ছিনতাইকারীদের অন্যতম লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন মানি এক্সচেঞ্জের গ্রাহকরা। মোটা অঙ্কের টাকা তুলে বের হওয়ার পরই তাদের অস্ত্রের মুখে লুট করা হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গুলির ঘটনাও ঘটছে। বিশেষ করে হুন্ডি ব্যবসায়ীরাই তাদের মূল টার্গেট। এমনকি চক্রের সঙ্গে জড়িত আছেন মানি এক্সচেঞ্জের সঙ্গে যুক্ত এক শ্রেণির অসাধু কর্মচারীরাও। তারাই ছিনতাইকারীদের আগাম তথ্য দিয়ে দিচ্ছেন। আবার কিছু ক্ষেত্রে অপরাধীরা নিজেরাই রেকি করে ছিনতাই ঘটিয়ে থাকেন। ছিনতাই করা টাকায় আবার অনেকে গড়ে তুলেছেন মাছের খামার ও গরুর ফার্ম। সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনায় যুক্ত থাকার অভিযোগে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর এসব তথ্য পেয়ে খোদ তদন্তকারী কর্মকর্তারাও হতবাক। সর্বশেষ গত বুধবার ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে প্রায় কোটি টাকা লুটের দুটি ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয় তিনজনকে। উদ্ধার করা হয় দুটি অত্যাধুনিক অস্ত্র এবং ৫০ রাউন্ড গুলি। ছিনতাই কাজে ব্যবহার করার জন্যই ১২ লাখ টাকা দিয়ে তারা অস্ত্র দুটি সংগ্রহ করেছে বলে গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে। এর আগে প্রবাসীর টাকা লুটের ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয় এক সাব-ইন্সপেক্টরসহ ছয় ডাকাতকে।
পুলিশের তথ্য মতে, চাঞ্চল্যকর কয়েকটি ঘটনার পর সরকার অনুমোদিত ২৩৪টি মানি এক্সচেঞ্জের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখতে সরেজমিনে তদন্ত শুরু করে পুলিশের কয়েকটি ইউনিট। বেশ কিছু মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান স্থান বদল করলেও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমতি নেয়নি। সরকারের অনুমতি না নিয়েও গড়ে তোলা হয়েছে একাধিক মানি এক্সচেঞ্জ। এ কারণে সংশ্লিষ্ট থানাগুলোর কাছে এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো ঠিকানা নেই। এ কারণে ওইসব এলাকায় পুলিশি তৎপরতা শুরু করা যাচ্ছে না। আর এ সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছে সংঘবদ্ধ অপরাধীরা।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, সম্প্রতি ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের প্রায় কোটি টাকা লুটের দুটি ঘটনায় গত বুধবার গ্রেপ্তারকৃতরা হচ্ছে জলি ওরফে জলিল মোল্লা, রিয়াজ ও দীপু। তাদের কাছ থেকে দুটি বিদেশি রিভলবার, ৫০ রাউন্ড গুলি, দুটি মোটরসাইকেল ও লুট করা এক লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। গত ২৮ আগস্ট এক ব্যবসায়ী মতিঝিলের একটি মানি এক্সচেঞ্জ থেকে ৬০ লাখ টাকা নিয়ে গাড়িযোগে রওনা দেন। ছয়জন ডাকাত মোটরসাইকেলযোগে ওই ব্যবসায়ীর গাড়ি অনুসরণ করে দুপুর ১টা ২০ মিনিটে মৌচাক ফ্লাইওভারের ওপর তার গতিরোধ করে। ডাকাতরা আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য ২ রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে এবং হাতুড়ি দিয়ে গাড়ির দরজার গ্লাস ভেঙে ফেলে। তারপর ওই গাড়ি থেকে ৬০ লাখ টাকা লুট করে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় গত ২৯ আগস্ট রমনা মডেল থানায় একটি মামলা করা হয়। ৪ সেপ্টেম্বর মতিঝিল থেকে ২৫ লাখ টাকা নিয়ে যাওয়ার সময় আরেক ব্যবসায়ীকে আক্রমণ করে এই ডাকাত দলের সদস্যরা। ওই ব্যবসায়ী নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড় পৌঁছালে ডাকাত দলের সদস্যরা তার গতিরোধ করে টাকা ছিনিয়ে নেয়। পথচারীরা জড়ো হয়ে ডাকাতদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলে ডাকাতরা গুলি ছোড়ে। এতে একজন পথচারী গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় একটি মামলা হয়। চাঞ্চল্যকর এই দুটি ঘটনার ছায়া তদন্ত শুরু করে ডিবির রমনা বিভাগের টিম। একপর্যায়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার জলিলের বিরুদ্ধে চারটি ও বাকি দুজনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।
ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার জানিয়েছেন, ডাকাতির জন্য তারা সরকারি ছুটির দিন শনিবারকে বেছে নিত। টার্গেট করত মানি এক্সচেঞ্জকে। তারা সবাই পেশাদার ডাকাত দলের সদস্য। এ দলের একটি গ্রুপ মানি এক্সচেঞ্জ এলাকায় অবস্থান করে ও যারা বেশি টাকা বহন করেন তাদের টার্গেট করে। মানি এক্সচেঞ্জার থেকে টাকা নিয়ে কেউ বের হলে সেই তথ্য তারা তাদের সহযোগী মোটরসাইকেলে অবস্থানকারী গ্রুপকে দেয়। এরপর সুবিধাজনক স্থানে ফাঁকা গুলি করে আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে টাকা ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়।
গোয়েন্দা পুলিশের রমনা জোনের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার মিশু বিশ^াস বলেন, গ্রেপ্তাররা সবাই পেশাদার অপরাধী। এর আগে তারা গাজীপুরে একটি গার্মেন্টসের ৮৫ লাখ টাকা লুট করে। ওই ঘটনায় তারা র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়। সম্প্রতি জামিনে মুক্ত হওয়ার পর আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটিয়ে ১২ লাখ টাকায় দুটি অত্যাধুনিক জার্মানির তৈরি অস্ত্র কেনে। এরপর ওই অস্ত্র দিয়ে তারা ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে প্রায় কোটি টাকার দুটি লুটের ঘটনা ঘটায়। লুট করা টাকা দিয়ে তারা যশোরে মাছের খামার ও গরুর ফার্ম গড়ে তোলে। ওইসব খামারে অন্তত ২০ জন কর্মচারী কাজ করে। তার মধ্যে জলিল তাদের গুরু। খামারে অন্তত কোটি টাকার ইনভেস্ট করেছে তারা।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তরা জোনের উপপুলিশ কমিশনার শফিকুল আলম বলেন, ২০২০ সালের শেষের দিকে বিমানবন্দর এলাকায় যাওয়ার পথে এক প্রবাসীর টাকাপয়সা লুট হয়। ওই মামলার তদন্ত শুরু করে গোয়েন্দা পুলিশ একপর্যায়ে ৬ আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হচ্ছে আমির হোসেন তালুকদার, রিজু মিয়া, হাসন রাজা, মোশারফ হোসেন, সেলিম মোল্লা ও মো. রিপন মোড়ল। তাদের মধ্যে হাসন রাজা ও সেলিমের নামে ৩টি করে বিমানবন্দর, কেরানীগঞ্জ, সাভার ও মাদারীপুরে ডাকাতি মামলা রয়েছে। পরে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় সাবেক সেনা সদস্য হাসন রাজা। ওই জবানবন্দিতে সিআইডির এসআই আকসাদুজ্জামানকে সাময়িক সাসপেন্ড করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনার পর আকসাদুজ্জামান ও সোর্স আমিরের একটি অডিও রেকর্ড ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দেখা যায় তারা হুন্ডির টাকা ডাকাতির পরিকল্পনা করছে।
পুলিশের উত্তরা জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার কায়সার রিজভী কোরাইয়েশী বলেন, গত বছরের ১৯ অক্টোবর দুবাই যাওয়ার জন্য টিকাটুলির বাসা থেকে সিএনজি অটোরিকশাযোগে বের হন রোমান মিয়া নামের এক প্রবাসী। তার সিএনজি অটোরিকশাটি সকাল সাড়ে ৭টার দিকে বিমানবন্দর সংলগ্ন কাওলা ফুটওভারব্রিজের কাছে পৌঁছালে একটি মাইক্রোবাস ও দুটি মোটরসাইকেল তাদের গতিরোধ করে। এরপর ডিবি পরিচয়ে রোমান মিয়াকে চোখ বেঁধে গাড়িতে তুলে নেওয়া হয় এবং মনির হোসেনকে মারধর করে রাস্তায় ফেলে রেখে যায়। পরে রোমানকে গাড়ির ভেতর মারধর করে আনুমানিক ৪ লাখ ৭৮ হাজার টাকা মূল্যের ইউএস ডলার, দিরহাম ও মোবাইল ফোন লুটে নেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, এ ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে দেখা যায় একটি মানি এক্সচেঞ্জ থেকে ঘটনার এক দিন আগে টাকাকে রূপান্তর করেন রোমান মিয়া। সেখান থেকে সোর্সের মাধ্যমে বিদেশে ডলার ও দিরহামের বিষয়ে তথ্য পায় আকসাদুজ্জামানের সিন্ডিকেট। এরপর তারা লুট করে। শুধু রোমান মিয়ান টাকাই নয়, এর আগে তারা আরও একাধিক হুন্ডি ব্যবসায়ীর টাকা লুট করেছে। কিছু ক্ষেত্রে মানি এক্সচেঞ্জ থেকে হুন্ডি ব্যবসায়ীরা ডলার ভাঙালে তার তথ্যও পেয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। এজন্য মানি এক্সচেঞ্জে তাদের নিজস্ব সোর্স রয়েছে। লুট হওয়া টাকার একটি অংশ পায় সোর্সরাও। গ্রেপ্তার আমিরসহ অনেকে এই টাকায় গরুর ফার্ম ও মাছের খামার গড়ে তুলেছে। মানি এক্সচেঞ্জের এই চক্রের আরও একাধিক সদস্য গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছে। দ্রুতই তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।
