রংপুরের পীরগঞ্জে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী হামলার অন্যতম হোতা মো. সৈকত ম-ল ও তার সহযোগী মো. রবিউল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র্যাব-১৩-এর একটি দল শুক্রবার রাতে টঙ্গী এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করেছে।
গতকাল শনিবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাবের অস্থায়ী মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছেন র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
তিনি জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার সৈকত ও রবিউল পীরগঞ্জের সাম্প্রদায়িক হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে গ্রেপ্তার সৈকতকে রংপুরের একটি কলেজের শিক্ষার্থী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে র্যাব কর্মকর্তা কমান্ডার খন্দকার মঈন আলী জানান, সৈকত মন্ডল ও তার সহযোগীদের মাধ্যমে অরাজকতা তৈরি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের উদ্দেশ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে অপপ্রচার চালানো হয়। মাইকিং করে হামলাকারীদের জড়ো করা হয়। তাদের অপপ্রচারের কারণেই স্থানীয় জনসাধারণ উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। পরে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
তিনি আরও জানান, সৈকতের নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন সরাসরি হামলায় অংশ নেয়। তারা হিন্দুদের বাড়িঘর, দোকানপাট ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। তার আগে সৈকতের নির্দেশনাতেই রবিউলকে মাইকিং করে লোকজন জড়ো করতে বলা হয়। এরপর তাদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তথ্য আসা শুরু করলে তারা বাঁচার জন্য আত্মগোপন করেন।
খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘গ্রেপ্তারকৃতরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অরাজকতা তৈরি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের লক্ষ্যে হামলা-অগ্নিসংযোগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার এবং মাইকিং করে হামলাকারীদের জড়ো করেন বলে জানিয়েছেন। গ্রেপ্তার সৈকত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক, বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যাচারের মাধ্যমে স্থানীয় জনসাধারণকে উত্তেজিত করে তোলেন। এ ছাড়া তিনি ওই হামলা ও অগ্নিসংযোগে অংশগ্রহণে জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করেন।
সৈকত মন্ডল ছাত্রলীগের কোনো পদে ছিলেন কিনা জানতে চাইলে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক বলেন, সৈকত রংপুরের একটি ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী। রংপুরে ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে নিজে প্রচার করতে পারেন কিন্তু তার কোনো রাজনৈতিক পোস্ট-পদবি ছিল না। রাজনৈতিক কর্মকান্ডে তার কোনো সম্পৃক্ততাও আমরা পাইনি।
তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সৈকত মণ্ডল রংপুর কারমাইকেল কলেজের দর্শন বিভাগ শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি ছিলেন। সাম্প্রদায়িক হামলায় উসকানির অভিযোগ ওঠার পর তাকে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এ ছাড়া সৈকতের দাদা আবুল হোসেন মণ্ডল পীরগঞ্জের রামনাথপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এবং তার চাচা রেজাউল করিম রামনাথপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ৬ নম্বর ইউনিটের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সৈকত ও তার পরিবারের সদস্যদের রাজনৈতিক পরিচয় প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রংপুর মহানগর শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আসিফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে জানান, ১৮ অক্টোবর পীরগঞ্জের হিন্দুদের বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সরাসরি অংশগ্রহণের প্রমাণ পাওয়ায় দর্শন বিভাগ শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতির পদ থেকে সৈকতকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই অভিযোগে কারমাইকেল কলেজ শাখা ছাত্রলীগের আরেক নেতা (সহসভাপতি) তানজিরুল ইসলামকেও বহিষ্কার করা হয়।
কারমাইকেল কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থী ও সংগঠনের নেতাকর্মীরা জানান, দর্শন বিভাগের ছাত্রলীগ নেতা সৈকত ম-ল আগে থেকেই সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন ছিলেন। আগেও তার ফেইসবুক থেকে ধর্মীয় উসকানিমূলক পোস্ট দেওয়ায় সহপাঠীদের সমালোচনার শিকার হন তিনি।
সৈকতের দাদা আবুল হোসেন মণ্ডল সাংবাদিকদের জানান, তিনি বঙ্গবন্ধুর আমল থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেন। এলাকায় যখন কোনো আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ছিল না, তখন তাদের পরিবার থেকেই এই দলের রাজনীতিতে যুক্ত। পীরগঞ্জে সাম্প্রদায়িক হামলায় যে-ই জড়িত থাকুক, তার শাস্তি দাবি করেন তিনি।
ফেইসবুকে জনপ্রিয়তা বাড়াতেই অপপ্রচার : গ্রেপ্তার সৈকত ফেইসবুকে জনপ্রিয়তা বাড়াতেই অপপ্রচার চালিয়েছে বলে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, র্যাব কর্মকর্তা কমান্ডার খন্দকার মঈন আলী। মূলত ফেইসবুকে ফলোওয়ার বাড়াতে ও ব্যক্তিগত ইমেজকে প্রচার করতেই ‘এই মুহূর্তে গ্রাম পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া সংবাদ, হিন্দুদের আক্রমণে এক মুসলিমকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে’ এমন উসকানিমূলক পোস্ট দেন সৈকত মন্ডল। সেই পোস্টের সূত্র ধরে হামলার ঠিক কাছাকাছি একটি মসজিদ থেকে মাইকিং করেন রবিউল ইসলাম। মাইকিংয়ে তিনি তৌহিদী জনতাসহ ধর্মপ্রাণ মানুষকে প্রতিরোধের ডাক দেন। এরপর সৈকত নিজে একটি উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে উত্তেজনাকর বক্তব্য দিয়ে হামলায় অংশ নেন।
এ বিষয়ে আল মঈন বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সৈকত ও রবিউল ওই ঘটনায় নিজেদের সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে তথ্য দিয়েছেন। তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অরাজকতা তৈরির ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের লক্ষ্যে হামলা-অগ্নিসংযোগ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার এবং মাইকিং করে হামলাকারীদের জড়ো করে।
সৈকত বিভিন্ন সময়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন উসকানিমূলক ও বিভ্রান্তিকর পোস্ট দিতেন ও শেয়ার করতেন। তার ফেইসবুক পেজে ২৭০০-২৮০০ ফলোয়ার রয়েছে। সেটিকে কাজে লাগিয়েছেন ফলোয়ার বাড়ানোর জন্য।
সম্প্রতি দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টায় কুমিল্লা, নোয়াখালী, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, ফেনী, রংপুরসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় স্বার্থান্বেষী মহলের অপতৎপরতা লক্ষ করা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক, বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির অপচেষ্টা করে চক্রান্তকারীরা। এরই ধারাবহিকতায় ১৭ অক্টোবর ফেইসবুকে ধর্মীয় অবমাননাকর পোস্টকে কেন্দ্র করে রংপুরের পীরগঞ্জের বড় করিমপুর গ্রামে দুর্বৃত্তরা বেশ কয়েকটি বাড়িঘর, দোকানপাট ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৬০টি পরিবার। এসব ঘটনায় বেশ কয়েকটি মামলা হয়। ৪১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও অনেককে আসামি করা হয়। ইতিমধ্যে এসব মামলায় ৫৮ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। যাদের মধ্যে ৩৭ জনকে গত বৃহস্পতিবার রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে র্যাব কর্মকর্তা জানান, এসব মামলার আসামি শনাক্ত ও সহিংসতার নেপথ্য ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার জন্য অনুসন্ধানে নামে র্যাবের বেশ কয়েকটি দল। একাাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হামলার হোতাদের পরিচয় জানতে পারেন তারা। সৈকত মণ্ডল, রবিউলসহ আরও বেশ কয়েকজনের তথ্য পেয়ে তাদের গ্রেপ্তার করার জন্য বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালায়। এরই ধারাবাহিকতায় র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র্যাব-১৩-এর একটি আভিযানিক দল গত শুক্রবার রাতে টঙ্গী এলাকা থেকে মো. সৈকত মন্ডল ও তার সহযোগী মো. রবিউল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে।
