আমাদের জাতীয় দুর্ভাগ্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর শুনলে যে ইমেজটি সামনে উঠে আসে এবং যে ইমেজে আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি তা মোটেও সম্মানজক নয়। রাজনৈতিক দলের দাস্যবৃত্তিতে প্রতিযোগিতায় সবার চেয়ে এগিয়ে থাকলেই শুধু ফিলিপ হার্টগ যে চেয়ারটিকে সম্মানজনক অবস্থানে নিয়েছিলেন তা টেনে নামিয়ে তাতে বসার অনুমতি পাওয়া যায়, তাকেই দেখা যায় ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক, কর্মচারীসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারকে সন্তুষ্ট করে পদ ধরে রাখতে হয়। হার্টগ, ল্যাংলি, জেন্কিন্সের আমলে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বললে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় নিয়ে উপহাস কেউ করত না। হার্টগ সাহেবের সময় রাজনৈতিক দলদাস ও চাটুকার সৃষ্টি হয়নি। তিনি স্বাধীনভাবে শিক্ষক নিয়োগ করতে পেরেছেন। একালে ভাইস চ্যান্সেলর হওয়ারও অলিখিত প্রধান যোগ্যতা দলদাসত্ব। অন্যসব যোগ্যতায় অনুত্তীর্ণ হলেও তেমন কিছু এসে যায় না, দাসত্ব সূচকে যিনি এগিয়ে থাকেন তিনি অন্যদের নক-আউট করতে পারেন। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ঢাকাকে পূর্ববঙ্গ ও আসামের রাজধানীতে পরিণত করে এবং রমনার বিভিন্ন অংশে দপ্তর ও সুন্দর আবাসন গড়ে ওঠে। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রহিত হয়ে যাওয়ায় নবনির্মিত রাজধানী কমপ্লেক্সের দালানকোঠা খালি হয়ে গেল। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সেসব বাড়িঘরের কিছু অংশ দাবি করলেন এবং বেশ দর-কষাকষির পর পেয়েও গেলেন। ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইন বাংলা সরকারের ক্ষমতা অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়। এর মধ্যে শিক্ষার দায়িত্ব বাংলা সরকারের ওপর ন্যস্ত হয়, মন্ত্রী তখন প্রভাস চন্দ্র মিত্র। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে জানিয়ে দিলেন তাদের শিক্ষকদের যে বেতনে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, বাংলা সরকারের পক্ষে তা বহন করা সম্ভব নয়।
ভারত সরকার প্রস্তাবিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রতি বছর যে বরাদ্দ মঞ্জুর করেছে, তাতে সঞ্চিতি ছিল ৫৪ লাখ টাকা। এই টাকা চাওয়া হলে ভারত সরকার জানিয়ে দেয়, ওই টাকার বিনিময়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আবাসনের জন্য বাড়ি হস্তান্তর করা হয়েছে। ভাইস চ্যান্সেলর হার্টগ ভারত সরকারকে বললেন, তাদের অনুমোদন নিয়েই শিক্ষকদের বেতন ধার্য করা হয়েছিল। জবাবে তাকে জানানো হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন বাংলা সরকারের নিয়ন্ত্রণে, কেন্দ্র থেকে বাংলাকে কোনো নির্দেশ দেওয়া সম্ভব নয়। রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন, অধ্যাপকদের ১০০০ থেকে ১৮০০ টাকার বেতন কমিয়ে ১০০০ টাকায় স্থির করা হয়। আনুপাতিক হারে কমে যায় অন্য শিক্ষকদের বেতন। হার্টগ সাহেব যোগদান করেই কজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক নিয়োগ করলেন। ১৯২১-এর মে মাসে তাদের সবাইকে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানালেন। তিনি তাদের নিয়ে পাঠ্যসূচি প্রণয়ন, শিক্ষক নিয়োগবিধি, পরীক্ষাপদ্ধতি, শিক্ষকদের বিদায় ও অবসর, প্রভিডেন্ট ফান্ড ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় নির্ধারণ করলেন। সে সভায় কলকাতা থেকে রমেশচন্দ্র মজুমদারও এসেছিলেন। রমেশচন্দ্র লিখেছেন : ‘এই মিটিং শেষ করে আমি আবার কলকাতায় ফিরে আসি। তারপর জুন মাসের শেষে আবার যাত্রা করি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও কয়েকজন শিক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিযুক্ত ছিলেন। তাদের মধ্যে অনেকেই একসঙ্গে নতুন কর্মস্থলে যাত্রা করেন। আমাদের দলে সত্যেন বসু, নলিনী বসু, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, হরিদাস ভট্টাচার্য প্রমুখ ছিলেন। আমাদের যাওয়ার কিছুদিন পর জ্ঞান ঘোষ বিলেত থেকে ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন।’
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ভাইস চ্যান্সেলর স্যার ফিলিপ হার্টগকে নিয়ে সৈয়দ আবুল মকসুদ নির্ভরযোগ্য সূত্রভিত্তিক একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার গ্রন্থের উপসংহারের দুটো অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করতে চাই : ‘ব্রিটিশ সরকারের কাছে বাংলাদেশের মানুষ গভীরভাবে কৃতজ্ঞ এই জন্য যে তারা ড. হার্টগের মতো ব্যক্তিকে প্রস্তাবিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, তার বদলে কোনো বাঙালি শিক্ষাবিদকে উপাচার্য করা হলে বিশ্ববিদ্যালয় এগোতে পারত না। বরং ধারণা করা যায়, অনেকের বাসনামতো একটি দুর্বল অথবা ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতো। দ্বিতীয় উদ্ধৃতিটি হলো : ‘বহু বছর আগের প্রয়াত একজন বিদেশি শিক্ষাবিদ ও কর্মযোগীকে স্মরণ করা বা না করায় তার বা তার বংশধরদের কিছুই আসে যায় না। কিন্তু আজ বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থেই তাকে স্মরণ করা প্রয়োজন। তার শিক্ষাদর্শন আলোকবর্তিকার মতো পথহারা জাতিকে সঠিক পথে সন্ধান দিতে পারে।’ সে কারণে শতবর্ষপূর্তির প্রাক্কালে ২০১৬ সালে প্রকাশিত ‘স্যার ফিলিপ হার্টগ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য’ গ্রন্থে তিনি তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। দুর্ভাগ্য সৈয়দ আবুল মকসুদের তিনি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শততম বর্ষ উদযাপনের আগেই মৃত্যুবরণ করেছেন।
ফিলিপ জোসেফ হার্টগ সাহেবের জন্ম ১৮৬৪ সালের ২ মার্চ, লন্ডনে। তার বাবা আলফোঁস হার্টগ নেদারল্যান্ডসের ইহুদি পরিবারের সন্তান। বসতি স্থাপন করেন প্যারিসে। লন্ডনে আসেন ফ্রেঞ্চ ল্যাঙ্গুয়েজ টিচার হিসেবে। জোসেফের পড়াশোনা লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজ স্কুলে, আর ম্যানচেস্টার ওয়েনস কলেজে। ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে বিএসসি, লন্ডন ইউনিভার্সিটি থেকে রসায়নে আরও একটি বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করলেন। ফ্রান্স ও জার্মানিতে ক’বছর গবেষণার কাজ করে ওয়েনস কলেজ এবং ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটিতে কিছুকাল শিক্ষকতা করে ১৯০৩ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগ দেন এবং ১৭ বছর এ দায়িত্ব পালন করেন। স্যার ফিলিপ জোসেফ হার্টগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবন নিয়ে কিছু তথ্য উপস্থাপন করা জরুরি। রসায়নের মেধাবী ছাত্র ফিলিপ হার্টগ তার নোবেল বিজয়ী বন্ধু নিলস বোর কিংবা আর্নেস্ট রাদারফোর্ডের মতো গবেষণায় না গিয়ে বেছে নেন প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠান গড়ার কাজ। তার হাতে পুনর্গঠিত হয়েছে ম্যানচেস্টার বিশ^বিদ্যালয়; লন্ডনের স্কুল অব আফ্রিকান অ্যান্ড ওরিয়েন্টাল স্টাডিজের তিনিই ছিলেন প্রাণপুরুষ, ছিলেন লন্ডন বিশ^বিদ্যালয়ের ১৭ বছরের অ্যাকাডেমিক রেজিস্ট্রার। ১৯২০-এর জুনেই তিনি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের জন্য নিয়োগপত্র পেলেন। এর আগে তিনি শিক্ষা কমিশনে কাজ করে গেছেন। স্যাডলার কমিশনকে প্রকারান্তরে হার্টগ কমিশনও বলা যায়, কারণ তিনিই ছিলেন কমিশনের অন্যতম চালিকাশক্তি। ফিলিপ হার্টগকে ১৯২১-এর জুলাইয়ের ক’মাস আগেই ১৯২০ সালের ডিসেম্বরে চার হাজার টাকা বেতনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে যোগ দিতে হয়। শুরুর দিকের কাজগুলো যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বিধিবিধান প্রণয়ন, শিক্ষক নিয়োগ আগেভাগে না করলে জুলাইয়ের প্রথম দিন আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শুরু করা সম্ভব হতো না। ১ ডিসেম্বর ১৯২০ কলকাতায় পৌঁছাতেই, সেদিনই যারা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলেন, তিনি তাদের বললেন বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আগের মতো হিন্দু বনাম মুসলিম অপ্রীতিকর মতানৈক্য আর দেখতে চান না; এই প্রতিষ্ঠান হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়েরই উপকারে আসবে। ঢাকায় পৌঁছে বড় লাট লর্ড হার্জিঞ্জকে উদ্ধৃত করে বলেন : এটা মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় নয়, এটা হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, এটা সবার জন্য উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।
ঢাকার যে হিন্দু নেতৃত্ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় যখন বাস্তবে আত্মপ্রকাশ করল, তারাই জগন্নাথ কলেজ ও ঢাকা কলেজের হিন্দু শিক্ষকদের ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে নিযুক্তির জন্য তদবির শুরু করলেন। হার্টগ স্পষ্টভাবেই বললেন যেখানে বাংলার ৫২ শতাংশ মানুষ মুসলমান, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর ৯০ ভাগ হিন্দু ১০ ভাগ মুসলমান। ‘এটা মোটেও সন্তোষজনক বা স্বাভাবিক অবস্থা না। ঢাকায় আমরা সর্বাধিক চেষ্টা করব অধিকসংখ্যক মুসলমান ছাত্রকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার দিকে টেনে আনতে। তাদের শিক্ষিত করতে হবে এমনভাবে, যাতে তারা রাজনৈতিক ব্যাপারে আরও বেশি অংশ নিতে পারেন এবং ভবিষ্যতে বাংলার সরকার পরিচালনায় যথেষ্ট যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিচয় দেন।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক সূচনার দিন ১ জুলাই ১৯২১ বাংলার উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে নিঃসন্দেহে একটি স্মরণীয় দিন। বিশ্ববিদ্যালয় চালু হওয়ার পর শুরু হয় হার্টগের কঠোরতর সংগ্রাম। গভর্নরের কাউন্সিলের চার সদস্যের অন্যতম অর্থের দায়িত্বপ্রাপ্ত পি সি মিট্টার (প্রভাস চন্দ্র মিত্র) শুরু থেকেই নেতিবাচক ভূমিকা গ্রহণ করতে থাকেন। ন্যাথান কমিশন যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক আনুষঙ্গিক ব্যয় ১৩ লাখ টাকা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল মনে করেছে, সেখানে বরাদ্দ কমিয়ে ৫ লাখ টাকা করা হয়। টাকার জন্য সরকারের সঙ্গে লড়াই করা থেকে শুরু করে তার স্টাফদের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা, শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে সংবেদনশীল হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়সমূহের মোকাবিলা করা তিনি একাই করেছেন।
শিক্ষক নিয়োগের প্রশ্নে যে গুণগত প্রমিতমান তিনি স্থাপন করেছেন ভারতবর্ষের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে তা দুর্লভ। হার্টগ ভারতের সেরা ও মেধাবী শিক্ষকদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে তাদের নতুন বিশ^বিদ্যালয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়-কেন্দ্রিক বিরুদ্ধ-প্রচারণা তো ছিলই, এমনকি সরকারের আর্থিক বরাদ্দ বাতিল হয়ে পূর্ববঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়টি লাটে উঠে যেতে পারে, সেই রটনাও ছিল। তার পরও তিনি পদার্থ বিজ্ঞানে সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও রসায়নে জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, দর্শনে জি এইচ ল্যাংলি ও হরিদাস ভট্টাচার্য, ইংরেজিতে সি এল রেন, ইতিহাসে আহমদ ফজলুর রহমান ও রমেশচন্দ্র মজুমদারকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে প্রথম শ্রেণি পাওয়া মাহমুদ হাসানকে নিজে ইন্টারভিউ করে লেকচারার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগে শ্রীশচন্দ্র চক্রবর্তী, অর্থনীতি ও রাজনীতি বিভাগে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈদ্যনাথ আয়ার, পদার্থ বিজ্ঞানে ওয়াল্টার এ জেনকিন্স, গণিতে বি এম সেনগুপ্তকে তিনিই এনেছেন। বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর আইনস্টাইনের সঙ্গে কাজের সুযোগ ও তার আন্তর্জাতিক খ্যাতির তিনিই ছিলেন অন্যতম অনুঘটক। আরও অনেকের সঙ্গে রমেশচন্দ্র মজুমদার ও জ্ঞানচন্দ্র ঘোষের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ভালোভাবে নেয়নি। রমেশচন্দ্র মজুমদারকে তাই ব্যক্তিগত ক্ষতি মেনে নিতে হয়েছে, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিএসসির জন্য যাওয়ার প্রাক্কালে জ্ঞানচন্দ্রের গৃহীত ১০,৭০০ টাকার ঋণ পরিশোধের দায়ভার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে ফিলিপ হার্টগই গ্রহণ করেছিলেন। হার্টগ সাহেব অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে সাম্প্রদায়িক চাপ, সরকারের ও নবাববাড়ির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের চাপ প্রতিহত করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য অবদান, নারীর উচ্চতর শিক্ষার দীর্ঘদিনের আগলে রাখা পথের বাধা সরিয়ে তাদের পুরুষের মতোই উত্তরণের সুযোগ দেওয়া। কৃষি গবেষণার পথিকৃৎ হিসেবে তার অবদান নিয়ে সৈয়দ আবুল মকসুদ পৃথক একটি অধ্যায়ই রচনা করেছেন। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্প্রসারণে তার ভূমিকাই ছিল মুখ্য। ১৯২৫-এর ৩০ নভেম্বর হার্টগের ৫ বছরের চুক্তির মেয়াদকাল শেষে তাকে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য নিয়োগ করা হয়। পরবর্তী ভাইস চ্যান্সেলর জর্জ হ্যারি ল্যাংলির যোগদানের সুবিধার জন্য তার আরও এক মাসের চাকরিকাল বাড়ানো হয়। তাকে আরও কিছুকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাখার জন্য হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায় থেকেই সরকারকে অনুরোধ করা হয়। ১৯২৬-এর জানুয়ারিতে তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন। ভারতীয় পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য হিসেবে তিনি মেধা ও যোগ্যতাকে উচ্চতর চাকরির শর্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্রিয় থাকেন। ১৯২৮-২৯-এ তিনি ছিলেন ভারতীয় শিক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান। তিনি ভারতীয় স্ট্যাচুটরি কমিশন অন কনস্টিটিউশনাল অ্যাডভান্স ইন ইন্ডিয়ার পক্ষে অনুসন্ধানমূলক দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৩০ সালে ব্রিটেন তাকে নাইটহুড প্রদান করে।
তিনি রসায়ন শাস্ত্রের শিক্ষার্থী ছিলেন, কিন্তু গ্রন্থ রচনা করেছেন সংস্কৃতির সমাজতত্ত্ব ও ইতিহাস নিয়ে। তার গ্রন্থ ‘কালচার : ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড মিনিং’। শিক্ষা ও পরীক্ষাপদ্ধতি নিয়ে তার আরও দুটি বই রয়েছে। উপমহাদেশীয় ভাষা হিন্দি, উর্দু ও বাংলা তিনি রপ্ত করেছিলেন। ইউরোপীয় ভাষা জার্মান, ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজিতে তিনি দক্ষ ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরবর্তীকালের ভাইস চ্যান্সেলর রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন : ‘স্যার ফিলিপ হার্টগ অতি যোগ্য ব্যক্তি ছিলেন। প্রথমাবধিই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতির জন্য যথেষ্ট চিন্তা ও পরিশ্রম করতেন। তিনি যেসব নিয়মকানুন প্রবর্তন করেছিলেন, পরবর্তীকালে তারই ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক রকম উন্নতি সম্ভবপর হয়েছিল। সাধারণত এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব দোষত্রুটি দেখা যায়, তার অনেকগুলো যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটেনি, তার জন্য হার্টগের যথেষ্ট কৃতিত্ব আছে।’ ১৭ জুন ১৯৪৭ তিনি লন্ডনে মৃত্যুবরণ করেন।
লেখক সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ও কলামনিস্ট
