শিক্ষার বাইরে বস্তির লাখো শিশু, জড়াচ্ছে অপরাধে

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২১, ০১:৪৯ এএম

আট বছরের শিশু সালমান ঢাকার ধানমন্ডিতে ভিক্ষা করে। তার দুই বোন রিমা-রিতাও ভিক্ষুক। থাকে রায়েরবাজার বেড়িবাঁধ এলাকার একটি বস্তিতে। বাবা আরেক নারীকে বিয়ে করে চলে যাওয়ার পর মা প্লাস্টিক কুড়িয়ে সংসারের হাল ধরেন। কিন্তু তাতে কুলিয়ে উঠতে না পেরে স্কুলে পাঠানোর বদলে ছেলেমেয়েদের পাঠান ভিক্ষা করতে।

সালমান, রিমা ও রিতার মতো রাজধানীর বস্তিতে বাস করে এমন লাখো শিশু শিক্ষার আলোবঞ্চিত। সরকারের নানা উদ্যোগের পরও তাদের বিদ্যালয়ে আনা যাচ্ছে না। আবার এলেও প্রাথমিকের গণ্ডি পার হওয়ার আগেই ঝরে পড়ছে অনেকে। পরে এ শিশুরা জড়াচ্ছে ভিক্ষা, প্রতারণা কিংবা মাদক কারবারসহ ভয়াবহ নানা অপরাধে। ফলে বাড়ছে খুনোখুনি, হামলা-মামলার ঘটনা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে দেড় বছর স্কুল বন্ধ থাকার কারণে এ হার দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শহরের বস্তি এলাকায় পাঠদানের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মীরা বলেছেন, বস্তির শিশুদের শিক্ষাদান কৌশল, ব্যবস্থাপনা ও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার মোটা দাগে অভাব রয়ে গেছে। এ কারণে সরকারি-বেসরকারি চেষ্টা সত্ত্বেও সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে না। এ বিষয়ে চিফ অব পার্টি আউট অব চিলড্রেন ব্র্যাক এডুকেশন প্রোগ্রামের মাহমুদ হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, দারিদ্র্যের কারণে বস্তির শিশুদের বড় অংশ ঝরে যায়। এসব বাচ্চার জন্য স্পেশাল কেয়ার এডুকেশন প্রয়োজন। কিন্তু এর জন্য যা যা প্রয়োজন তার সবটারই অভাব রয়েছে। অভিভাবক চাইলেও বাচ্চাদের স্কুলে রাখতে পারেন না। এর সঙ্গে রয়েছে সামাজিক নানা অপরাধ। এতসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে শিক্ষাদানের জন্য সরকারের বিশেষভাবে পরিকল্পনা থাকতে হবে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৬টি। এসব বিদ্যালয়ে মোট ৪ কোটি ২৭ লাখ ৫২ হাজার ১৫৮ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। অধিদপ্তরের ২০১৯ সালের বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারি অনুযায়ী, প্রতি বছর দেড় কোটির বেশি শিক্ষার্থী স্কুলে যাওয়ার উপযোগী হয়। ওই প্রতিবেদনে ভর্তির বয়সে কত শিশু বিদ্যালয়ে যাচ্ছে না সেই তথ্য নেই। তবে জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের হিসাবে বাংলাদেশে প্রায় অর্ধকোটি শিশু ও কিশোর-কিশোরী যাদের বয়স ৬ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে, যারা স্কুলের বাইরে থেকে যাচ্ছে। এদের মধ্যে একটা বড় অংশ প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার আগেই ঝরে পড়ে।

সরকারি হিসাবে প্রাথমিকের গণ্ডি শেষ করতে পারে না দেশে এমন শিক্ষার্থী ২০ শতাংশ। করোনায় দেড় বছর বন্ধ থাকার পর বিদ্যালয় খুলে দেওয়া হলে আরও অন্তত ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত বলে সম্প্রতি জানিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।

মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধসংলগ্ন বুদ্ধিজীবী বস্তি। এর আশপাশে কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। বস্তিবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, করোনার আগে বেশ কয়েকটি এনজিও কয়েকটি স্কুল পরিচালনা করত। সে সময় স্কুলে যাওয়ার উপযোগী শিশুরা বিদ্যালয়ে প্রায় সবাই ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু করোনায় টানা দেড় বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার সময়ে নানা উপায়ে স্কুল পরিচালনা করার চেষ্টা করে এনজিওগুলো। কিন্তু বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই পাকাপাকি পড়াশোনা ছেড়ে দিলে স্কুল বন্ধ করে দেয় তারা।

অভিভাবকরা জানান, বিদ্যালয় না থাকায় ভর্তির উপযোগী শিশুরা স্কুলে যেতে না পেরে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ছোট ছোট শিশুরা মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে। বুদ্ধিজীবী বস্তিতে অন্তত ৫০ জন শিশু রয়েছে যারা বিদ্যালয়ে ভর্তির উপযোগী। ওই বস্তিতেই থাকে সালমান, রিমা ও রিতা। তাদের মা সালমা খাতুন বলেন, ‘ভাঙাড়ি টোকাইয়া বাচ্চাগো খাওনই জোগাড় করতে পারি না। স্কুলে পাঠামু কেমনে।’

বস্তির আরেক বাসিন্দা জাফর আহমেদ বলেন, ‘আমার বাচ্চাটারে স্কুলে ভর্তির জন্য স্কুল খুঁইজা পাইতাছি না। সরকারি স্কুল অনেক দূরে। তাইলে বাচ্চাটারে মানুষ করব কীভাবে? দুদিন পরে দেখব আমার পোলাটা ইয়াবা-ড্যান্ডি খাইতাছে!’

বস্তির শিশুদের বিদ্যালয়ে না যাওয়া প্রসঙ্গে গণসাক্ষরতা অভিযানের উপপরিচালক কেএম এনামুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসডিজি-৪ (সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা) অর্জনে বাধা সৃষ্টি করবে। স্বাভাবিক এলাকাগুলোর সঙ্গে বস্তির পরিবেশের সামঞ্জস্য নেই। ফলে এখানে বিশেষ শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে হবে।’

মাদকের ছোবল : রায়েরবাজার থেকে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ পর্যন্ত বস্তিগুলোতে দেখা যায়, এখানে মানুষের বসবাসের ন্যূনতম পরিবেশ নেই। ঘিঞ্জি বস্তিতে টয়লেট, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা খুবই নাজুক। হালকা বৃষ্টিপাতে তলিয়ে যায় বস্তির ঘর। এই প্রতিবেদক যাদের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রায় সবাই বস্তিতে শিশু শিক্ষার প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে উল্লেখ করেছেন মাদকের ভয়াবহতা।

এসব বস্তিকে কেন্দ্র করে ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইনসহ নানা মাদকদ্রব্য বিক্রি কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে বলে জানিয়েছেন বস্তিবাসী। মাদক বিক্রেতা বাবা-মায়ের পাল্লায় পড়ে স্কুলগামী শিশুরাও এ কাজে জড়িয়ে পড়ছে। এমনকি বাবা-মা, সন্তান একসঙ্গে মাদক গ্রহণ করে বলেও বস্তিবাসীরা জানান। মাদকসেবী শিশু-কিশোরদের পাল্লায় পড়ে অন্য শিশুরাও আসক্ত হয়ে পড়ছে। এভাবে একসময় বিদ্যালয়ে যাওয়া ছেড়ে দেয় শিশুরা।

মরিয়ম বেগম নামে এক নারী বলেন, ‘একজনের পাল্লায় পইড়্যা আরেকজন নষ্ট হইতাছে। প্রতিদিন পুলিশ আইস্যা ঘরে ঢুইক্যা ধইর‌্যা নিয়া যায়। টাকা নিয়া রাস্তা থেইক্যা ছাইড়্যা দেয়। আমাগো পোলা মাইয়া মানুষ হইবো ক্যামনে?’

দারিদ্র্যের প্রকোপে পথহারা : বস্তিবাসীরা জানান, তারা যে আয় করেন তার প্রায় অর্ধেক ব্যয় হয় ঘরভাড়ায়। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধিজনিত কারণে একজনের আয়ে সংসার চালাতে পারে না। বাধ্য হয়ে স্বামী-স্ত্রী দুজনই আয়ের পথ বেছে নেয়। এ অবস্থায় শিশুরা বেশি বিপথে চলে যাচ্ছে।

ঝরে পড়া শিশুরা কিশোর গ্যাংয়ে : এলাকাবাসী জানান, বস্তির আতঙ্কের নাম কিশোর গ্যাং। প্রত্যেকটি বস্তিতে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র ভয়াবহ তাণ্ডব চালাচ্ছে। স্কুলের ঝরে পড়া শিক্ষার্থীরাই মূলত এসব গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়েছে। করোনায় স্কুল বন্ধ থাকায় এদের সংখ্যা বেড়ে যায়। কথায় কথায় দা, ছুরি, চাপাতি নিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর হামলে পড়ে তারা। গত ২৫ দিনে রায়েরবাজার এলাকায় এরকম ১৫টি হামলা-প্রতিহামলার ঘটনার খোঁজ পাওয়া গেছে। কিশোরদের হামলায় প্রায়ই মারা যাচ্ছে প্রতিপক্ষের লোকজন। বস্তিতে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তারসহ নানা কারণে এসব হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিরীহ মানুষ।

জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলমগীর মূহাম্মদ মুনসুরুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঝরে পড়া শিশুদের জন্য সরকার উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মাধ্যমে একটি প্রকল্প নিয়েছে। এছাড়া সরকারি সহায়তায় এনজিওগুলো স্কুল পরিচালনা করছে। বস্তি অন্য স্বাভাবিক এলাকার মতো নয়। তাই এখানে সাফল্য পেতে হলে সময় লাগবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত