অনেক ঘটনার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশেষে সোশ্যাল মিডিয়ার জগতে প্রবেশ করছেন। নানা চড়াই-উৎরাইয়ের পর ট্রাম্প গত বুধবার রাতে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ গঠনের ঘোষণা দিলেন। তার ভাষায়, এটি ‘বিগ টেকের’ (ফেইসবুক, টুইটার ইত্যাদি) অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোরই এক প্রচেষ্টা। এ সাইটের পোস্টগুলোকে বলা হবে ‘টুইট ট্রুথ’। ট্রাম্প বলেন, তিনি খুব শিগগিরই ট্রুথ সোশ্যালে নিজের চিন্তাভাবনা শেয়ার করতে এবং বিগ টেকের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারবেন বলে উচ্ছ্বসিত।
এটি একটি অন্য রকমের ভয়ংকর ধারণাযা প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায় ব্যর্থ হবে। আর এর পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ :
প্রথমত, টুইটার ইতিমধ্যে বিদ্যমান। চাকা জিনিসটা নতুন করে উদ্ভাবনের প্রয়োজন নেই, এটা বলার কি দরকার আছে কোনো? হ্যাঁ, টুইটার ইতিমধ্যেই বিদ্যমান আর তার রয়েছে ২০ কোটিরও বেশি ব্যবহারকারী। কাজেই এখনই আরেকটি মাইক্রো-ব্লগিং ওয়েবসাইটের জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশেষ কোনো আগ্রহ নেই। যদিও টুইটার নিখুঁত নয়। তারপর আছে এ বিষয়টি : ট্রাম্প তার প্রথম টুইটটি করেন ২০০৯ সালের ৪ মে। (এতে বলা হয় : লেট নাইট উইথ ডেভিড লেটারম্যান তার শোতে ‘টপ টেন লিস্ট টু নাইট’ উপস্থাপনের সময় ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেখতে ভুলবেন না।) এর মানে দাঁড়ায়, ২০১৫/২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট পদে লড়তে আগ্রাসীভাবে অনলাইনে নামার আগে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে নিজের উপস্থিতি গড়ে তোলার জন্য তিনি দীর্ঘ ছয় বছর সময় পেয়েছিলেন। অসংখ্য অনুসারীর কাছে তিনি ছিলেন সুপরিচিত ‘ব্র্যান্ড’ বা ‘পণ্য’। তাকে গোড়া থেকেই শুরু করতে হয়নি। কিন্তু ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এর ক্ষেত্রে তা-ই করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, রক্ষণশীলদের সামাজিক পরিসর ভিড়াক্রান্ত (এবং তা খুব ভালো করছে না) : ‘পার্লার’ কীভাবে রক্ষণশীলদের জন্য নতুন টুইটার হয়ে উঠেছিল মনে আছে? ইউএস ক্যাপিটলে ৬ জানুয়ারির দাঙ্গার (এবং টুইটারের ট্রাম্পকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া) পরিপ্রেক্ষিতে ডাউনলোড খুব অল্প সময়ের জন্য বৃদ্ধি পাওয়ার পর অ্যাপটি প্রাসঙ্গিকতার বিচারে কার্যত হারিয়েই যায়। ‘দ্য ভার্জ’-এর জুলাই মাসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সেন্সর টাওয়ার’-এর তথ্য অনুসারে, পার্লারের ডাউনলোড ২০২০ সালের ডিসেম্বরের ৫ লাখ ১৭ হাজার থেকে ২০২১-এর জুন মাসে ১১ হাজারে নেমে আসে। এরপর আসুন Gettr-এর কথায়। এটি টুইটারেরই এক ক্লোনযা চালু করেন ট্রাম্পের সহযোগী জেসন মিলার। উদ্বোধনের কয়েক দিনের মধ্যেই হ্যাকাররা এর ৮৫ হাজার ব্যবহারকারীর ইমেইল ঠিকানা হাতিয়ে নিতে (এবং প্রকাশ করতেও) সক্ষম হয়েছিল।
টেকক্রাঞ্চ ঘোষণা করে, ‘ট্রাম্পপন্থি সাম্প্রতিকতম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম
Gettr, ইতিমধ্যেই লেজেগোবরে করে ফেলেছে।’ যদিও ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এমন কিছু আছে (ডোনাল্ড ট্রাম্প), যা পার্লার বা গেটরের মধ্যে ছিল না বা নেই। এটি এখনো স্পষ্ট নয় যে, রক্ষণশীল সামাজিক মিডিয়ার জগৎ এইসব ‘পণ্যের’ মধ্যে একটিকেও সমর্থন করার জন্য যথেষ্ট বড়তিনটি তো পরের কথা।
তৃতীয়ত, ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন আর প্রেসিডেন্ট নন। তবে ভুল করবেন না যেন! ট্রাম্প এখনো রিপাবলিকান রাজনীতির সবচেয়ে হাই প্রোফাইল এবং শক্তিশালী খেলোয়াড়। কিন্তু টুইটার, ফেইসবুক আর ইউটিউবে নিষিদ্ধ হওয়ার পর থেকে তার প্রচারণা চালানোর ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। গত এপ্রিল মাসে ওয়াশিংটন পোস্টের ফিলিপ বাম্প উল্লেখ করেছিলেন :
‘[ট্রাম্পের] গুগলে কিছু অনুসন্ধান করার আগ্রহ ২০১৫ সালের জুন থেকে এ পর্যন্ত যেকোনো সময়ের চেয়ে কম, একইভাবে তাকে টিভিতেও দেখা গেছে কম। চ্যানেলগুলো তাকে অনেক কম কভার করছিল। গত বছর করোনা মহামারী যখন ট্রাম্পকে ছাড়িয়ে জাতীয় মনোযোগ কেড়ে নিয়েছিল তার কাভারেজ সে পর্যায়ে নেমে এসেছে। পাশাপাশি, মার্চ মাসে মিডিয়ায় ট্রাম্পকে উল্লেখ করার গড় হার ২০১৫ সালের নভেম্বরের স্তরে নেমে এসেছে।’
প্রেসিডেন্ট পদ থেকে বিদায়ের পর ট্রাম্প ঘটা করে নিজের ব্লগ চালুর উচ্চাভিলাষী মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করলেও গত জুন মাসে তার অঙ্কুর নীরবেই ঝরে পড়ে। বন্ধ হয়ে যায় চিরতরে। নিউ ইয়র্ক টাইমস জুন মাসে লিখেছিল :
‘সাবেক প্রেসিডেন্টের চিন্তাভাবনার খোঁজ রাখেন এমন একজনের মতে, সাইটটি কম ট্রাফিক পাচ্ছে এবং এতে তাকে ক্ষুদ্র ও অপ্রাসঙ্গিক দেখায়বন্ধুদের কাছ থেকে এ কথা শুনে ট্রাম্প হতাশ হয়ে পড়েছিলেন।’
‘সাইটটি তৈরি করতে কয়েক হাজার ডলার খরচ হয়। এটি তৈরি করেছিল ট্রাম্পের সাবেক নির্বাচনী প্রচারাভিযান ব্যবস্থাপক ব্র্যাড পারস্কেলের কোম্পানি। সাইটটি চালু করার উদ্দেশ্য ছিল সমর্থকদের কাছে ট্রাম্পের বক্তব্য-বিবৃতি তুলে ধরা ও তার সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া।’
পুনশ্চ: কিছু লোক ট্রাম্পের সবকিছুই অনুসরণ করবে। কিন্তু তাদের দলটি একটি সফল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম চালু করার জন্য যথেষ্ট বড় নয়। এমনকি তার ধারেকাছেও নয়।
লেখক : সিএনএনে এডিটর অ্যাট লার্জ সিএনএন অনলাইন থেকে
ভাষান্তর : আবু ইউসুফ
