বিএনপি জোট ছাড়ল নিবন্ধিত শেষ ইসলামী দল

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২১, ০২:০৫ এএম

জোট অকার্যকর করে রাখার জন্য বিএনপির ওপর দায় চাপিয়ে ২০-দলীয় জোট ছাড়ল খেলাফত মজলিস। গতকাল শুক্রবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মোহাম্মাদ ইসহাক বলেন, ‘২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যুক্ত হয়। তারপর থেকে মূলত ২০-দলীয় জোট অকার্যকর হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় আদর্শিক, সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় খেলাফত মজলিস একটি আদর্শিক রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে সক্রিয় স্বতন্ত্র, বৈশিষ্ট্য নিয়ে ময়দানে ভূমিকা রাখবে এবং এখন থেকে ২০-দলীয় জোটসহ সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করছে।’

ইতিমধ্যে ২০-দলীয় জোট থেকে ইসলামী ঐক্যজোট, এনপিপি, ন্যাপ ও এনডিপি বেরিয়ে গেছে। তবে একই নামে এসব দলের একাংশ বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে রয়েছে। সর্বশেষ গত ১৮ জুলাই জমিয়ত বেরিয়ে গেলেও একই নামে আরেকটি অংশ রয়েছে জোটে। এর আগে ৭ মে ২০১৯ জোট ছেড়ে যায় ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থের বিজেপি। জোট ছাড়ার কারণ হিসেবে তখন বিজেপির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ অভিযোগ করে বলেছিলেন, ‘২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে। এরপর থেকে তারা ফ্রন্টমুখী হয়ে পড়েছে।’

খেলাফত মজলিসের জোট ছাড়ার বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জোটের শরিক দলগুলোর নিজস্ব রাজনীতি আছে। নিজেদের নেতাদের সিদ্ধান্তে দল পরিচালিত হয়। এখন খেলাফত মজলিসের নেতারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা জোটে থাকবে না। এখানে আমাদের কিছু বলার নেই।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থায়ী কমিটির এক প্রভাবশালী সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর দলের নির্বাহী কমিটির সভা হয়েছে। সভায় প্রায় ৩০০-এর বেশি নেতা বক্তব্য রেখেছেন। তাদের বেশির ভাগই জোট ও ফ্রন্ট বাদ দিয়ে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে রাজপথে যুগপৎ আন্দোলনের পরামর্শ দিয়েছেন। শিগগিরই আমরা দলের নেতাদের পরামর্শগুলো পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা জোট কিংবা ফ্রন্ট নিয়ে ভাবছি না। আমরা দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকারবিরোধী আন্দোলনে যাব।’

বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খেলাফত মজলিস যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা তাদের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে নিয়েছে। এখানে আমাদের কিছু বলার নেই। জোর জবরদস্তির বিষয় নেই।’

জোট ছাড়ার বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খেলাফত মজলিসের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে একলা চলো নীতিতে চলছে। জোটের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। কোনো বৈঠক নেই, রাজনীতি নেই। এ অবস্থায় খেলাফত মজলিস নিজের রাজনীতি নিজেরা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০১৯ সালে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রী বাজেট পেশ করার পর ৫ জুলাই ভার্চুয়ালি ২০-দলীয় জোটের সর্বশেষ বৈঠক হয়। এরপর থেকে আর কোনো বৈঠক হয়নি।

দলটির নেতারা জোট ছাড়ার কারণ সম্পর্কে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপি-জোট নিষ্ক্রিয় ও অকার্যকর। আর এই জোটে থাকার রাজনৈতিক মূল্যায়নও পায়নি মজলিস। তবে খেলাফত মজলিসের জোট ত্যাগ করার পেছনে রাজনৈতিক কারণই প্রধান। রাষ্ট্রীয় চাপ ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিয়ে নতুন আঙ্গিকে চিন্তা করার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখেও পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনার চিন্তাভাবনা চলছে মজলিসে।

সংবাদ সম্মেলনে যা বলেছে খেলাফত মজলিস : সংবাদ সম্মেলনে খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মোহাম্মাদ ইসহাক লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘খেলাফত মজলিস একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল হিসেবে জাতির প্রয়োজনে সর্বদা সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে। নিয়মতান্ত্রিক শান্তিপূর্ণ আন্দোলন-সংগ্রামে খেলাফত মজলিস বিশ্বাসী। একটি সুশৃঙ্খল সংগঠন হিসেবে দীর্ঘ তিন দশকের অধিক সময় রাজনৈতিক অঙ্গনে দেশ, জাতি, ইসলাম ও জনগণের পক্ষে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে আসছে। খেলাফত মজলিস মনে করে, দেশের প্রতিটি নাগরিকের রাজনৈতিক মতাদর্শ লালন-পালন করার অধিকার আছে; যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানেও স্বীকৃত। একটি সরব সক্রিয় নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল হিসেবে খেলাফত মজলিসের রাজনৈতিক কর্মকৌশল সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় সময়ে-সময়ে পর্যালোচনা করে, দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে।’

তিনি আরও বলেন, ‘গত ২০১৯ সালের ২৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত মজলিসে শূরার অধিবেশনে ২০-দলীয় জোটের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে পরবর্তী সিদ্ধান্তের পূর্ব পর্যন্ত খেলাফত মজলিস জোটের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ না করে রাজনৈতিক পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। সে অনুযায়ী দীর্ঘ দুই বছরের অধিক সময় ধরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আসছে।’

মাওলানা ইসহাক বলেন, ‘রাজনৈতিক জোট ইস্যুকেন্দ্রিক গঠিত হয়। জোট কোনো স্থায়ী বিষয় নয়। খেলাফত মজলিস ২০-দলীয় জোটে দীর্ঘ ২২ বছর যাবৎ আছে। ২০১৯ সাল থেকে ২০-দলীয় জোটের দৃশ্যমান রাজনৈতিক তৎপরতা ও কর্মসূচি নেই। ২০১৮ সালে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের মধ্য দিয়ে ২০-দলীয় জোটকে কার্যত রাজনৈতিকভাবে অকার্যকরও করা হয়।’

সংবাদ সম্মেলনে খেলাফত মজলিসের আমির অধ্যক্ষ মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির আল্লামা জুবায়ের আহমেদ চৌধুরী, নায়েবে আমির অধ্যক্ষ মওদুদ উদ্দিন আহমেদ, মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন, আহমেদ আলী, অধ্যাপক আব্দুল হালিম ছাড়াও দলটির যুগ্ম মহাসচিব সহসাংগঠনিকসহ জেলার নেতারা।

এর আগে বেলা ২টায় কেন্দ্রীয় এবং জেলা পর্যায়ের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের নিয়ে দুই ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করে খেলাফত মজলিস। বৈঠকে প্রায় দুই শতাধিক সদস্য অংশ নেন। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

যেভাবে জোটবদ্ধ হয়েছিল খেলাফত মজলিস : ১৯৯৯ সালের ৬ জানুয়ারি জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ঐক্যজোটকে সঙ্গে নিয়ে চারদলীয় জোট গঠন করেছিল বিএনপি। পরে এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি বেরিয়ে গেলে যুক্ত হয় নাজিউর রহমান মঞ্জুর বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)। পরে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল নতুন ১২টি দলের সংযুক্তির মাধ্যমে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে থাকা চারদলীয় জোট কলেবরে বেড়ে দাঁড়ায় ১৮-দলীয় জোটে। এরপর জোটের পরিধি দাঁড়ায় ২০ দলে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত