বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী এক ব্যক্তি একাধিক প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হতে পারবেন না। ২০০৯ সালে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আদেশ অনুযায়ী, প্রকল্পের ব্যয়ের আকার ৫০ কোটি টাকার বেশি হলেই একজন পূর্ণকালীন পিডি নিয়োগ দিতে হবে। এ বিষয়টি যথাযথভাবে না মানায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে সরকারপ্রধান কঠোর নির্দেশনাও দেন। কিন্তু এতেও খুব একটা কাজ হচ্ছে না। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) এমন দুজন প্রকৌশলী ও একজন কর্মকর্তা আছেন যাদের হাতে প্রায় সব বড় প্রকল্পের দায়িত্ব। তারা মূল দায়িত্বের বাইরেও একাধিক বড় প্রকল্পের পিডি হয়েছেন এমন তথ্য পাওয়া গেছে। আবার আরও কয়েকটি বড় প্রকল্পের দায়িত্ব নিয়েও কাজ করে যাচ্ছেন। এখানে মানা হয়নি প্রকল্পের পিডি নিয়োগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের বিধি-বিধানটিও। তবে ডিএসসিসির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কর্তৃপক্ষ পিডি হিসেবে দায়িত্ব দিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছে। আবার অন্য প্রকল্পগুলোতে পিডি নয়, আপাতত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন তারা।
তিন কর্মকর্তার হাতে সব বড় প্রকল্প : ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. খায়রুল বাকেরের মূল দায়িত্ব পরিবেশ সার্কেলে। তিনি এ দায়িত্বের পাশাপাশি ডিএসসিসির ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক-নর্দমা ও ফুটপাত শীর্ষক ৮১৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের পিডি। একই সঙ্গে ১০৩ কোটি টাকার ডিএসসিসির এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প, ৯৭৩ কোটি টাকার খাল সংস্কার ও উন্নয়ন এবং ৬০০ কোটি টাকার ‘আদি বুড়িগঙ্গা চ্যালেন পুনরুদ্ধার ও দৃষ্টিনন্দন’ প্রকল্পের দায়িত্বও রয়েছে ওই প্রকোশলীর হাতে।
ডিএসসিসির আরেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুন্সি মো. আবুল হাশেমের মূল দায়িত্ব সংস্থাটির সিভিল সার্কেলে। এরপর তিনি হয়েছেন ডিএসসিসির সবচেয়ে বড় প্রকল্পের পিডি। প্রায় হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পের সঙ্গে তিনি বর্তমানে ২১৫ কোটি টাকার ‘প্রতি ওয়ার্ডে সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প’ ও ১৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে হাতে নেওয়া ‘কমিউিনিটি সেন্টার নির্মাণ প্রকল্পের’ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
এছাড়া ডিএসসিসিরি নগর পরিকল্পনাবিদ মো. সিরাজুল ইসলামের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। এ কর্মকর্তা মূলত করপোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ হলেও প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের পদটিও দীর্ঘদিন নিজের কব্জায় রেখেছেন। এরপর তিনি ৩৯০ কোটি টাকার ‘ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রজেক্ট’ (ডিসিএনইপি) প্রকল্পেরও পিডির দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে ডিএসসিসির হাতে নেওয়া সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যানের মতো বিশাল আকারের কর্মযজ্ঞের কাজটিও এ কর্মকর্তার হাতে।
এক ব্যক্তি একাধিক প্রকল্পের পিডি হওয়ার সুযোগ নেই : সরকারের বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী একাধিক প্রকল্পে এক কর্মকর্তাকে পিডির দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ নেই। ২০০৯ সালে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে জারি পরিপত্রের ১৬(৩৬) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘৫০ কোটি টাকার বেশি প্রকল্পে একজন পূর্ণকালীন পিডি নিয়োগ করতে হবে। ১৬(৩৭) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘এক কর্মকর্তাকে একাধিক প্রকল্পের পিডির দায়িত্ব দেওয়া যাবে না।’ এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একাধিকবার বলা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একপর্যায়ে চলতি বছর ৩ ফেব্রুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ‘একজন ব্যক্তি একাধিক প্রকল্পের পিডি হওয়ার বিষয়টি আর সহ্য করা হবে না’ মর্মে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন সরকারপ্রধান। এমনকি যারা একাধিক প্রকল্পের পিডির দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
পিডি নিয়োগে ৮ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি : পিডি নিয়োগে নৈরাজ্য ঠেকাতে ২০১৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি একটি অফিস আদেশ জারি করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। সেখানে পিডি নিয়োগের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ আদেশ অনুযায়ী প্রকল্পের পিডি নিয়োগ করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে একটি সভা আহ্বান করে সেখানে তিনজন দক্ষ কর্মকর্তাকে বাছাই করতে হবে। পরে এ তিনজনের জীবন বৃত্তান্ত ছক আকারে পিডি নিয়োগসংক্রান্ত কমিটিতে পাঠাতে হবে। পিডি নিয়োগের জন্য সরকার আট সদস্যের উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করে। সেখানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবকে সভাপতি করে সদস্য করা হয়েছে পরিকল্পনা বিভাগের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধি, আইএমইডির প্রতিনিধি, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, অর্থ বিভাগের প্রতিনিধি, ইআরডির প্রতিনিধি, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থার প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধিশাখা প্রধানকে সদস্য সচিব করা হয়েছে। এ আদেশের ৪.১ অনুযায়ী এ কমিটির সুপারিশ ছাড়া কোন প্রকল্পের পিডি নিয়োগ করা যাবে মর্মে বলা হয়েছে। কিন্তু ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট একাধিক প্রকৌশলী জানান, সরকারের এ দিক-নির্দেশনা না মেনে অনেককে প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একজন পিডি একাধিক প্রকল্পের দায়িত্বে থাকলে কাজ যথাসময়ে ও যথাযথভাবে করা তার পক্ষে সম্ভব হয় না। ফলে প্রকল্পের সময় ও খরচ বেড়ে যায়। উদাহরণ টেনে ডিএসসিসির প্রকৌশলীরা বলেন, ‘খাল পুনরুদ্ধার, সংস্কার ও নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি’ নামের একটি প্রকল্পে জন্য ৯৭৩ কোটি টাকা সরকারের কাছে প্রস্তাব করেছে ডিএসসিসি। প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় বাড়তি ব্যয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি এর সদুত্তর দিতে পারেননি। এ কাজে দক্ষিণ সিটির কত টাকা খরচ হতে পারে বা আগে কত খরচ হয়েছে তা যাচাই-বাছাই ছাড়াই প্রকল্পটি তৈরি করা হয়েছে। খায়রুল বাকের নামে যে প্রকৌশলী এ প্রকল্প তৈরি করেছেন তিনি আরও বড় কয়েকটি প্রকল্পের দায়িত্বে রয়েছেন। ফলে মাঠে না গিয়ে তড়িঘড়ি করে এ প্রকৌশলী প্রকল্প তৈরি করায় সভায় ডিএসসিসির ভাবমূর্তিও ক্ষুন্ন হয়েছে। এমন ঘটনা ঘটেছে ডিএসসিসির ‘ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রজেক্ট’ (ডিসিএনইপি) প্রকল্পের পিডি সিরাজুল ইসলামের ক্ষেত্রেও। দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এ প্রকল্পের আরেকটি অংশ রয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি)। সেখানে যে পরিমাণ কাজের অগ্রগতি আছে সেই তুলনায় ডিএসসিসিতে নেই। ফলে ডিএসসিসি অংশের পিডির বিষয়ে ইতিমধ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করে চিঠিও দিয়েছে।
এসব বিষয়ে কথা বলতে ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খায়রুল বাকের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি মূল দায়িত্বের বাইরে পিডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। তবে তা কর্তৃপক্ষ নিয়োগ দিয়ে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছে। আবার অন্য প্রকল্পগুলোর পিডি নয়, আপাতত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি।’
এ বিষয়ে একাধিক প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা মো. সিরাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি মূলত নগর পরিকল্পনাবিদ। এখানে আমাকে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আমি ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রজেক্ট (ডিসিএনইপি) প্রকল্পের দায়িত্বে আছি। আর নতুন করে সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান যেটি আছে সেটির দায়িত্বে আছি।’
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুন্সি মো. আবুল হাশেমের বক্তব্য জানতে মোবাইলে ফোন করা হলে তিনি ধরেননি।
