ইউনেসকোর পুরস্কার জিতল দোলেশ্বর হানাফিয়া মসজিদ

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২১, ০৯:১১ পিএম

জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা বা ইউনেসকোর স্বীকৃতি পেয়েছে ঢাকার কেরানীগঞ্জে কোন্ডা ইউনিয়নে অবস্থিত দোলেশ্বর হানাফিয়া জামে মসজিদ। মসজিদটি দেড়শ বছর পুরোনো। মসজিদটি সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য স্থপতি সাঈদ মোস্তাক আহমেদ The award of Merit পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর পরিবার পারিবারিক ভাবে ১৫০ বছর ধরে মসজিদটি দেখাশোনা করে আসছেন।

ইউনেসকোর ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রতিবছর বিভিন্ন দেশের শ্রেষ্ঠ কাজের স্বীকৃতি দেয় তারা। ২০২১ সালে ৬ টি দেশের ৯ টি স্থাপনাকে এ বছর স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। অ্যাওয়ার্ড অব মেরিট ক্যাটাগরিতে স্বীকৃতি পেয়েছে কেরানীগঞ্জের দোলেশ্বর হানাফিয়া মসজিদ। বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, চীন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও জাপানের বিভিন্ন স্থাপনা ইউনেসকোর স্বীকৃতি পেয়েছে।

মসজিদের ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়, ১৮৬৮ সালে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর দাদির বাবা ও দাদার বাবার হাতে এর গোড়াপত্তন হয়। ১৯৬৮ সালে বিপুর বাবা অধ্যাপক হামিদুর রহমান তৈরি করেন মসজিদটির মিনার। এরপরে বংশ পরম্পরায় মসজিদটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আসে বিপুর হাতে। কালের বিবর্তনে মুসল্লি সংখ্যা দিন দিন বাড়ায় মসজিদটি বড় করার প্রয়োজন দেখা দেয়।

এলাকার অনেকে বলছিল মসজিদ ভেঙে বড় করতে, কেউ কেউ নতুন মসজিদ নির্মাণের পক্ষে ছিল, কেউ বলছিল এয়ারকন্ডিশন মসজিদ করতে। কিন্তু বিপু চাইছিল পুরোনো মসজিদটাকে রক্ষা করে আধুনিক কোনো মসজিদ করতে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্মাণ করা হয়েছে মসজিদটি।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, পুরোনো মসজিদটিকে ঠিক রেখেই সংস্কার করে বর্ধিত করা হয়েছে নতুন ভবন। লাল রঙের মসজিদটি সম্পূর্ণ কংক্রিটের তৈরি। মসজিদের ছাদটাকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ভাগ হয়ে যাওয়া ছাদের অংশকে নিচ থেকে সাপোর্ট দিচ্ছে গাছের মতো তৈরি করা কলামগুলো। ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ভাগ হওয়ার কারণে ওপর থেকেও মসজিদের ভেতরে আলো প্রবেশ করছে।  হাওয়া বাতাস ঠিকমতো চলাচল করার জন্য মসজিদটার চারপাশকে খোলা রাখা হয়েছে। পুরোনো মসজিদটি এখন লাইব্রেরি আর মক্তবে রূপ নিয়েছে। 

স্থানীয় কয়েকজন এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতি শুক্রবার দূর দুরন্ত থেকে মানুষ আসে এখানে জুমার নামাজ পড়তে। এ ছাড়া এটি অন্যতম পর্যটন স্থানও। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষজন কেরানীগঞ্জে আসলে এই মসজিদটিও দেখতে আসে। মসজিদটির পরিবেশ আর ১০ টা মসজিদ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হওয়ার কারণ মসজিদটি এলাকাবাসীর কাছেও অনেক জনপ্রিয়।

স্থানীয় কোন্ডা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান ফারুক জানান, এমন সুন্দর ও ইউনিক স্থাপনার মসজিদ খুব কমই আছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস, আর্ক ডেইলির মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে মসজিদটি নিয়ে একাধিক বার ফিচার হয়েছে। মসজিদটিতে একসঙ্গে ২ হাজার মুসল্লি নামাজ পড়তে পারে। চারপাশের পরিবেশ সুন্দর ও খোলামেলা হওয়ার কারণে প্রতিদিন সকালে আশপাশের  বাচ্চারা মসজিদের মক্তবে আনন্দের সঙ্গে পড়তে আসে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু বলেন, দোলেশ্বর হানাফিয়া জামে মসজিদের সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য স্থপতি সাঈদ মোস্তাক আহমেদ পুরস্কার পাওয়ার বিষয়টা দেশের জন্য এটা যেমন বিরাট সম্মানের তেমনি আমার জন্যও ভীষণ আনন্দের। মসজিদটি যখন সংস্কারের কথা চলছিল তখন অধিকাংশ মানুষই এটাকে ভেঙে নতুনভাবে তৈরির কথা বলেছিল। কিন্তু আমি চেয়েছিলাম পুরোনো ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে। আমরা যখন নতুনের কথা বলব তখন পুরোনোকে সঙ্গে নিয়েই কথা বলতে হবে। পুরোনো স্থাপনাকেও সুন্দরভাবে রাখা যায় এই ভাবনা থেকে সবাইকে ইন্সপায়ার করার জন্যই এই কাজটা করা। অল্প খরচেও ভালো একটা স্থাপনা নির্মাণ করা যায় এটা তার প্রমাণ। এখানে টাইলস এসি কিছুরই প্রয়োজন হয়নি। নতুন যেটি নির্মাণ করেছি সেখানেও টাইলস আর এসির প্রয়োজন হয়নি।

এ বিষয়ে এশিয়া স্থপতিদের সংগঠন আর্ট এশিয়ার সভাপতি ও ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসেফিকের স্থাপত্য বিভাগের প্রধান স্থপতি সাইদ মোস্তাক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই ধরনের কাজে আমাদের দেশে ইউনেসকোর এটাই প্রথম স্বীকৃতি। আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়াটা অবশ্যই আনন্দের বিষয়। গত ২৫ বছর ধরে এই ফিল্ডে কাজ করছি, এই স্বীকৃতি আমার ব্যক্তিগত স্বীকৃতি না। আসলে এটা দেশের প্রতি স্বীকৃতি যে, আমাদের পুরোনো জিনিসগুলো রক্ষা করতে হবে। এই পুরস্কারটা এই ফিল্ডটাকে আরো প্রসার করবে। পুরা বাংলাদেশে পুরোনো যে সকল স্থাপনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেকগুলো হয়তো বেঁচে যাবে।

তিনি আরো বলেন, আমাদের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে আরো কাজ হতে হবে। সরকারের এই সেক্টরে আরো অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। এই সেক্টরে আরো বেশি ফান্ড ও জনবল দিতে হবে। দেশ হয়তো অনেক ডেভেলপ হয়ে যাবে, বড় হয়ে যাবে, কিন্তু ঐতিহ্য না থাকলে দেশের তো মূল্য থাকবে না। ঐতিহ্য না থাকলে দেশের পরিচয় থাকবে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত