পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৬৪টি স্বল্প মূলধনী কোম্পানিকে তাদের পরিশোধিত মূলধন বাড়ানোর নির্দেশনা দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। সিকিউরিটিজ আইন পরিপালনে এসব কোম্পানিকে গত ৯ ডিসেম্বর আলাদা আলাদা চিঠিতে পরিশোধিত মূলধন নির্ধারিত সীমায় উন্নীত করতে বলেছে কমিশন। পরিশোধিত মূলধন ন্যূনতম ৩০ কোটি টাকায় উন্নীত করতে কোম্পানিগুলোকে ২০২২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছে এসইসি।
ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকাভুক্তির বিধিমালা, ২০১৫-এর ৯ ধারা অনুযায়ী, স্টক এক্সচেঞ্জের মূল বাজারে তালিকাভুক্ত যে-কোনো কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ন্যূনতম ৩০ কোটি টাকা বাধ্যতামূলক। তবে পরিশোধিত মূলধন ৩০ কোটি টাকার নিচে থাকা কোম্পানিগুলো অনেক আগে থেকেই তালিকাভুক্ত, যখন কোনো কোম্পানির মূলধনের ন্যূনতম সীমা বিষয়ে কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল না। পুঁজিবাজারে স্বল্প মূলধনী কোম্পানির শেয়ার নিয়ে নিয়মিত কারসাজি হওয়ায় পরবর্তী সময়ে ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধনের সীমা বেঁধে দেয় এসইসি। অবশ্য এতদিন পর্যন্ত বিধানটি নতুন তালিকাভুক্ত হতে যাওয়া কোম্পানির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল। এখন তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির জন্য এটি বাধ্যতামূলক করার পদক্ষেপ নিয়েছে কমিশন। স্বল্প মূলধনী ৬৪ কোম্পানিতে গত ৯ ডিসেম্বর এসইসির পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ৩০ জুনের মধ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী পরিশোধিত মূলধন ন্যূনতম ৩০ কোটি টাকায় উন্নীত করতে কোম্পানিগুলোকে আগামী এক মাসের মধ্যে সুস্পষ্ট ও বিস্তারিত প্রস্তাবনা জমা দিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। এক্ষেত্রে কমপ্লায়েন্স পরিপূরণে কমিশন থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করার কথাও চিঠিতে জানানো হয়েছে।
এসইসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্বল্প মূলধনী কোম্পানির শেয়ার কম থাকার কারণে কারসাজিকারকরা সহজেই সংশ্লিষ্ট শেয়ার নিয়ে কারসাজি করতে পারেন। এতে মৌলভিত্তি সাপোর্ট না করলেও স্বল্প মূলধনী কোম্পানিগুলোর শেয়ার দর অস্বাভাবিক হারে বাড়তে দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ারের চেয়েও বেশি দরে লেনদেন হয় এসব কোম্পানির দর। এমনকি উৎপাদন বন্ধ থাকা কিংবা অনেক বছর ধরে টানা লোকসানে থাকা স্বল্প মূলধনী কোম্পানির শেয়ারও অস্বাভাবিক দরে কেনাবেচা হতে দেখা যায়, যা বাজারে অস্থিরতা তৈরি করে। এখন এসব কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ন্যূনতম সীমায় উন্নীত হলে সংশ্লিষ্ট শেয়ার নিয়ে কারসাজি অনেকটাই কমে আসবে।
বর্তমানে যেসব কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন সবচেয়ে কম রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্টার্ন লুব্রিক্যান্টস লিমিটেডের। এই কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন মাত্র এক কোটি টাকা, যার প্রতিটি শেয়ার কেনাবেচা হচ্ছে ২ হাজার ৬১৮ টাকায়। দীর্ঘদিন লোকসানে থাকা সাভার রিফ্র্যাক্টরিজের পরিশোধিত মূলধন ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। অথচ কোম্পানিটির শেয়ার সর্বশেষ ১৭৬ টাকা ৮০ পয়সায় কেনাবেচা হচ্ছে। লিবরা ইনফিউশনসের পরিশোধিত মূলধন দেড় কোটি টাকা, শেয়ার কেনাবেচা হচ্ছে ৮২৪ টাকায়। ২০১৩ সাল থেকে লোকসানে থাকা জুট স্পিনার্সের পরিশোধিত মূলধন ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। শেয়ার কেনাবেচা হচ্ছে ১১৭ টাকা ৫০ পয়সায়।
৩০ কোটি টাকার নিচে থাকা অন্যান্য কোম্পানি হচ্ছে রেনউইক যজ্ঞেশ^র (২ কোটি টাকা), নর্দার্ন জুট ম্যানুফেকচারিং কোম্পানি (২ কোটি ১০ লাখ টাকা), এমবি ফার্মাসিউটিক্যালস (২ কোটি ৪০ লাখ টাকা), মুন্নু অ্যাগ্রো অ্যান্ড জেনারেল মেশিনারি (২ কোটি ৭০ লাখ), সোনালি আঁশ ইন্ডাস্ট্রিজ (২ কোটি ৭১ লাখ), ফার্মা এইডস (৩ কোটি ১০ লাখ), বাংলাদেশ অটোকারস (৪ কোটি ৩০ লাখ), জেমিনি সী ফুড (৪ কোটি ৭০ লাখ), রেকিট বেঙ্কিজার (৪ কোটি ৭০ লাখ) ও কেঅ্যান্ডকিউ (৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা)।
রাষ্ট্রায়ত্ত শ্যামপুর সুগার মিলসের পরিশোধিত মূলধন ৫ কোটি টাকা। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে লোকসানে থাকা এ কোম্পানির শেয়ার বর্তমানে ৯০ টাকায় কেনাবেচা হচ্ছে। চিনি উৎপাদনকারী রাষ্ট্রায়ত্ত অপর তালিকাভুক্ত কোম্পানি জিলবাংলা সুগার মিলসের পরিশোধিত মূলধন ৬ কোটি টাকা। সাম্প্রতিক সময়ে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া আজিজ পাইপসের পরিশোধিত মূলধন ৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা। সামুদ্রিক মাছ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান অ্যাপেক্স ফুডসের পরিশোধিত মূলধন ৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এ ছাড়া আরামিট ৬ কোটি টাকা, স্ট্যান্ডার্ড সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ সাড়ে ৬ কোটি টাকা, ন্যাশনাল টি কোম্পানি ৬ কোটি ৬০ লাখ, দেশ গার্মেন্টস ৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, বঙ্গজ ৭ কোটি ৬০ লাখ ও দুলামিয়া কটন স্পিনিং মিলসের পরিশোধিত মূলধন ৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ইমাম বাটন ইন্ডাস্ট্রিজের পরিশোধিত মূলধন ৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা, এগ্রিকালচারাল মার্কেটিং কোম্পানি (প্রাণ) ৮ কোটি টাকা, অ্যাপেক্স স্পিনিং অ্যান্ড নিটিং মিলস ৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা, জিকিউ বল পেন ইন্ডাস্ট্রিজ ৮ কোটি ৯০ লাখ, বাংলাদেশ ল্যাম্পস ৯ কোটি ৪০ লাখ ও সাম্প্রতিক সময়ে ওটিসি বাজার থেকে মূল বাজারে আসা বাংলাদেশ মনোস্পুল পেপার ম্যানুফেকচারিং কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
রহিম টেক্সটাইল মিলসের পরিশোধিত মূলধন সাড়ে ৯ কোটি টাকা। এ ছাড়া রংপুর ফাউন্ড্রি, সমতা লেদার, পেপার প্রসেসিং, আইএসএন, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার, মেঘনা পিইটি, ইউনিলিভার কনজ্যুমার কেয়ার, লিগ্যাসি ফুটওয়ার, বাটা সু, স্টাইলক্রাফট, ফাইন ফুডস, ওয়াটা কেমিক্যালস, লিন্ডে বাংলাদেশ ও অ্যাপেক্স ট্যানারির পরিশোধিত মূলধন হচ্ছে ১৫ কোটি ২০ লাখ টাকা। এ ছাড়া আনোয়ারা গ্যালভানাইজিং, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স, উসমানিয়া গ্লাস সিট ফ্যাক্টরি, আনলিমা ইয়ার্ন, সমরিতা হসপিটাল, হাক্কানী পাল্প, রহিমা ফুড, সোনালি পেপার, সিনোবাংলা ইন্ডাস্ট্রিজ, ওরিয়ন ইনফিউশন, জেএমআই সিরিঞ্জ, কহিনুর কেমিক্যালস, আলহাজ¦ টেক্সটাইল, সিভিও পেট্রোকেমিক্যাল, এইচআর টেক্সটাইল, ইস্টার্ন কেবলস, সোনারগাঁ টেক্সটাইলস ও মেঘনা সিমেন্ট মিলসের পরিশোধিত মূলধন ৩০ কোটি টাকার নিচে রয়েছে।
