সরকারি চাকরিজীবীদের জিপিএফ (সাধারণ ভবিষ্যৎ তহবিল) মুনাফা হার কমিয়েছে সরকার। চলতি অর্থবছর থেকে স্ল্যাবভিত্তিক মুনাফা দেওয়া হবে। অর্থবছরের শুরুতে প্রারম্ভিক স্থিতি ১৫ লাখ টাকা হলে ১৩ শতাংশ হারে মুনাফা পাওয়া যাবে। স্থিতি ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত ১২ শতাংশ এবং ৩০ লাখ টাকার বেশি প্রারম্ভিক স্থিতির জন্য ১১ শতাংশ হারে মুনাফা পাওয়া যাবে। গত বৃহস্পতিবার এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এর আগে অর্থাৎ ১ জুলাই এর পূর্ব পর্যন্ত জিপিএফে মুনাফার হার ছিল ১৩ শতাংশ। সরকারি চাকরিজীবীরা জিপিএফে টাকা জমা রাখেন। তবে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও করপোরেশনের চাকরিজীবীরা সিপিএফে টাকা জমা রাখেন। সিপিএফের সুদহার তুলনামূলক কম।
স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা এবং করপোরেশনের মতো সিপিএফভুক্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সঙ্গতি এক রকম না হওয়ায় স্ল্যাবভিত্তিক মুনাফা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সরকারি চাকরিজীবীরা জানিয়েছেন, এই স্ল্যাবভিত্তিক মুনাফা নির্ধারণের ফলে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এতে তাদের বিপদের দিনের পুঁজিতে হাত পড়বে। কারণ চাকরিজীবীরা বিপদের দিনে এ তহবিল ব্যবহার করেন। মাসে মাসে বেতন থেকে তারা এ তহবিলে টাকা জমা করেন। গত অর্থবছরের শেষ দিন পর্যন্ত সরকারি চাকরিজীবীরা ১৩ শতাংশ হারে মুনাফা পেয়েছেন। এখন সেটা ১১ শতাংশে নেমে এসেছে। দশম গ্রেডের একজন কর্মকর্তার জিপিএফে ৪০ লাখ টাকা জমা থাকলে তিনি বছরে ৮০ হাজার টাকা কম মুনাফা পাবেন। ৫ বছরে এ মুনাফা ৪ লাখ টাকা কমে যাবে।
সরকারের মন্ত্রীরা কর্মচারীদের বিভিন্ন সমাবেশে বলেন, বর্তমান সরকার কর্মচারীবান্ধব। এই সরকারই শতভাগ বেতন বাড়িয়েছে। বিভিন্ন কর্মচারী সংগঠনের নেতারা বলছেন, জিপিএফের মুনাফা কমানোয় সরকারের এ দাবি করার আর কোনো যুক্তি থাকবে না। সরকারের এ সিদ্ধান্তে সব শ্রেণির সরকারি কর্মচারী ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এতে করে চাকরিজীবীদের পারবারিক সংকট বাড়বে, কর্মস্পৃহায় ভাটা পড়বে। কর্মচারীদের অবসর জীবনে আর্থিক নিশ্চয়তা থাকবে না। সুযোগসন্ধানী আমলারা সরকারকে ভুল পথে পরিচালনা করছে।
অবসর জীবনে পেনশনের পর নিজের জমানো টাকার ক্ষেত্রে জিপিএফই হচ্ছে সবচেয়ে বড় খাত। এই খাতের মুনাফা কমালে কর্মচারীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
কর্মচারীদের চাকরি স্থায়ী হওয়ার পর বেতন থেকে সর্বনিম্ন ৫ শতাংশ জমা রাখা বাধ্যতামূলক। তারা সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত জমা রাখতে পারেন। ২০১৫ সালের বেতন কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে বেতনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ রাখার নিয়ম করা হয়েছে। এর আগে কর্মচারীরা এ ফান্ডে ইচ্ছেমতো টাকা জমা রাখতে পারতেন। এই ফান্ড থেকে কর্মচারীরা ঋণ নিতে পারেন। এ ঋণের ওপর সাধারণত কোনো সুদ দিতে হয় না। শুধু নির্ধারিত কিস্তির বাইরে এক কিস্তি অতিরিক্ত দিতে হয়, যা নিজের হিসাবেই জমা থাকে। কর্মচারীর বয়স ৫২ বছর পূর্ণ হলে জমাকৃত অর্থের ৮০ শতাংশ তুলতে পারেন। আর পিআরএল শুরু হলে জমাকৃত সমুদয় অর্থ তুলতে পারেন। চাকরির মেয়াদ দুই বছর পূর্ণ হওয়ার পর এ তহবিলে যোগদান করা বাধ্যতামূলক। তবে দুই বছরের আগেও যোগ দেওয়া যায়। পরিবারের সদস্য নয়, এমন কাউকে নমিনি মনোনয়ন দেওয়া যায় না। তবে অবিবাহিত হলে পিতা, মাতা, ভাই বা বোনকে নমিনি করা যায়।
জিপিএফ ফান্ড থেকে অগ্রিম উত্তোলনের জন্য নিজের অফিসে আবেদন করতে হয়। কর্তৃপক্ষ তা হিসাবরক্ষণ অফিসে পাঠায়। এরপর জিপিএফ অ্যাকাউন্টস থেকে তা পরিশোধ করা হয়। নিজের বা তার ওপর নির্ভরশীল কারও চিকিৎসার জন্য অগ্রিম তোলা যায়। কর্মচারীর ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তির শিক্ষার জন্য, বাসগৃহ নির্মাণ, বিয়ে, হজ বা তীর্থ যাত্রা, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, জীবনবীমার কিস্তি বা মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যয়ের জন্য অগ্রিম তোলা যায়। অর্থবছরের শুরুতে জিপিএফের চাঁদা কমানো বাড়ানো যায় না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন চাকরিজীবী জানিয়েছেন সর্বশেষ পে-কমিশনের সুপারিশে চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির কথা বলা হয়। কিন্তু নতুন পে-স্কেলে একদিকে সুবিধা বেড়েছে, অন্যদিকে সুবিধা কেটে নেওয়া হয়েছে। দুইয়ের সমন্বয়ে চাকরিজীবীদের খুব একটা লাভ হয়নি। ফরাসউদ্দিন কমিশনের সুপারিশের আগে চাকরিজীবীরা টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড পেত। চাকরির শুরু থেকে ৮, ১২ এবং ১৫ বছরের পূর্তিতে তিনটি টাইমস্কেল পাওয়া যেত। পদোন্নতির সুযোগ না থাকার কারণে উচ্চতর স্কেলে একটা সিলেকশন গ্রেড পাওয়া যেত। ফরাসউদ্দিন কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে এটা বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারি চাকরিজীবীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এরপর গত ২১ সেপ্টেম্বর সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমায় সরকার, যা অবসরে যাওয়া সরকারি চাকরিজীবীদের অন্যতম আয়ের উৎস।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সচিবালয়ে কর্মরত একজন কর্মচারী সংগঠনের নেতা জানিয়েছেন, কম্পিউটার অপারেটর, সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর এবং ডাটা এট্রি অপারেটরএ তিনটি পদে বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সাপেক্ষে দুই স্কেল ওপরে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেতন নির্ধারণী সুবিধা বন্ধ করা হয়েছে। এর ফলে কর্মচারীদের খুব একটা লাভ হয়নি। এই অবস্থায় চাকরিজীবীরা স্থায়ী পে-কমিশনের আশা করেছিল। কিন্তু প্রতিশ্রুতি থাকার পরও সরকার স্থায়ী পে-কমিশন করতে পারেনি। এই অবস্থায় দ্রুত নতুন বেতন কমিশন গঠন করে চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি করা জরুরি বলে জানান তিনি।
তৃতীয় শ্রেণি সরকারি কর্মচারী সমিতির সভাপতি লুৎফর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অবসরের পর চাকরিজীবীরা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। অবসরের পর যা পাই তার ওপরই আমাদের নির্ভর করতে হয়। আমাদের অনুরোধ জিপিএফের আগের হার অর্থাৎ ১৩ শতাংশ মুনাফা বহাল রাখা হোক। ওই হার বহাল রাখা হলে কর্মচারীদের মধ্যে যে ক্ষোভ বা হতাশা বিরাজ করছে তা থেকে সবাই পরিত্রাণ পাবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে লুৎফর রহমান বলেন, ‘২০১৫ সালের পে-স্কেলের পর মুদ্রাস্ফীতি অনেক বেড়েছে। বেতন বৃদ্ধির পর সব পণ্যের দাম বেড়েছে, সরকারও সময়ে সময়ে এসব পণ্যের দাম পুনর্নির্ধারণ করেছে। ভোজ্য তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। বেতনের ৫ শতাংশ হারে বছরে যা বাড়ে সেই তুলনায় পণ্যের দাম অনেক বেশি বেড়েছে। আমাদের মতো সীমিত আয়ের মানুষদের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় নতুন একটি পে-কমিশন গঠন করে নতুন পে-স্কেল সময়ের দাবি।’
