অভিযোগপত্র হওয়ার আগে সরকারি কর্মচারীদের গ্রেপ্তারে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি নেওয়ার বিধান সংবিধানের সঙ্গে কেন সাংঘর্ষিক হবে না তা জানতে চেয়েছে উচ্চ আদালত। এর আগে ২০১৮ সালে সরকারি কর্মচারীদের গ্রেপ্তারের আগে সরকার তথা ওই কর্মচারীর নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগবে এ রকম বিধান রেখে ‘সরকারি চাকরি বিল ২০১৮’ গৃহীত হয়েছিল। যা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী বলে সমালোচিত হয়েছিল। ২০১৮ সালের সরকারি চাকরি আইনের ৪১ (১) ও ৩ ধারার বৈধতা নিয়ে কুড়িগ্রামের স্থানীয় সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিটটি করেন। ৩ ধারায় আইনের প্রাধান্য বিষয়ে এবং ৪১ ধারায় ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত কর্মচারীর ক্ষেত্রে ব্যবস্থাদি সম্পর্কে বলা আছে। আইনের ৪১ (১) ধারা বলছে, কোনো সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত অভিযোগে দায়ের করা ফৌজদারি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র গৃহীত হওয়ার আগে তাকে গ্রেপ্তার করতে হলে, সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি গ্রহণ করতে হবে। এ ধরনের বিধানকে বৈষম্যমূলক ও সংবিধান পরিপন্থী বলেও মতামত দিয়েছেন দেশের সংবিধান ও আইন বিশেষজ্ঞরা।
সংবিধানের ২৯(৩) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদলাভের অযোগ্য হইবেন না, কিংবা সেই ক্ষেত্রে তাহার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না।’ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ লাভের ক্ষেত্রে কারও প্রতি কোনো ধরনের বৈষম্য না করার নির্দেশনা সংবিধানে রয়েছে, তেমনি কর্মচারী হিসেবে নিয়োগের পরও চাকরিবিধি অনুসারে প্রাপ্ত সুবিধাদির বাইরে আর কোনো বিশেষ সুবিধা বা দায়মুক্তি সরকারি কর্মচারীরা পেতে পারেন না। কিন্তু সরকারি চাকরি আইনটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত সরকারি কর্মচারীরা বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন। তারা যেই সুবিধা পান, কোনো সাধারণ ব্যক্তি এমনকি জনপ্রতিনিধিও সেই সুযোগ পান না। কেবল সংসদ অধিবেশন চলার সময়ে কোনো সংসদ সদস্যকে আটক বা গ্রেপ্তার করতে হলে সংসদের স্পিকারের অনুমোদন নিতে হয়। এছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থা চাইলেই সংসদ সদস্যকে গ্রেপ্তার করতে পারবে। এই আইনের মাধ্যমে সরকারি কর্মচারীদের একধরনের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে, যা শুধু বৈষম্যপূর্ণ নয়, সংবিধানের মৌলিক চেতনারও বিরোধী। ১৯৬৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা অনুযায়ী দুদক অনুসন্ধান ও তদন্ত পর্যায়েও যে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে। ২০০৪ সালের দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ৫ ধারায়ও এ বিধান বলবৎ রাখা হয়েছিল। সেই আইনটিতে পরিবর্তন আনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে যদি হাতেনাতে পেয়েও যায়, তারপরও তারা তাকে গ্রেপ্তার করতে পারবে না। তাদের গ্রেপ্তারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ অনুযায়ী ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত সরকারি কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারে পূর্বানুমতি গ্রহণের যে বিধান সন্নিবেশিত হয়েছে তা প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের সততা, স্বচ্ছতা, উন্নত পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষ জনপ্রশাসন নিশ্চিতের পরিপন্থী। উচ্চ আদালত সম্প্রতি সরকারি কর্মচারী আইন-২০১৮ এর এ সংক্রান্ত ধারা ৪১(১) ও ৩ সংবিধানের ২৭, ৩১ ও ৩৫(৬) অনুচ্ছেদের সঙ্গে কেন সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়েছে। জনপ্রশাসন সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ মোট ৮ বিবাদীকে চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে রুলে ফৌজদারি মামলার আসামি কুড়িগ্রামের সাবেক ডিসি সুলতানা পারভীন, সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমা ও জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার নাজিম উদ্দিনকে পদায়ন করা থেকে বিরত থাকতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না এবং এনডিসি এস এম রাহাতুল ইসলামকে বরিশালে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে পদায়ন করা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তাও জানতে চেয়েছে।
ফৌজদারি মামলার পর যে কোনো নাগরিককে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা গ্রেপ্তার করতে পারে। কিন্তু সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে এসবের ব্যত্যয় রেখে প্রণীত ওই আইন সংবিধানের ২৭, ৩১ ও ৩৫(৬) অনুচ্ছেদের স্পষ্ট লংঘন। আমরা মনে করি, কোনো আইনই সংবিধানকে লংঘন করতে পারে না। এই ঘটনায় উচ্চ আদালতের এই পদক্ষেপে সংশ্লিষ্টরা পুনর্বিবেচনার বিষয়টি ভেবে দেখার ও সংশোধনের সুযোগ পাবেন বলে আশা করা যায়। এখানে একটি বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সরকারি কর্মচারী কিংবা কর্মচারী নন সেই হিসেবে কখনো গ্রেপ্তার করা হয় না, গ্রেপ্তার করা হলে সেটা হবে অভিযুক্ত হিসেবে। অন্যান্য অভিযুক্ত যেমন আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করবেন, সরকারি কর্মচারীদের জন্য সেই একই সুযোগ থাকবে। বিচারের আগেই কেবল সরকারি কর্মচারী বিবেচনায় কেউ দায়মুক্তি পেতে পারেন না। আইন সবার জন্য সমান এই বাক্য আমাদের ভুলে গেলে চলবে কেন! রাষ্ট্রে অবশ্য সংবিধান পরিপন্থী কোনো আইন চলতে পারে না।
