শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের আন্দোলন যে আশা জাগায়

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২১, ১০:২৩ পিএম

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আবারও আন্দোলনে নেমেছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়ার দাবি শর্তসাপেক্ষে মেনে নিয়েছে মালিক সমিতি। এর আগেই শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিয়ে বিআরটিসি বাসে তাদের জন্য হাফ ভাড়া কার্যকর করার ঘোষণা দেয় সরকার। তবে, শিক্ষার্থীরা বলছে, শুধু হাফ ভাড়া নয় তাদের ১১ দফা দাবি মেনে নেওয়া না হলে রাজপথ ছাড়বে না তারা।

শিক্ষার্থীরা প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে আন্দোলন করে আসছে বাসে ভাড়া কমানোসহ সড়কে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন দাবিতে। এই আন্দোলনটা গতি পায় গত ২৪ নভেম্বরের পর থেকে। যখন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লাবাহী একটি গাড়ির ধাক্কায় নটর ডেম কলেজের এক শিক্ষার্থী মর্মান্তিকভাবে নিহত হয়। আর তার পরদিন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আরেকটি ময়লাবাহী গাড়ির ধাক্কায় নিহত হন একজন সংবাদকর্মী।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন নতুন নয়। ২০১৮ সালের তাদের এই আন্দোলন দেশব্যাপী আলোড়ন তুলেছিল। তখন শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবি আদায়ে ৯ দফা দাবি উত্থাপন করে। তাদের দাবির প্রতি তখন সমর্থন জানিয়েছিল দেশের প্রায় সর্বস্তরের জনগণ। শিক্ষার্থীদের এই দাবির প্রেক্ষাপটেই জাতীয় সংসদ ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর নতুন সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়ন করে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ এখনো পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা যায়নি বা হয়নি। এর পেছনে সড়ক পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের চাপ কাজ করছে তা বলাই বাহুল্য। সবকিছু দেখেও আমাদের যেন কিছুই করার নেই। আমরা যেন কোনো বিশৃঙ্খলার বৃত্ত ভাঙতেই অপারগ।

সড়কে নিরাপদে চলাচলের জন্য আমরা সব সময় বিভিন্ন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি শুনে থাকি। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতির কোনো বাস্তবায়ন দেখতে পাই না। অনেক সময় সরকারের কর্তাব্যক্তিরাই তাদের অসহায়ত্বের কথা স্বীকার করেন জনসম্মুখে। আবার শিক্ষার্থীরা যখন রাস্তায় নেমে আসে তখন সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ কিছুটা তৎপর হয়ে উঠে বটে কিন্তু অবস্থার কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন দেখা যায় না। উল্টো সরকারের বিভিন্ন কর্র্তৃপক্ষ বলে থাকে সড়কে যানবাহন, পথচারী, মালিক ও শ্রমিক কেউ শৃঙ্খলা মানতে চায় না। এই অভিযোগটি যদি সত্যিও হয় তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে শৃঙ্খলা ফেরানোর দায়িত্ব কার? আইনের বাস্তবায়ন করবে কে? এটা ঠিক যে, সবকিছু আইনের মাধ্যমে হয় না, কিন্তু সড়ক নিরাপদ করার জন্য আমাদের উদ্যোগ কি যথেষ্ট? সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির দুর্ঘটনার পর, সিটি করপোরেশনের পরিবহন পুলে যে অনিয়ম সবার সামনে উঠে এসেছে তা যেন এই সেক্টরেরই সার্বিক প্রতিচ্ছবি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে সড়কের এই বিশৃঙ্খলা ও আইন না মানার কারণে লাভবান কে? এ বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার। কাদের স্বার্থের কারণে সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না বা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। এই প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই সড়ককে নিরাপদ করতে না পারার মূল কারণগুলো নিহিত আছে। বর্তমান অবস্থা কোনোভাবেই একটি সভ্য সমাজে দীর্ঘদিন ধরে চলতে পারে না, এমনকি এক দিনও না। যদিও আমরা দিনের পর দিন এটা বয়ে বেড়াচ্ছি।

যাত্রীকল্যাণ সমিতির হিসাব মতে, গত ছয় বছরে ৪৩ হাজারেরও বেশি মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে এবং আহত হয়েছে ৯১ হাজারেরও বেশি। নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের হিসাব অনুযায়ী শুধু ২০১৮ সালেই সড়ক দুর্ঘটনায় ৪ হাজার ৪৩৯ জন নিহত হয়, ২০১৯ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ হাজার ২২৭ জন। ২০২০ সালে করোনার কারণে বছরের বেশির ভাগ সময় সবকিছু বন্ধ থাকার সময়ও ৪ হাজার ৯৬৯ জন নিহত হওয়ার তথ্য প্রকাশ হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার কারণে সড়কে মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলছে।

২০১৮ সালের শিক্ষার্থীদের সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলনের সময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ১৭ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়। যার মধ্যে সিগন্যালিং-ব্যবস্থা উন্নত করাসহ, নিরাপদে সড়ক পারাপার, অবকাঠামোর উন্নয়ন, চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, যাত্রীদের নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রথম প্রথম এই নির্দেশনাগুলোর কিছু কিছু চর্চা শুরু হলেও এর অনেকগুলো যেমন অব্যাহত রাখা যায়নি, তেমনি অনেকগুলোর ওপর যথেষ্ট গুরুত্বও দেওয়া হয়নি। এখনো ঢাকার রাস্তায় গণপরিবহনের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা লক্ষ করা যায়। যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানামা করানো এবং যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করে রাখা যেন সারা ঢাকার সামগ্রিক চিত্র। আর এটাই ঢাকার যানজটের জন্য অনেকাংশে দায়ী।

সড়কে বিশৃঙ্খলায় শুধু শিক্ষার্থীরাই হতাহতের শিকার হয় না। যাত্রীকল্যাণ সমিতির হিসাবে মতে ২০২০ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ ছিল গাড়ির চালক এবং এর বাইরেও নিহতের একটি বড় অংশ পরিবহন শ্রমিক, সাধারণ জনগণ, শিক্ষার্থী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও রয়েছেন। কিছু মানুষের স্বেচ্ছাচারিতা, খামখেয়ালি ও যেনতেনভাবে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা এভাবে হাজার হাজার মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা এখনো সড়ক পরিবহন আইনভঙ্গের যথাযথ প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে পারিনি। একইভাবে পারিনি নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনকে একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনে পরিণত করতে। অনেকেই আবার সড়কে বিশৃঙ্খলার জন্য পর্দার আড়ালে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট সমঝোতার কথা বলে থাকেন। এই অনৈতিক সমঝোতা ও বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থের লেনদেন সড়ককে নিরাপদ করতে না পারার একটি বড় অনুঘটক।

২০১৮ সালের আন্দোলনের মতো এবারের আন্দোলনেও শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন যানবাহনের চালকদের লাইসেন্স পরীক্ষা করছে। সংবাদপত্র মারফত খবরে দেখা যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তাদের সহযোগিতা করছে। যাদের লাইসেন্স নেই তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিচ্ছে। তাদের এই সহযোগিতা একদিকে যেমন সংবেদনশীলতার পরিচয় দিচ্ছে, একই সঙ্গে নিজেদের ব্যর্থতাও সবার সামনে উন্মোচন করে দিচ্ছে। তাদের এই সংবেদনশীলতা সাময়িক কৌশলগত উদ্দেশ্য হাসিল হতে পারে কিন্তু কোনোভাবেই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পথ সুগম করবে না বরং আরও বেশি প্রলম্বিত করবে।

শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন হয়তো আমাদের প্রতিদিনকার চলাফেরায় কিছুটা ভোগান্তির সৃষ্টি করছে, কিন্তু এ কথাও ঠিক, নিরাপদ সড়কের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হলেও বিভিন্ন কায়েমি গোষ্ঠীর স্বার্থের কারণে কোনো পরিবর্তন আসছিল না। সেই অর্থে নিরাপদ সড়কের ইস্যুতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে এক ধরনের জাতীয় দায়িত্বই পালন করছে, যা অনেক দায়িত্বশীল গোষ্ঠীই পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন হয়তো অতটা সুসংগঠিত না বা যুক্তির পড়তে পড়তে সাজানো নয়। কিন্তু তাদের মূল দাবিটাকে অস্বীকার করি কীভাবে। শিক্ষার্থীদের নিয়ে আমরা আশাবাদী এ কারণেই যে, অনেকেই এই ইস্যুটার গুরুত্ব বুঝতে ব্যর্থ হলেও শিক্ষার্থীরা এর গুরুত্ব ঠিকই যথাযথভাবে অনুধাবন করতে পেরেছে এবং এই খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার ওপর কিছুটা হলেও চাপ প্রয়োগ করতে পেরেছে। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন কোনোভাবেই ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। অধিকন্তু তাদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে নিরাপদ সড়কের আন্দোলনকে আরও জোরদার করতে হবে। তাহলেই আমরা কায়েমি স্বার্থগোষ্ঠীর ঊর্ধ্বে উঠে এই বাংলাদেশকে একটি উন্নততর দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারব।

লেখক : উন্নয়নকর্মী

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত