করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে প্রায় দেড় বছর ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকাকালে বাগেরহাটে তিন হাজারের বেশি বাল্যবিয়ে হয়েছে। জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। গত ১২ সেপ্টেম্বর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর শিক্ষার্থী উপস্থিতি উদ্বেগজনক হারে কমে যাওয়ায় অনুসন্ধান চালায় জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস। তাদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে করোনাকালীন দেড় বছরে জেলার ৩১৯টি মাধ্যমিক স্কুলের ৩ হাজার ২০২ জন শিক্ষার্থীর বাল্যবিয়ে হয়েছে। উপকূলীয় এ জেলায় এত সংখ্যক শিশু শিক্ষার্থীর বাল্যবিয়ে হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সামাজিক সংগঠনগুলো। এসব শিশুর তালিকা তৈরি করে অবিলম্বে তাদের কাউন্সেলিং করতে প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েছে তারা।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস বলছে, বাগেরহাট সদর উপজেলায় ৪৯৭ জন, ফকিরহাটে ৩৯১ জন, মোল্লাহাটে ৩৪৪ জন, চিতলমারীতে ৪০৭ জন, কচুয়ায় ৫১৬ জন, রামপালে ২৩৭ জন, মোংলায় ২১৮ জন, মোরেলগঞ্জে ৩৫৫ জন এবং শরণখোলায় ২৩৭ জন শিশু শিক্ষার্থীর বাল্যবিয়ে হয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ১২ সেপ্টেম্বর সব মাধ্যমিক স্কুল খুলে দেওয়ার পর শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি উদ্বেগজনক হারে কম দেখতে পায় কর্তৃপক্ষ। তখন আমরা শিক্ষার্থীদের খোঁজ-খবর নিতে শুরু করি। খোঁজ নিতে গিয়ে দেখি অসংখ্য শিশু শিক্ষার্থীর বাল্যবিয়ে দিয়ে দিয়েছে। দারিদ্র্য, অসচেতনতার কারণে এসব বিয়ে হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পারছি। আমরা এসব পরিবারের অভিভাবকদের তালিকা করে তাদের কাউন্সেলিং করে স্কুলবিমুখ শিশুদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিচ্ছি। প্রত্যেক উপজেলায় বাল্যবিয়ের শিকার মেয়েদের প্রকৃত তালিকা তৈরি করতে কমিটি করে দেওয়া হয়েছে।’
বাগেরহাট নারী উন্নয়ন ফোরামের সভাপতি রিজিয়া পারভীন বলেন, ‘অল্প বয়সে এসব মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যাবে। দাম্পত্য কলহ তৈরি হবে। নির্যাতন হবে। এসব সমস্যা চিহ্নিত করতে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের একটি পরিপূর্ণ তালিকা দরকার। ওই তালিকা ধরে বিয়ে হয়ে যাওয়া মেয়ে ও তাদের অভিভাবকদের ভালোভাবে কাউন্সেলিং করতে হবে। বিয়ে হয়ে যাওয়া মেয়েদের শিক্ষায় ফিরিয়ে আনতে পারলে সমস্যা উত্তরণের পথ সুগম হতে পারে।’
বাগেরহাট সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক চৌধুরী আবদুর রব বলেন, ‘অসচেতনতা, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব ও দারিদ্র্যের কারণে এসব বাল্যবিয়ে হয়েছে। এসব মেয়ের বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে ভালো মোটিভেশন দিতে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের এগিয়ে আসতে হবে।’
এদিকে গতকাল শিশু দিবসের এক অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আজিজুর রহমান এ বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, বিয়ে হয়ে যাওয়া ওই শিশুদের আবার কীভাবে স্কুলে ফিরিয়ে আনা যায় সেজন্য সবাই কাজ করছে। বিয়ে হয়ে যাওয়া শিশু ও তাদের অভিভাবকদের কাউন্সেলিং করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, করোনাকালীন সময়ে অনেক শিশু পড়ালেখা ছেড়ে শিশুশ্রমে জড়িয়েছে। ঝরেপড়া শিশুদের কীভাবে আবার শিক্ষায় ফিরিয়ে আনা যায় তার জন্য শিক্ষা অফিস ও সংশ্লিষ্ট ম্যানেজিং কমিটিকে তালিকা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
