এজেন্ট ব্যাংকিং

নগণ্য কমিশনে আগ্রহ হারাচ্ছেন এজেন্টরা

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২১, ১২:৪৮ এএম

শাখার বাইরে ব্যাংকিং সেবা দেওয়ায় এজেন্ট ব্যাংকিং দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও এ খাতের ঋণ বিতরণ খুবই কম। ফলে আমানত ও রেমিট্যান্স সংগ্রহের ওপর সামান্য কমিশন নিয়ে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা প্রদানে হিমশিম খাচ্ছেন এ খাতের ছোট ছোট উদ্যোক্তারা। তাছাড়া অনেক আউটলেটে আমানত ও রেমিট্যান্সের লেনদেনের পরিমাণ খুবই কম। ফলে কমিশনের তুলনায় আউটলেট পরিচালনার খরচ পড়ছে কয়েকগুণ বেশি। এতে আগ্রহ হারাচ্ছেন এজেন্টরা, অনেক এজেন্ট ইতিমধ্যে এই সেবা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন।

ঢাকা, টাঙ্গাইল, সিলেট, চাঁদপুর ও শরিয়তপুরের বেশ কয়েকজন এজেন্টের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের আউটলেট স্থাপন করতে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা খরচ করতে হয়েছে। আউটলেটগুলোর ভাড়া, কর্মীদের পারিশ্রমিক, বিদ্যুৎ বিলসহ মাসে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ করেন উদ্যোক্তারা। কিন্তু অনেক আউটলেটের মাধ্যমে খোলা আমানত হিসাবগুলোতে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকার মতো আমানত জমা থাকে। এর থেকে কমিশন আসে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা।

এছাড়া বিদ্যুৎ বিল সংগ্রহের ওপর এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের এজেন্টরা কোনো কমিশন পান না। অন্যদিকে সংগৃহীত এই অর্থ নিজ খরচে ঝুঁকি নিয়ে কর্মী দিয়ে নিকটস্থ ব্যাংক শাখায় জমা করতে হয় তাদের। তাছাড়া ১ লাখ টাকা পর্যন্ত রেমিট্যান্স বিতরণে ৫০ টাকা করে কমিশন পান এজেন্টরা। অথচ ১ লাখ টাকা ব্যাংক থেকে তুলে নিয়ে আসা ও ব্যাংকিং পদ্ধতির মাধ্যমে গ্রাহককে দেওয়ার যে প্রক্রিয়া ও কর্মী ব্যবস্থাপনা তাতে এজেন্টদের পক্ষে সামান্য কমিশনে এই সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন এজেন্টরা।

সর্বোপরি এজেন্টরা যে সেবার বিপরীতে কমিশন পাচ্ছেন তার ওপরও নানা ধরনের ট্যাক্স-ভ্যাট আরোপ করছে ব্যাংক। ফলে এজেন্টদের প্রকৃত আয় আরও কমে যাচ্ছে।

এজেন্টরা এসব অভিযোগ ও অনুযোগের বিষয় নিয়ে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বারবার কথা বলেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জারি করা এজেন্ট ব্যাংকিং নীতিমালায়ও কমিশনের বিষয়ে কিছু বলা নেই। ফলে ব্যাংকগুলো নিজেদের মতো করে কমিশন নির্ধারণ করছে। ফলে সামান্য কমিশনে এজেন্ট আউটলেট পরিচালনার খরচ বহন করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন এ খাতের এজেন্টরা।

টাঙ্গাইল জেলার একজন এজেন্ট দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত দেড়-দুই বছর ধরে আউটলেট পরিচালনার পেছনে তিনি প্রতি মাসে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ করছেন। কিন্তু প্রতিমাসে কমিশন বাবদ আয় করছেন ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। তার আউটলেটের মাধ্যমে খোলা আমানত হিসাবে বর্তমানে ৩০ লাখ টাকার মতো জমা রয়েছে। প্রতি মাসে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা বিদ্যুৎ বিল সংগ্রহ করছেন। কিন্তু এর বিপরীতে কোনো কমিশন পান না।

ওই এজেন্ট জানান, সর্বশেষ গত ৯ মাসে তিনি মোট ১২ হাজার টাকা কমিশন পেয়েছেন এর মধ্যে থেকে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার টাকা কর বাবদ কর্তন করে সাড়ে ৮ হাজার টাকা কমিশন দিয়েছে ব্যাংক।

ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হওয়ার আশঙ্কা থেকে ওই এজেন্টের নাম এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হলো না।

একইভাবে সিলেটের এক এজেন্ট জানান, তিনি গত ৭ বছর ধরে সেখানে এজেন্ট আউটলেট পরিচালনা করছেন। কিন্তু আজও ব্যাংক থেকে এসিসট্যান্স রিলেশনশিপ অফিসার (এআরও) নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে নিজস্ব কর্মী দিয়ে আউটলেট পরিচালনা করতে গিয়ে বড় অঙ্কের টাকা খোয়া যাচ্ছে ওই এজেন্টের। এর জন্য কোনো ক্ষতিপূরণও পাননি তিনি।

চাঁদপুরের এক এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের উদ্যোক্তা জানান, ৩০ লাখ টাকা জামানত দিয়ে এজেন্ট হয়েছেন তিনি। কিন্তু এখন প্রতিমাসে ১০-১৫ হাজার টাকা লোকসান দিয়ে আউটলেট চালাতে হচ্ছে। শরিয়তপুরের আরেক এজেন্ট জানান, এভাবে লোকসান দিতে হলে তিনি আউটলেট বন্ধ করে দেবেন।

দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার মধ্যে নিয়ে আসতে ছোট আকারে ব্যাংকিং সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ২০১৩ সালে প্রথম এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ লক্ষ্যে একটি নীতিমালা জারি করে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন, জমা দেওয়া, রেমিট্যান্সসহ বিভিন্ন পরিষেবার বিল জমা দেওয়া, অন্য হিসাবে অর্থ স্থানান্তর, চেক বই গ্রহণ, এটিএম কার্ড সংগ্রহসহ সব ধরনের ব্যাংকিং কার্যক্রম করা যায়। নির্দিষ্ট কমিশনের মাধ্যমে ব্যাংকের পক্ষে সেবাটি দেন এজেন্টরা। বর্তমানে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে ২৮টি ব্যাংক।

গত আগস্ট শেষে দেশের ব্যাংকগুলোর নিয়োগ দেওয়া এজেন্ট দাঁড়ায় ১৩ হাজার ১৬০ জনে। আউটলেট ১৭ হাজার ৪৬৪টি। এর মধ্যে ১৫ হাজার ২১১টি আউটলেট গ্রামে-গঞ্জে। বাকি ২ হাজার ২৫৩টি আউটলেট শহর এলাকায়।

এসব আউটলেটের মাধ্যমে সংগৃহীত আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৫৬৪ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে আমানত বেড়েছে ৮০ শতাংশ।

তবে ঋণ বিতরণের পরিমাণ খুবই কম। গত আগস্ট মাসে ঋণ বিতরণ হয়েছে ৩৮৭ কোটি টাকা। রেমিট্যান্স বিতরণ হয়েছে ১ হাজার ৭৬৬ কোটি টাকা।

দেশে প্রথম এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করে ব্যাংক এশিয়া। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক পরে শুরু করলেও বর্তমানে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে এগিয়ে রয়েছে। এছাড়া ইসলামী ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, এবি ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকসহ বড় ব্যাংকগুলো এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

তবে ঋণ বিতরণ বৃদ্ধি না পাওয়ায় এজেন্টদের কমিশন বাড়ছে না। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু ফরাহ মো. নাছের বলেন, ‘কমিশন যাতে বাড়ে সেজন্য আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন ধরনের তহবিল থেকে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে এজেন্ট ব্যাংকিংকে অন্তর্ভুক্ত করতে নির্দেশনা দিচ্ছি। আগামীতেও এ ধরনের কয়েকটি প্রকল্পে এজেন্ট ব্যাংকিংকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এতে এজেন্টরাও বাঁচবে, ব্যাংকও কম খরচে ঋণ বিতরণ করতে পারবে। কেননা, শাখার মাধ্যমে এই ঋণ বিতরণ করতে গেলে ব্যাংকের খরচ বেড়ে যাবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত