একক গ্রাহকের উচ্চ বিনিয়োগের ওপর মুনাফার হার কমানোর পরের মাসেই সঞ্চয়পত্র বিক্রি ব্যাপকভাবে কমেছে। গত অক্টোবর মাসে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ এসেছে ৭৬৬ কোটি টাকা, যা এর আগের মাসের নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রির তুলনায় প্রায় ৭৩ শতাংশ কম। গত সেপ্টেম্বরে সঞ্চয়পত্র থেকে নিট ঋণ এসেছিল ২ হাজার ৮২৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।
গত আগস্টে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ছিল ৩ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা এবং জুলাই মাসে নিট বিক্রি ছিল ২ হাজার ১০৪ কোটি টাকা। সেই হিসেবে সঞ্চয়পত্র থেকে চলতি অর্থবছরের সবচেয়ে কম ঋণ এসেছে অক্টোবর মাসে।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের হালনাগাদ প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) জাতীয় সঞ্চয় স্কিমগুলোতে ৩৫ হাজার ৩২৮ কোটি টাকার বিনিয়োগ এসেছে। এ সময় পুরনো সঞ্চয়পত্রের মূল টাকা ও মুনাফা পরিশোধের পর এই খাতে সরকারের নিট ঋণ হয়েছে ৯ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা বা ৪০ শতাংশ কম।
এর মধ্যে অক্টোবর মাসে মোট ৮ হাজার ৭২৩ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করেছে। এর মধ্যে মূল টাকা ও মুনাফা পরিশোধ হয়েছে ৭ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা। মূল অর্থ পরিশোধের পর অবশিষ্ট অর্থ নিট বিক্রি হিসেবে গণ্য হয়। সেই হিসেবে আলোচিত সময়ে নিট বিক্রির পরিমাণ ৭৬৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
সঞ্চয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সঞ্চয়পত্রে একক গ্রাহকের বিনিয়োগ কমিয়ে আনতে একের পর এক নানা শর্ত জুড়ে দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে গত সেপ্টেম্বরে ১৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে সুদহার ২ শতাংশ কমানো হয়েছে। আবার ঘোষণার বাইরে সঞ্চয়পত্র থাকলে জেল-জরিমানার বিধান করা হয়েছে। এ কারণে অনেকে সঞ্চয়পত্র বিনিয়োগ কমিয়েছেন।
বাজেট ঘাটতি মেটাতে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে এ খাত থেকে সরকার নিট ৩২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছে। প্রথম চার মাসে অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার ২৯ শতাংশ ঋণ নিয়েছে সরকার।
বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরের পুরো সময়ে (জুলাই-জুন) সঞ্চয়পত্র থেকে ৪১ হাজার ৯৫৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকা নিট ঋণ নেয় সরকার। যেখানে গত অর্থবছরে মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ছিল ২০ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছরের শেষ দিকে এ খাতের ঋণ বেড়ে যাওয়ায় সংশোধিত বাজেটে এই লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৩০ হাজার ৩০২ কোটি টাকা করা হয়।
ওই অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার অনেক বেশি ঋণ আসায় চলতি অর্থবছরে এ খাতের ঋণের লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। তবে সম্প্রতি সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগের অঙ্কের ওপর ভিত্তি করে সরকার মুনাফার হার পুনর্নির্ধারণ করায় এ খাতের বিনিয়োগ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা।
এই মুহূর্তে ঘাটতি মেটাতে সরকার আবার ব্যাংকঋণে ঝুঁকছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সাড়ে ১৯ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছে। অথচ গত অর্থবছরের একই সময়ে সরকারের কোনো ব্যাংকঋণ ছিল না। ওই সময়ে ঋণ নেওয়ার চেয়ে পরিশোধের পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা বেশি ছিল।
গত দুই অর্থবছর থেকে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ ও এর ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে সরকার। চলতি বাজেটে ২ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র বা পোস্টাল সেভিংস কিনতে হলে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র মিলবে শুধু সঞ্চয় অধিদপ্তরে।
সবশেষ গত ২১ সেপ্টেম্বর সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করে। সঞ্চয়পত্রে ১৫ লাখ টাকার ওপরে বিনিয়োগের মুনাফার হার ২ শতাংশ পর্যন্ত কমানো হয়েছে। তবে ১৫ লাখ টাকার নিচে মুনাফার হার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
