষাগ্রহণের সুযোগও ছিল না। বর্তমানে উন্নয়নশীল বিশে^র দেশগুলো চরম দারিদ্র্য, কভিড-১৯, জলবায়ু পরিবর্তন, আন্তঃসম্প্রদায় সহিংসতাসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত। এর ফলে সেখানে ‘শিক্ষার্থীদের একটি হারিয়ে যাওয়া প্রজন্ম’ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে। সেভ দ্য চিলড্রেন যুক্তরাজ্যের প্রধান নির্বাহী গোয়েন হাইনস বলেন, আমরা জানি যে, করোনায় স্কুল বন্ধের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দরিদ্র শিশুরা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, শিশুদের শিক্ষা ও জীবনকে হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়া বিষয়গুলোর মধ্যে মাত্র একটি হচ্ছে কভিড-১৯। তার মতে, আমাদের এ ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে এবং এখনই কাজ করতে হবে। কিন্তু বিষয়গুলো আগের মতো করাই যথেষ্ট নয়। এটিকে আশা ও ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে আমাদের ‘অগ্রগামী ও ভিন্নভাবে’ সবকিছু গড়ে তুলতে হবে। নিঃসন্দেহে চমৎকার কথাই বলেছেন গোয়েন।

শিক্ষা প্রশাসন শিক্ষা কার্যক্রম চালুর প্রস্তুতি নিতে স্কুল-কলেজগুলোকে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিধি মানতে উদ্বুদ্ধ করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচ্ছন্ন করাসহ মোট ১৯ দফা নির্দেশনা দিয়েছে। প্রকাশ করা হয়েছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার গাইড লাইন। এ গাইড লাইন অনুসরণ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রস্তুত করতে বলা হয়েছে। সেপ্টেম্বর ৯ তারিখের মধ্যে এ নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়ন করতে সব স্কুল-কলেজকে আগেই নির্দেশ দিয়েছিল ‘মাউশি’। মাস্ক পরা ছাড়া কেউ শ্রেণিকক্ষে ঢুকতে পারবে না। শিক্ষার্থী-শিক্ষকসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত সবাইকে মাস্ক পরতে হবে। একেবারে কমবয়সী যারা তাদের কোনো সংকট হচ্ছে কি না তা শিক্ষকদের খেয়াল রাখতে হবে। স্কুলে অ্যাসেম্বলি হবে না তবে শরীরচর্চা হবে।

প্রাথমিকের শুরুর দিকে শিক্ষা ও স্কুলের ব্যাপারটি শিক্ষার্থীদের অভ্যাসের অংশ হওয়ার আগেই স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। তারপর গ্রামের শিক্ষার্থীদের বড় অংশের পক্ষে টেলিভিশন বা অনলাইনে শিক্ষাগ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। একে তো ডিভাইস নেই, আবার ‘শেখার’ ব্যাপারটিও তাদের কিন্তু শেখা হয়ে ওঠেনি। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে পঠন-পাঠনের পাশাপাশি স্কুলে আসা, শিক্ষকের কাছ থেকে পাঠ গ্রহণ, দলীয় কাজ ও সামাজিক নিয়মকানুনের সঙ্গে কিন্তু তার পরিচয় হয়নি। একইভাবে, যে শিশু ২০২০ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছিল, ইতিমধ্যে সে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির অনেক সময় পাড়ি দিয়ে ফেলেছে। এখন যদি তাকে আমরা আবারও ‘অটো পাস’ দিয়ে অষ্টম শ্রেণিতে তুলে দিই তাহলে সেটি তার জন্য মঙ্গলজনক হবে না। কারণ ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে অনেক নতুন বিষয়, অনেক বিষয়ের নতুন অধ্যায় তার কাছে অপরিচিত হওয়ার কথা। যেমন, বীজগণিতে হাতেখড়ি, জ্যামিতির এক্সট্রা সমাধান করা ইত্যাদি। এখন যদি আমরা এই শিক্ষার্থীদের ‘অটো পাস’ দিয়ে পরবর্তী শ্রেণিতে তুলে দিই, তাহলে এই ১৮ মাসে যেসব শিখনফল বা শ্রেণিভিত্তিক যোগ্যতা তাদের অর্জন করার কথা ছিল, সেগুলো অর্জন না করেই তারা পরবর্তী শ্রেণিতে চলে যাবে। এ থেকে উত্তরণের একটি পথ হচ্ছে শিক্ষাবর্ষকে প্রলম্বিত করা। বর্তমান শিক্ষাবর্ষকে অনায়াসে ২০২২ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত বর্ধিত করা যায়। সে ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বর্তমান শ্রেণির যোগ্যতা ও শিখনফল অর্জনে এবং পরবর্তী শ্রেণির জন্য তৈরি করতে স্কুলগুলো কমবেশি ছয়মাস সময় পাবে। এই প্রক্রিয়ায় ২০২২ শিক্ষাবর্ষকে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত প্রলম্বিত করে ২০২৪ সালে আবার জানুয়ারি-ডিসেম্বর শিক্ষাবর্ষে ফেরা যেতে পারে। 

শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর ক্ষেত্রে সরকারকে অন্তত ৭টি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। স্কুল-কলেজ খোলার পর কী পরিমাণ শিক্ষার্থী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরবে আর ফিরবে না তা অনিশ্চিত। মাউশি বলছে খোলার পর উপস্থিতি-অনুপস্থিতি দেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে না ফেরা শিক্ষার্থীর তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হবে। তাই, অনেক বিশ্লেষক বলছেন যে, শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তির পরিমাণ বাড়িয়ে দিলে সুফল পাওয়া যেতে পারে। ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে ঝরে পড়া দ্রুত কমিয়ে আনাসহ সব শিক্ষার্থী যেন অষ্টম শ্রেণি শেষ করতে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছিল।

ইউনিসেফের তথ্যমতে, উন্নত দেশগুলোর বেশিরভাগ অংশে স্কুলগুলো ফের চালু হলেও বাকি বিশে^র অন্তত ১৬টি দেশে কঠোর লকডাউনের কারণে ১০ কোটিরও বেশি শিশু ক্লাসের বাইরেই থাকছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে এক থেকে দেড় কোটি শিশু হয়তো আর কখনোই স্কুলজীবনে ফিরতে পারবে না। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে মেয়ে শিশুরা। ইউনিসেফের শিক্ষা বিষয়ক বৈশি^ক পরিচালক রবার্ট জেনকিন্সের মতে, করোনা মাহামারীর আগেও বিশে^র বেশিরভাগ অঞ্চল শিক্ষা সংকটের মুখে ছিল। তিনি বলেন, এখন আমরা শিক্ষার্থীদের একটি প্রজন্ম হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছি। এটি আজীবন প্রভাব ফেলতে পারে, যদি না আমরা শিশুদের পূর্ণাঙ্গ ও ব্যাপক সহায়তা প্রদান করবে এমন কর্মসূচির দিকে না যাই। শুধু শিক্ষার জন্যই নয়, তাদের মানসিক স্বাস্থ্য, পুষ্টি সহায়তা এবং সুরক্ষার জন্যও সহায়তা দরকার। কিন্তু বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর সরকার এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে প্রয়োজনীয় নজর দেবে কি? এক্ষেত্রে উন্নত বিশে^র দেশগুলো যুদ্ধ নামক মানব বিধ্বংসী খেলায় মেতে না থেকে উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলোর শিশুদের উন্নত শিক্ষা প্রদানে সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে এই বিশ্বকে মানুষের সঠিক অবাসভূমিতে পরিণত করার মহৎ চেষ্টায় যুক্ত হতে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকারও চলমান এই মহামারীর পরিপ্রেক্ষিতে নিজ নিজ শিক্ষা বাজেট এবং শিক্ষা খাতে বিশেষ বরাদ্দের বিবেচনা গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিতে পারে। সেটিই সবার কাম্য।

লেখক শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত